Homeটুডে ওয়ার্ল্ডযুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংঘাত: ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শেষ ঘোষণা, কিন্তু যুদ্ধ কি সত্যিই শেষ?

যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংঘাত: ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শেষ ঘোষণা, কিন্তু যুদ্ধ কি সত্যিই শেষ?

মার্কো রুবিওর ঘোষণা, কুয়েত বিমানবন্দরে ড্রোন হামলা, হরমুজ প্রণালীর উত্তেজনা এবং মধ্যপ্রাচ্যের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

Today TV BD আন্তর্জাতিক ডেস্ক


🕯 ভূমিকা: যুদ্ধ শেষের ঘোষণা, কিন্তু গোলাগুলি এখনো থামেনি

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী Marco Rubio ঘোষণা দিয়েছেন যে ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত মার্কিন সামরিক অভিযান “Operation Epic Fury” তার নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র আর ইরানের ভেতরে ধারাবাহিক আক্রমণ চালাচ্ছে না। তাঁর ভাষায়, এখন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো সামরিক পদক্ষেপ হবে মূলত প্রতিরক্ষামূলক।

কিন্তু রুবিওর এই ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ড্রোন হামলা, হতাহত এবং নতুন সামরিক উত্তেজনা প্রমাণ করেছে যে যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করলেই সংঘাত বাস্তবে শেষ হয়ে যায় না।

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান বাস্তবতা হলো—যুদ্ধ হয়তো তার সবচেয়ে তীব্র পর্যায় অতিক্রম করেছে, কিন্তু স্থায়ী শান্তি এখনো অনেক দূরে।


⚔️ কী ছিল ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’?

মার্চ ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে বৃহৎ সামরিক অভিযান শুরু করে, যার কোডনেম ছিল Operation Epic Fury

মার্কিন প্রশাসনের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল—

  • ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করা
  • ড্রোন উৎপাদন ও মজুত কমিয়ে আনা
  • নৌবাহিনীর সক্ষমতা ভেঙে দেওয়া
  • আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র সরবরাহের ক্ষমতা নষ্ট করা
  • ইরানের সম্ভাব্য পারমাণবিক সক্ষমতা সীমিত করা

হোয়াইট হাউসের দাবি অনুযায়ী, কয়েক মাসব্যাপী অভিযানে হাজার হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে এবং ইরানের সামরিক অবকাঠামোর বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।


🗣 রুবিও কী বললেন?

৩ জুন মার্কিন কংগ্রেসে বক্তব্য দিতে গিয়ে রুবিও বলেন—

“We’re no longer conducting sustained strikes inside Iran because Epic Fury is over.”

তিনি দাবি করেন, অভিযানের ফলে ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্প, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা, ড্রোন মজুত, নৌবাহিনী এবং প্রচলিত সামরিক সক্ষমতার বড় অংশ ধ্বংস হয়েছে। তাঁর মতে, অভিযানের মূল লক্ষ্য পূরণ হয়েছে এবং এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত বিজয় হিসেবে দেখা যায়।

তবে এই মূল্যায়ন এখনো স্বাধীন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মাধ্যমে পুরোপুরি যাচাই হয়নি।


📅 সংঘাতের সংক্ষিপ্ত টাইমলাইন

মার্চ ২০২৬

  • যুক্তরাষ্ট্র ‘Operation Epic Fury’ শুরু করে।
  • ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও সামরিক স্থাপনায় ধারাবাহিক হামলা শুরু হয়।

মার্চ–এপ্রিল ২০২৬

  • উপসাগরীয় অঞ্চলে একাধিক পাল্টাপাল্টি হামলা হয়।
  • সামুদ্রিক রুট ও জ্বালানি অবকাঠামোকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বাড়তে থাকে।

এপ্রিল ২০২৬

  • একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়।
  • তবে বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ অব্যাহত থাকে।

মে ২০২৬

  • উভয় পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে।
  • হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে নতুন উত্তেজনা দেখা দেয়।

১–৩ জুন ২০২৬

  • যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আবার সীমিত সামরিক হামলা চালায়।
  • ইরান কুয়েত ও বাহরাইনের দিকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে বলে অভিযোগ ওঠে।

৩ জুন ২০২৬

  • কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বড় ড্রোন হামলা হয়।
  • অন্তত একজন নিহত এবং কয়েক ডজন আহত হন।
  • একই দিনে রুবিও ‘Operation Epic Fury’ সমাপ্ত ঘোষণা করেন।

✈️ কুয়েত বিমানবন্দরে কী ঘটেছে?

