Homeটুডে হেলথপেট না কেটেই অপারেশন: বাংলাদেশে ৩৫ বছরে পাল্টে দিল শল্যচিকিৎসার চিত্র

পেট না কেটেই অপারেশন: বাংলাদেশে ৩৫ বছরে পাল্টে দিল শল্যচিকিৎসার চিত্র

ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারি নিয়ে যমুনা টেলিভিশনের ‘ডক্টরস অন কল’ অনুষ্ঠানে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন বাংলাদেশে ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারির অন্যতম পথিকৃৎ এবং প্রখ্যাত ল্যাপারোস্কোপিক সার্জন অধ্যাপক ডাক্তার সরদার এ নাইম

ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারি কী

সাধারণ মানুষের কাছে এটি ‘ফুটো করে অপারেশন’ বা ‘মেশিনে অপারেশন’ নামে পরিচিত। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, পেটে বড় কোনো কাটা না দিয়ে ছোট ছিদ্রের মধ্য দিয়ে বিশেষ ক্যামেরা ও যন্ত্রাংশ প্রবেশ করানো হয়। সার্জন মনিটরে দেখে দেখে সম্পূর্ণ অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করেন।

বর্তমানে পিত্তথলির পাথর, অ্যাপেন্ডিক্স, হার্নিয়া এবং জরায়ু ও ওভারির বিভিন্ন সমস্যায় এই পদ্ধতিতে সফলভাবে অস্ত্রোপচার করা হচ্ছে।

প্রচলিত পদ্ধতির চেয়ে কতটা আলাদা

প্রচলিত পদ্ধতিতে পেট কেটে অপারেশন করতে গেলে ৭ থেকে ৮ ইঞ্চি পর্যন্ত কাটতে হয়। ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারিতে সেই প্রয়োজন নেই। এই পদ্ধতির উল্লেখযোগ্য সুবিধাগুলো হলো:

ক্ষত ছোট হওয়ায় অস্ত্রোপচারের পর ব্যথা ও কষ্ট অনেক কম। সংক্রমণের ঝুঁকিও প্রায় নেই বললেই চলে। আগে যেখানে ৫ থেকে ১০ দিন হাসপাতালে থাকতে হতো, এখন তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা, যেমন ইনসিশনাল হার্নিয়ার ঝুঁকিও এড়ানো সম্ভব।

খরচের বিষয়েও ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে বলে জানান অধ্যাপক নাইম। হাসপাতালে কম থাকা এবং অস্ত্রোপচার-পরবর্তী ওষুধের খরচ কম হওয়ায় সামগ্রিকভাবে এই পদ্ধতি ওপেন সার্জারির চেয়ে ব্যয়বহুল নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে সাশ্রয়ী।

যাদের ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন

অধ্যাপক নাইমের মতে, ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারি করা যাবে না এমন রোগী সাধারণত নেই। তবে তীব্র হৃদরোগ বা শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা রয়েছে এমন রোগীদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা প্রয়োজন। এই পদ্ধতিতে পেটে কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস প্রবেশ করানো হয়, যা দুর্বল হৃদরোগীর রক্তচাপ কমিয়ে দিতে পারে। এ ধরনের রোগীদের ক্ষেত্রে কম চাপে এবং অভিজ্ঞ সার্জন দিয়ে অস্ত্রোপচার করা উচিত।

অস্ত্রোপচারের মাঝে কোনো জটিলতা দেখা দিলে প্রচলিত পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে করেন তিনি।

বাংলাদেশে কীভাবে এলো এই পদ্ধতি

বিশ্বে ১৯৮৭ সালে প্রথম ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারি সফল হওয়ার পর চিকিৎসা জগতে বড় পরিবর্তন আসে। অধ্যাপক নাইম তখন টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডির ছাত্র। জাপানে প্রথম ল্যাপারোস্কোপিক দলের সদস্য হিসেবে তিনি এই প্রযুক্তি হাতে-কলমে শেখার সুযোগ পান।

এরপর ১৯৯১ সালের ২০ ডিসেম্বর ঢাকার বার্ডেম হাসপাতালে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারি সফলভাবে সম্পন্ন হয়। এতে সহযোগিতা করেছিলেন সোসাইটি অফ সার্জনস অফ বাংলাদেশের তৎকালীন সভাপতি অধ্যাপক গোলাম রসুল এবং গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট অধ্যাপক আজাদ খান। জাপান থেকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি এনেছিলেন মিস্টার ফুকিও।

১৯৯৩ সালের এপ্রিল থেকে দেশে নিয়মিতভাবে এই অস্ত্রোপচার শুরু হয়। বর্তমানে ‘সোসাইটি অফ ল্যাপারোস্কোপিক সার্জনস’-এর মাধ্যমে প্রায় এক হাজার চিকিৎসককে বেসিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

সঠিক প্রশিক্ষণ ও যন্ত্রপাতি নিশ্চিত না হলে ঝুঁকি

ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারি সম্পূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর একটি পদ্ধতি। তাই কেবল চিকিৎসকের দক্ষতাই যথেষ্ট নয় — যন্ত্রপাতির মান এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

অধ্যাপক নাইম জানান, প্রত্যন্ত এলাকায় সঠিক সেটআপ ছাড়া অস্ত্রোপচার করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের জন্য জেনারেটর ব্যাকআপ, পর্যাপ্ত গ্যাস সিলিন্ডার, ক্যামেরার কারিগরি সক্ষমতা — সবকিছু আগেই যাচাই করা বাধ্যতামূলক। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষেরও দায়িত্ব রয়েছে আধুনিক ও মানসম্মত যন্ত্রপাতি নিশ্চিত করা।

সূত্র: যমুনা টেলিভিশন, ‘ডক্টরস অন কল’ বিশেষ আয়োজন

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments