সরকারি চিনিকলের মোড়ক নকল ও বিএসটিআইয়ের ভুয়া লোগো ব্যবহার করে সাদা চিনিকে লাল করা হচ্ছে; প্রতি কেজিতে বাড়তি মুনাফা ৭০ থেকে ৯০ টাকা।
ঢাকা | ১৮ মে ২০২৬
স্বাস্থ্য সচেতনতার সুযোগ নিয়ে সাধারণ পরিশোধিত সাদা চিনির সাথে কাপড়ের টেক্সটাইল রঙ ও ক্ষতিকর রাসায়নিক কেমিক্যাল মিশিয়ে ‘আখের খাঁটি লাল চিনি’ হিসেবে বাজারে বিক্রি করছে একটি অসাধু সিন্ডিকেট চক্র। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ ভোক্তাদের কাছে এটি প্রাকৃতিক পণ্য হিসেবে প্রচার করা হলেও, বাস্তবে এসব চিনিতে শিল্পকারখানার রঙ মেশানো হচ্ছে। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ একাধিক বাজার তদারকি সংস্থার সাম্প্রতিক অভিযানে এই চক্রের হাতেনাতে প্রমাণ মিলেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, দীর্ঘদিন এই ভেজাল চিনি ব্যবহারের ফলে ক্যানসার, লিভার ও কিডনি বিকল হওয়াসহ মানবদেহে নানা জটিল রোগের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
📊 তথ্যচিত্র: এক নজরে ভেজাল লাল চিনির বাজার সমীকরণ
গত কয়েকদিনের বাজার ও অভিযান বিশ্লেষণ করে টুডে টিভি বিডি-র সংগৃহীত প্রধান ডেটা পয়েন্ট:
- মূল্য জালিয়াতি: সাধারণ সাদা চিনির বাজারমূল্য প্রতি কেজি ১০০-১১০ টাকা। কেমিক্যাল মিশিয়ে তা ভেজাল লাল চিনি বানিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে ১৭০-২০০ টাকায়।
- সিন্ডিকেটের মুনাফা: প্রতি কেজিতে অসাধু চক্রের অবৈধ লাভ ৭০ থেকে ৯০ টাকা।
- প্যাকেজিং জালিয়াতি: বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন (BSFIC)-এর লোগো ও মোড়ক অবিকল নকল।
- আইনি ত্রুটি: ভেজাল প্যাকেটের গায়ে উৎপাদনকারী বা রি-প্যাকারদের কোনো সুনির্দিষ্ট ঠিকানা বা বৈধ বিএসটিআই (BSTI) লাইসেন্স নম্বর নেই।
🔎 ল্যাব টেস্ট ও চেনার উপায়: আসল বনাম নকল লাল চিনি
ভোক্তাদের সচেতনতায় তদারকি সংস্থা ও খাদ্য বিজ্ঞানীদের দেওয়া তুলনামূলক বৈসাদৃশ্য:
| বৈশিষ্ট্য | আসল আখের লাল চিনি | কেমিক্যালযুক্ত নকল লাল চিনি |
|---|---|---|
| পানির পরীক্ষা | পানিতে মিশালে গ্লাসের পুরো পানি ধীরে ধীরে হালকা কালচে-বাদামি বর্ণ ধারণ করে। | পানিতে ছাড়ার সাথে সাথে কৃত্রিম লাল রঙ দ্রুত আলাদা হয়ে যায় এবং নিচে সাদা চিনির দানা স্পষ্ট হয়। |
| গঠন ও টেক্সচার | আখের প্রাকৃতিক মোলাসেস বা চিটাগুড়ের কারণে দানাগুলো কিছুটা ভেজা, আঠালো ও দলা পাকানো থাকে। | ঝরঝরে সাদা চিনিকে আঠালো দেখাতে বিশেষ রাসায়নিক কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়, যা কৃত্রিম চকচকে দেখায়। |
| ঘ্রাণ | নাকে ধরলে আখের রসের একটি চেনা প্রাকৃতিক সুগন্ধ পাওয়া যায়। | কোনো প্রাকৃতিক সুঘ্রাণ থাকে না; অনেক সময় হালকা কেমিক্যালের গন্ধ পাওয়া যায়। |
💬 বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য ও সতর্কতা
ডা. শামীম আহমেদ (জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ):
“কৃত্রিম লাল রঙ তৈরিতে ব্যবহৃত এরিথ্রোসিন বা রেড ডাই-৩ অতিরিক্ত মাত্রায় শরীরে প্রবেশ করলে থাইরয়েড টিউমারসহ বিভিন্ন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে। এটি কিডনি ও লিভারের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা নষ্ট করে শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ নিষ্কাশনে বাধা দেয়। এছাড়া শিশুদের ক্ষেত্রে এটি অতি-সক্রিয়তা বা মনোযোগের অভাব (ADHD) তৈরি করতে পারে।”
এসএম নাজের হোসাইন (ভাইস প্রেসিডেন্ট, ক্যাব):
“তদারকি সংস্থাগুলো অসাধুদের হাতেনাতে ধরলেও তাদের কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে না। অল্প কিছু টাকা জরিমানা দিয়ে অপরাধীরা ছাড় পেয়ে যাচ্ছে। সরাসরি মানুষের জীবন নিয়ে খেলা করা এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অ-জামিনযোগ্য কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।”
ভোক্তা ও মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা
শনিবার রাজধানীর জিনজিরা কাঁচাবাজারে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মো. হেলাল বলেন, “কিছুদিন আগেও এই চিনি সহজে পাওয়া যেত না। এখন বাজারে লাল চিনিতে সয়লাব। সাধারণ ভোক্তা হিসেবে আমাদের দেখে বোঝার উপায় নেই কোনটা আসল আর কোনটা বিষাক্ত রাসায়নিক মিশিয়ে বানানো হয়েছে।”
একই বাজারের মুদি ব্যবসায়ী মো. সাক্কুর আলম জানান, সরকারি চিনিকলের লাল চিনি এখন বাজারে নিয়মিত সরবরাহ করা হচ্ছে না, অথচ প্রায় প্রতিটি দোকানেই প্যাকেটজাত লাল চিনি পাওয়া যাচ্ছে। স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে যারা বেশি দাম দিয়ে এই চিনি কিনছেন, তারা মূলত আরও বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন।
📌 প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান ও আইনি সতর্কবার্তা
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আব্দুল জব্বার মন্ডল স্পষ্ট জানিয়েছেন, টেক্সটাইল রঙ ব্যবহার করে চিনি প্যাকেটজাত করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। মূল উৎপাদনকারীদের চিহ্নিত করতে তাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন (BSFIC) সূত্র নিশ্চিত করেছে, সরকারি লাল চিনি শুধুমাত্র তাদের নিজস্ব বিক্রয়কেন্দ্র ও নির্দিষ্ট কিছু ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে দেওয়া হয়। ডিলারদের এই চিনি খোলা অবস্থায় (বস্তা থেকে) বিক্রি করার নিয়ম রয়েছে। কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা চক্রের BSFIC-এর নাম বা লোগো ব্যবহার করে চিনি প্যাকেটজাত করার কোনো আইনি অধিকার নেই।
তথ্যসূত্র: জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযান রেকর্ড, বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন (BSFIC) এবং কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)।