বুধবার ভোরে কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ড্রোন হামলায় যাত্রী টার্মিনালের বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী—

  • অন্তত একজন নিহত হন
  • ৬০-এর বেশি মানুষ আহত হন
  • যাত্রী টার্মিনালে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়
  • সাময়িকভাবে বাণিজ্যিক ফ্লাইট বন্ধ করা হয়

এই হামলাকে অনেক বিশ্লেষক যুদ্ধবিরতির পর সবচেয়ে গুরুতর নিরাপত্তা সংকটগুলোর একটি হিসেবে দেখছেন।


🌊 হরমুজ প্রণালী কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডর হলো Strait of Hormuz।

বিশ্বে সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের একটি বড় অংশ এই সংকীর্ণ নৌপথ দিয়ে যায়।

বর্তমান সংঘাতের ফলে—

  • বৈশ্বিক তেলের দাম অস্থির হয়েছে
  • জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে
  • আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো ঝুঁকি মূল্যায়ন বাড়িয়েছে

যদি হরমুজে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক সংঘর্ষ শুরু হয়, তাহলে এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে নয়, পুরো বিশ্ব অর্থনীতিতে পড়তে পারে।


🤝 কূটনৈতিক আলোচনার অবস্থা কী?

রুবিও কংগ্রেসে বলেছেন, তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ভবিষ্যতে কোনো পারমাণবিক বা নিরাপত্তা চুক্তি হলে তা ২০১৫ সালের Joint Comprehensive Plan of Action (JCPOA)-এর চেয়ে কঠোর হবে।

অন্যদিকে যুদ্ধবিরতি নিয়ে এখনও অনিশ্চয়তা রয়েছে।

কারণ—

  • ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র পরস্পরের বিরুদ্ধে নতুন হামলার অভিযোগ করছে
  • আঞ্চলিক মিত্র রাষ্ট্রগুলো উদ্বিগ্ন
  • যুদ্ধবিরতি ভঙ্গের ঝুঁকি এখনো বিদ্যমান

📊 কে কী দাবি করছে?

যুক্তরাষ্ট্রের দাবি

  • অপারেশন সফল হয়েছে
  • ইরানের সামরিক সক্ষমতা বড়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত
  • ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ হবে প্রতিরক্ষামূলক

ইরানের অবস্থান

  • তারা নিজেদের হামলাকে প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরছে
  • যুক্তরাষ্ট্রকে উত্তেজনা বৃদ্ধির জন্য দায়ী করছে

স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের মূল্যায়ন

  • সংঘাতের সবচেয়ে তীব্র পর্যায় হয়তো শেষ হয়েছে
  • কিন্তু স্থায়ী শান্তি এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি
  • যুদ্ধবিরতি অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে

🔍 সামনে কী হতে পারে?

বিশ্লেষকদের মতে আগামী কয়েক সপ্তাহে তিনটি সম্ভাবনা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—

১. সীমিত শান্তি চুক্তি

কূটনৈতিক আলোচনা সফল হলে উত্তেজনা ধীরে ধীরে কমতে পারে।

২. অনিয়মিত পাল্টাপাল্টি হামলা

যুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হলেও ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চলতে পারে।

৩. পূর্ণমাত্রার নতুন সংঘাত

যদি যুদ্ধবিরতি পুরোপুরি ভেঙে পড়ে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্য আবার বৃহৎ সামরিক সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তে পারে।


📜 Today TV BD মূল্যায়ন

মার্কো রুবিওর ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামরিক মাইলফলক।

কিন্তু কুয়েত বিমানবন্দরে ড্রোন হামলা, হরমুজ প্রণালীর উত্তেজনা এবং চলমান কূটনৈতিক অনিশ্চয়তা দেখাচ্ছে যে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট এখনো শেষ হয়নি।

অতএব, বর্তমান পরিস্থিতিকে “যুদ্ধ-পরবর্তী শান্তি” বলা যতটা সহজ, বাস্তবে এটি তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল।

আজকের বাস্তবতা হলো—অপারেশন এপিক ফিউরি হয়তো শেষ হয়েছে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংঘাতের রাজনৈতিক, কৌশলগত এবং ভূরাজনৈতিক অধ্যায় এখনো লেখা শেষ হয়নি।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular