Homeটুডে টেকডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের ‘গণতন্ত্র’ : আড়ম্বরপূর্ণ নির্বাচন, নাকি নিছক ক্ষমতার লিলা?

ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের ‘গণতন্ত্র’ : আড়ম্বরপূর্ণ নির্বাচন, নাকি নিছক ক্ষমতার লিলা?

ইনস্টিটিউশন অফ ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি)-এর কেন্দ্রীয় নির্বাচন ২০২৬-২৮ টার্মের প্রচারণা শুরু হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—এই নির্বাচন কি সত্যিই ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের অধিকার আদায়ের প্ল্যাটফর্ম, নাকি কিছু ব্যক্তির নিজস্ব স্বার্থ সাধনের আরেকটি মঞ্চ?

🏛️ আইডিইবি: যে প্রতিষ্ঠানের কথা বলা হয়, কিন্তু কাজ হয় না

আইডিইবি ১৯৭০ সালের ৮ নভেম্বর প্রতিষ্ঠিত একটি পেশাদার সংস্থা। দেশের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার ও ডিপ্লোমা আর্কিটেক্টদের জন্য এটি একটি জাতীয় প্ল্যাটফর্ম হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। প্রতিষ্ঠানটির উদ্দেশ্য ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের মধ্যে সংযোগ তৈরি করা এবং প্রকৌশলী সম্প্রদায় হিসেবে কাজ করা, কিন্তু অতীতে তারা কতটুকু তা করতে পেরেছে—সেটাই বড় প্রশ্ন।
ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা দেশের অবকাঠামো উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি। অথচ তাদের উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদটুকু নিয়েই প্রতিনিয়ত দ্বন্দ্ব। এত বড় একটা পেশাজীবী সংগঠন থাকার পরও কেন তাদের এই অবস্থা?

🗳️ চলতি নির্বাচন: কারা, কিসের প্রতিশ্রুতি নিয়ে আসছে?

২০২৬-২৮ মেয়াদের আইডিইবি কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি নির্বাচনকে সামনে রেখে ইতিমধ্যে মনোনয়নপত্র দাখিল শুরু হয়েছে। নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে অন্তত দুটি প্যানেল:
১. সার্বজনীন আইডিইবি প্যানেল: প্রকৌশলী মোহাম্মদ হানিফ, মোহাম্মদ ইমামউদ্দিন ও খন্দকার মাইনুর রহমানের যৌথ নেতৃত্বে এই প্যানেল। তারা ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের অধিকার আদায়, পেশাগত উন্নয়ন ও সংগঠনের সার্বজনীন সংস্কারের অঙ্গীকার নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে।
২. ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিইএব) প্যানেল: জাতীয়তাবাদী আদর্শের সংগঠন হিসেবে পরিচিত এই প্যানেল। ডিইএব বিএনপি অনুমোদিত একটি পেশাজীবী সংগঠন।
৩. ঐক্য পরিষদ প্যানেল: খুলনা জেলা নির্বাচনে ইতিমধ্যে তাদের প্রচারণা শুরু হয়েছে।
নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক বিভাজন ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগও রয়েছে। বিভিন্ন প্যানেলের মধ্যে উত্তেজনা ক্রমশ বাড়ছে, যা ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের ঐক্যের জন্য সুবহ নয়।

🔍 অতীতের ব্যর্থতা: কেন ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা এখনও ‘বঞ্চিত’?

আইডিইবির অতীত নেতৃত্ব কতটুকু সফল ছিল? ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের বাস্তব চিত্র দেখলে উত্তরটি স্পষ্ট:

  • চাকরিতে বৈষম্য: ১০ম গ্রেডভুক্ত উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদ শুধু ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য সংরক্ষিত থাকলেও, বিএসসি ইঞ্জিনিয়াররা সেখানে প্রবেশের চেষ্টা চালাচ্ছে। ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের এই পদ সংকট দীর্ঘদিনের।
  • পদোন্নতি বঞ্চনা: ৯ম গ্রেডে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য ৩৩ শতাংশ কোটা থাকলেও তা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না।
  • সামাজিক অবমূল্যায়ন: সমাজে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের ‘ইঞ্জিনিয়ার’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় না। ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইইবি) শুধু বিএসসি ডিগ্রিধারীদেরই প্রকৃত ‘ইঞ্জিনিয়ার’ মানে।
    প্রশ্ন: প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্বে যারা ছিলেন, তারা কি কখনও এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে কার্যকর আন্দোলন গড়ে তুলতে পেরেছিলেন? নাকি তারা শুধু নিজেদের পদ-পদবি নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন?
    ২০২৫ সালের আগস্টে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্র-শিক্ষক পেশাজীবী সংগ্রাম পরিষদ প্রধান উপদেষ্টার কাছে ৭ দফা দাবি জানিয়ে স্মারকলিপি দিয়েছে। অথচ আইডিইবি—যা হওয়ার কথা ছিল এই আন্দোলনের মূল শক্তি—সেখানে নীরব ছিল?

🎭 নেতৃত্বের দ্বৈত চরিত্র: নাকি ‘আমরা’ আর ‘তোমরা’?

যারা নেতৃত্বে আসতে চান, তাদের মূল দায়িত্ব কী?
১. ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের অধিকার আদায়: উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদ সংরক্ষণ, পেশাগত মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, সামাজিক স্বীকৃতি আদায়—এটাই প্রধান দায়িত্ব।
২. পেশাগত মান উন্নয়ন: আধুনিক পাঠ্যক্রম বাস্তবায়ন, আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা নিশ্চিত করা।
৩. সংগঠনের সংস্কার: আইডিইবিকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সংগঠনে পরিণত করা।
4. ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের ঐক্য: বিভিন্ন প্যানেলের বিভাজন দূর করে সবাইকে এক ছাতার নিচে আনা।
কিন্তু বাস্তবে? ডিইএব প্যানেলের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক স্পষ্ট। অন্যদিকে সার্বজনীন প্যানেল নিজেদের ‘সার্বজনীন’ দাবি করলেও তাদের রাজনৈতিক অবস্থানও স্পষ্ট নয়। প্রশ্ন হলো—এরা কি ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের স্বার্থে কাজ করবে, নাকি নিজেদের রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা চরিতার্থ করবে?

📢 সাধারণ ভোটাররা কী চান?

যারা vote দেবেন—সাধারণ ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা—তাদের প্রত্যাশা কী?

  • সৎ ও দক্ষ নেতৃত্ব: যারা শুধু নির্বাচনের সময় মুখ খোলেন, পরে আর খোঁজ রাখেন না—তাদের চান না।
  • বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা: কীভাবে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের সমস্যার সমাধান করবেন—সে বিষয়ে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি।
  • স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা: কোথায় কী টাকা খরচ হচ্ছে, তা জানার অধিকার।
  • সবার জন্য সমান সুযোগ: কোনও গোষ্ঠী বা দলের পক্ষপাতিত্ব নয়।
    একজন সাধারণ ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারের অভিমত: “আমরা চাই, কেউ এসে আমাদের কথা শুনুক। আমাদের নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমাদের মতামত নেওয়া হোক। নেতৃত্ব আসলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের উন্নয়নের জন্য কিছু করুক, নিজের পকেটের জন্য নয়।”

⚖️ করণীয়: ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের কী করা উচিত?

১. ভোটের অধিকার ব্যবহার: যোগ্য প্রার্থী বেছে নিতে হবে, নয় তো ‘কমপক্ষে যে কোনো একজন’ ভেবে vote দিলে চলবে না।
২. প্রার্থীদের প্রশ্ন করা: তাঁদের কর্মপরিকল্পনা, অতীতের অবদান, স্বচ্ছতার প্রতিশ্রুতি—সব জানতে হবে।
৩. ঐক্যবদ্ধ থাকা: প্যানেলের বিভাজনে বিভ্রান্ত না হয়ে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের মূল স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে।
4. নির্বাচন পর্যবেক্ষণ: কারচুপি বা অনিয়ম হলে প্রতিবাদ করতে হবে।
৫. নতুন নেতৃত্বকে জবাবদিহির মুখে রাখা: নির্বাচনের পরেও নেতৃত্বকে প্রশ্ন করার অধিকার রাখতে হবে।

🧠 চূড়ান্ত বিশ্লেষণ: এই নির্বাচন কি বাঁকবদল?

আইডিইবি নির্বাচন ২০২৬ ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এই নির্বাচনের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে—আগামী দুই বছর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের স্বার্থ কে রক্ষা করবে। কিন্তু ইতিহাস বলে, আইডিইবির নেতৃত্ব বারবার ব্যর্থ হয়েছে। হয়তো তারা নিজেদের স্বার্থেই সফল, কিন্তু ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের স্বার্থে নয়।
তাহলে উপায়? সাধারণ ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদেরই এবার সোচ্চার হতে হবে। যারা শুধু ‘প্যানেল’-এর নামে vote চায়, তাদের নয়—বরং যারা ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য কাজ করার বাস্তব পরিকল্পনা নিয়ে আসে, তাদের বেছে নিতে হবে। নইলে আরও দুই বছর একই গল্প—‘বঞ্চনার গল্প’—আবারও ফিরে আসবে।
শেষ কথা: রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা নয়, ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের অধিকারই হোক এই নির্বাচনের মূল ইস্যু। আর সেই अधिकार আদায়ের মাধ্যমেই হোক এই সংগঠনের প্রকৃত সার্থকতা।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments