নিজস্ব প্রতিবেদক: সাত দিন ধরে নিখোঁজ থাকার পর অবশেষে মিলেছে হদিস, তবে জীবিত নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ফ্লোরিডা ইউনিভার্সিটির (USF) ভূ-গোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের পিএইচডি গবেষক জামিল আহমেদ লিমনের নিথর দেহ উদ্ধার করেছে ফ্লোরিডার হিলসবোরো কাউন্টি পুলিশ। ট্যাম্পার হাওয়ার্ড ফ্র্যাংকলিন ব্রিজের নিচ থেকে শুক্রবার সকালে লিমনের মরদেহ পাওয়ার পর বেরিয়ে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। এই ঘটনায় জড়িত সন্দেহে লিমনেরই রুমমেট হিশাম সালেহকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
যেভাবে শুরু নিখোঁজ রহস্য
গত ১৬ এপ্রিল সকালে ট্যাম্পার নিজস্ব বাসভবন থেকে শেষবারের মতো দেখা গিয়েছিল লিমনকে। ঠিক এক ঘণ্টা পর সকাল ১০টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস থেকে উধাও হয়ে যান আরেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি। বৃষ্টি কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পিএইচডি শিক্ষার্থী ছিলেন। দুজনেই একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হওয়ায় এবং লিমনের সাথে বৃষ্টির পূর্বের ব্যক্তিগত সম্পর্কের সূত্র ধরে শুরু থেকেই বিষয়টি নিয়ে রহস্যের দানা বাঁধছিল।
রুমমেট গ্রেফতার ও পুলিশের ‘সোয়াট’ অভিযান
শুক্রবার সকালে লিমনের মরদেহ উদ্ধারের কয়েক ঘণ্টা আগেই হিশাম সালেহ’র বাসা থেকে একটি জরুরি ফোন কল পায় পুলিশ। পুলিশ সেখানে অভিযানে গেলে হিশাম আত্মসমর্পণ করতে অস্বীকৃতি জানান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ শেষ পর্যন্ত বিশেষ বাহিনী ‘সোয়াট’ (SWAT) তলব করে। দীর্ঘ উত্তেজনার পর হিশাম পুলিশের কাছে নতি স্বীকার করেন।
পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্ত হিশামের বিরুদ্ধে এর আগেও সহিংসতা এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের রেকর্ড রয়েছে। বর্তমানে তাঁর বিরুদ্ধে:
- সহিংসতা ও শারীরিক হামলা
- অপরাধের প্রমাণ নষ্ট করা
- মৃত্যুর খবর গোপন রাখা
- এবং মরদেহ অবৈধভাবে স্থানান্তরের মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।
এখনও নিখোঁজ নাহিদা বৃষ্টি
লিমনের মরদেহ পাওয়া গেলেও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির ভাগ্য নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা কাটেনি। পুলিশ জানিয়েছে, তাঁকে খুঁজে পেতে তদন্ত এবং তল্লাশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বৃষ্টির বড় ভাই জাহিদ হাসান প্রান্তর ভাষ্যমতে, লিমনের সাথে বৃষ্টির একসময় সম্পর্ক ছিল, যা পরবর্তীকালে ভেঙে যায়। তবে লিমনের মৃত্যুর সাথে বৃষ্টির নিখোঁজ হওয়ার কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা নিয়ে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি মার্কিন পুলিশ।
অপরাধীর ‘ডার্ক প্রোফাইল’
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গ্রেফতারকৃত হিশাম সালেহ নিজেও একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন শিক্ষার্থী। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর ও মে মাসেও তাঁর বিরুদ্ধে চুরিসহ বিভিন্ন সহিংস কর্মকাণ্ডের অভিযোগে মামলা হয়েছিল। এমনকি তাঁর নিজের পরিবারের এক সদস্য তাঁর বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে আদালতের কাছে সুরক্ষার আবেদন জানিয়েছিলেন। এমন একজন অপরাধপ্রবণ ব্যক্তির সাথে লিমনের রুমমেট হিসেবে থাকাটাই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শোকের ছায়া বাংলাদেশের পরিবারে
উচ্চশিক্ষার স্বপ্নে বিভোর হয়ে সুদূর মার্কিন মুলুকে গিয়ে এভাবে অকাল মৃত্যু আর নিখোঁজ হওয়ার খবর লিমনের গ্রামের বাড়িতে নেমে এনেছে শোকের মাতম। অন্যদিকে বৃষ্টির পরিবারের সদস্যরা এখন মুহূর্ত গুনছেন একটি সুসংবাদের আশায়।
উপসংহার:
ফ্লোরিডার এই হত্যাকাণ্ড কেবল একটি অপরাধ নয়, বরং এটি প্রবাসী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। নাহিদা বৃষ্টিকে কি তবে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব? নাকি লিমনের পরিণতির পেছনে লুকিয়ে আছে আরও বড় কোনো ষড়যন্ত্র? এই প্রশ্নের উত্তর এখন হিলসবোরো কাউন্টি পুলিশের দীর্ঘ তদন্তের ওপর নির্ভর করছে।



