নাটকের অবশিষ্টাংশ আর শিল্পীদের ‘ভুল বুঝিয়ে’ নির্মিত ‘কন্ট্রাক্ট ম্যারেজ’ নিয়ে তোলপাড়; প্রতারণার অভিযোগে সরব মৌসুমী, জেবা ও সিয়াম মৃধা।
ঢাকা | শনিবার, ৯ মে ২০২৬
ঢালিউড যখন মানসম্মত নির্মাণ আর মৌলিক গল্পের হাত ধরে বিশ্ববাজারে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই সামনে এলো এক চরম পেশাদারিত্বহীনতা ও জালিয়াতির অভিযোগ। নাটক হিসেবে শুটিং করা ফুটেজকে ‘কাটপিস’ স্টাইলে জোড়াতালি দিয়ে ‘পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র’ হিসেবে মুক্তি দেওয়ার তোড়জোড় চলছে। হাসান জাহাঙ্গীর পরিচালিত ‘কন্ট্রাক্ট ম্যারেজ’ নামক এই বিতর্কিত প্রজেক্ট নিয়ে এখন শোবিজ পাড়ায় বইছে সমালোচনার ঝড়।
সত্য উন্মোচন: যা ছিল নাটক, তা-ই এখন সিনেমা!
সম্প্রতি অভিনেতা সিয়াম মৃধা তাঁর সোশ্যাল মিডিয়ায় এক দীর্ঘ পোস্টে এই প্রকল্পের নেপথ্যের চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস করেছেন। তাঁর দাবি অনুযায়ী, ঈদুল ফিতরে জিটিভিতে প্রচারিত ‘নায়িকার মেজাজ গরম’ (মূল নাম ‘কারিশমা’) নাটকের ফেলে দেওয়া বা বাড়তি অংশগুলো দিয়েই এই সিনেমা সাজানো হয়েছে।
সিয়াম মৃধা জানান:
- ভুল ব্যাখ্যা: শুটিংয়ের সময় শিল্পীদের বলা হয়েছিল পরিচালক ‘স্বপ্নের দৃশ্যে’ নায়িকার সঙ্গে রোমান্স ও ফাইট করছেন। কিন্তু বাস্তবে পরিচালক সেই ফুটেজগুলো সিনেমার জন্য ব্যবহার করেছেন।
- প্রতারণা: প্রধান নায়ককে সেটে বসিয়ে রেখে পরিচালক হাসান জাহাঙ্গীর নিজেই কেন্দ্রীয় চরিত্রে গানের শুটিং করেছেন।
- পারিশ্রমিকহীন কাজ: জেবা জান্নাত দাবি করেছেন, তিনি কোনো সিনেমার জন্য চুক্তিবদ্ধ হননি এবং কোনো পারিশ্রমিকও পাননি।
মৌসুমী ও ওমর সানীর ধিক্কার: ‘আমাকে কাটপিসের মতো ব্যবহার করা হয়েছে’
জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা মৌসুমী এই জালিয়াতি নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, নির্মাতা হাসান জাহাঙ্গীরের অনুরোধে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে কেবল এক ঘণ্টার একটি নাটকে অভিনয় করেছিলেন। পরে তাঁর অজান্তেই সেটিকে সিনেমা হিসেবে সেন্সর করানো হয়। মৌসুমী বলেন,
“আমাকে কাটপিসের মতো ব্যবহার করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ অনৈতিক। আমি চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট সমিতিগুলোর দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করছি।”
অন্যদিকে, অভিনেতা ওমর সানী ভিডিও বার্তায় এই জঘন্য ‘নাটক’টির মুক্তি বন্ধের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, এটি কোনোভাবেই সিনেমার সংজ্ঞায় পড়ে না।
🔎 বিশ্লেষণ: ইন্ডাস্ট্রির আস্থার সংকট ও সেন্সর বোর্ডের ভূমিকা
এই ঘটনাটি ঢালিউডের ব্যবসায়িক সততাকে বড় ধরনের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। চলচ্চিত্র বোদ্ধাদের মতে, বর্তমানে নাটকের কারিগরি মান ও ট্রেলারও এই তথাকথিত সিনেমার চেয়ে অনেক উন্নত।
এখানে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও নৈতিক প্রশ্ন উঠেছে:
১. সেন্সর বোর্ডের নজরদারি: টেলিভিশন বা ইউটিউবে প্রচারিত একটি ফিকশন কীভাবে নতুন সিনেমা হিসেবে ছাড়পত্র পায়?
২. সমিতির দায়বদ্ধতা: পরিচালক ও প্রযোজক সমিতি কি সদস্যপদ দেওয়ার আগে কাজের মান ও স্বচ্ছতা যাচাই করে না?
৩. দর্শকের সাথে প্রতারণা: নাটকের দৃশ্য জোড়াতালি দিয়ে সিনেমা হিসেবে টিকিটের বিনিময়ে হলে চালানো কি সরাসরি ভোক্তা অধিকার লঙ্ঘন নয়?
📊 তথ্যচিত্র: ‘কন্ট্রাক্ট ম্যারেজ’ বিতর্কের ফ্যাক্ট-চেক
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| মূল উৎস | জিটিভিতে প্রচারিত নাটক ‘নায়িকার মেজাজ গরম’। |
| পরিচালক ও নায়ক | হাসান জাহাঙ্গীর। |
| প্রধান অভিযোগকারী | চিত্রনায়িকা মৌসুমী, সিয়াম মৃধা ও জেবা জান্নাত। |
| ট্রেলার প্রতিক্রিয়া | নেটিজেনদের ৯৫% মন্তব্যই নেতিবাচক ও ‘জঘন্য’ হিসেবে আখ্যায়িত। |
| মুক্তির তারিখ | ১৫ মে ২০২৬ (প্রেক্ষাগৃহে)। |
💬 পরিচালকের অবস্থান ও দর্শকদের প্রতিক্রিয়া
এতসব অভিযোগের মুখেও পরিচালক হাসান জাহাঙ্গীর দাবি করেছেন, সিনেমাটি মুক্তি পেলে দর্শকরা ‘ইতিবাচক বার্তা’ পাবেন। তবে সাধারণ দর্শকরা ট্রেলার দেখে একে ‘ইউটিউব কন্টেন্টের চেয়েও নিম্নমানের’ বলে অভিহিত করেছেন। অনেকের মতে, এই ধরনের নিম্নমানের ও জালিয়াতিপূর্ণ কাজগুলো বাংলা সিনেমার বর্তমান সুদিনকে আবারও অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেবে।
উপসংহার
সিনেমা মানে কেবল প্রচারণা বা সস্তা ভিউ নয়; সিনেমা মানে একটি শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধতা। ‘কন্ট্রাক্ট ম্যারেজ’ নিয়ে সৃষ্ট এই বিতর্ক ঢালিউডের জন্য একটি সতর্কবার্তা। মানহীন ও জালিয়াতিপূর্ণ কাজকে যদি পেশাদার সংগঠনগুলো এখনই কঠোর হাতে দমন না করে, তবে সাধারণ দর্শক আবারও হলবিমুখ হতে বাধ্য হবে।
তথ্যসূত্র: চ্যানেল আই অনলাইন, আনন্দমেলা, সিয়াম মৃধার ফেসবুক পোস্ট এবং ডেইলিস্টার ডিজিটাল।



