Homeশোবিজ টুডেএকজন সালমান শাহ, একটি অসমাপ্ত স্বপ্ন

একজন সালমান শাহ, একটি অসমাপ্ত স্বপ্ন

মাত্র চার বছরে ২৭ সিনেমা, লাখো দর্শকের হৃদয়ে স্থায়ী আসন; ৩০ বছর পরও রহস্যময় মৃত্যু আর নতুন মোড়ে হত্যা মামলা—জন্মদিনে ফিরে দেখা বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত চলচ্চিত্র তারকার জীবন

কভার স্টোরি | শোবিজ টুডে

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে কিছু নাম শুধু অভিনেতার পরিচয় বহন করে না, সময়ের একটি প্রতীক হয়ে ওঠে। সালমান শাহ তেমনই একটি নাম।

১৯৯০-এর দশকের শুরুতে তিনি যখন বড় পর্দায় আসেন, তখন দেশের চলচ্চিত্রে একদিকে ছিল প্রচলিত নায়ক-নির্ভর কাঠামো, অন্যদিকে দর্শকের রুচিতেও আসছিল পরিবর্তন। সেই সময়ে নতুন চুলের স্টাইল, পোশাক, অভিনয়ের ধরন, সংলাপ বলার ভঙ্গি এবং পর্দায় স্বাভাবিক উপস্থিতি নিয়ে আবির্ভূত হন সালমান শাহ। খুব অল্প সময়েই তিনি হয়ে ওঠেন তরুণ প্রজন্মের স্বপ্নের নায়ক।

মাত্র প্রায় চার বছরের চলচ্চিত্রজীবনে ২৭টি ছবিতে অভিনয় করে তিনি যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন, তা আজও বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে বিরল। তাঁর বেশির ভাগ ছবিই বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়েছিল এবং মৃত্যুর তিন দশক পরও তাঁর সিনেমা, গান, পোশাক ও অভিনয় নিয়ে নতুন প্রজন্মের আগ্রহ কমেনি।

প্রতি বছর তাঁর জন্মদিন এলেই তাই ফিরে আসে একই প্রশ্ন—সালমান শাহ যদি আজ বেঁচে থাকতেন, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র কোথায় দাঁড়াত?

এই প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর নেই। কিন্তু তাঁর অসমাপ্ত ক্যারিয়ার দেখলে অনুমান করা যায়, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের গতিপথ হয়তো আরও অন্যরকম হতে পারত।

সিলেটের ছেলে ইমন থেকে সালমান শাহ

সালমান শাহর পারিবারিক নাম ছিল শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন। তিনি ১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিলেটের জকিগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা কমর উদ্দিন চৌধুরী এবং মা নীলা চৌধুরী। পরিবারের বড় ছেলে ছিলেন তিনি।

শৈশব থেকেই সংস্কৃতির প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। ছোটবেলায় বাংলাদেশ টেলিভিশনে কাজ করার পাশাপাশি ছায়ানটে সংগীত শেখেন এবং গানও করতেন। পরে বিজ্ঞাপনচিত্রের মডেল হিসেবে বিনোদন অঙ্গনে তাঁর পেশাগত যাত্রা শুরু হয়।

তবে বড় পর্দায় তাঁকে যে পরিচয়টি চিরস্থায়ী করে দেয়, সেটি হলো ‘সালমান শাহ’।

‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’: শুরুতেই বাজিমাত

১৯৯৩ সালে সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ দিয়ে চলচ্চিত্রে অভিষেক সালমান শাহর। তাঁর বিপরীতে ছিলেন মৌসুমী।

ছবিটি শুধু ব্যবসাসফলই হয়নি, এক নতুন নায়কের জন্মও দিয়েছিল। সালমান-মৌসুমী জুটি দর্শকের কাছে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পরে ‘অন্তরে অন্তরে’, ‘দেনমোহর’ ও **‘স্নেহ’**সহ আরও কয়েকটি ছবিতে তাঁদের দেখা যায়।

কিন্তু সালমানের সবচেয়ে জনপ্রিয় জুটি তৈরি হয় শাবনূরের সঙ্গে। তাঁদের একসঙ্গে অভিনীত ছবির সংখ্যা ১৩ বা ১৪—গণনার পদ্ধতি ভেদে বিভিন্ন সূত্রে সামান্য পার্থক্য দেখা যায়—তবে তাঁদের জুটি যে নব্বইয়ের দশকের সবচেয়ে জনপ্রিয় জুটিগুলোর একটি ছিল, সে বিষয়ে চলচ্চিত্র ইতিহাসে দ্বিমত নেই।

মাত্র চার বছরেই ২৭ ছবি

সালমান শাহর সবচেয়ে অবিশ্বাস্য পরিসংখ্যানগুলোর একটি তাঁর ছবির সংখ্যা।

প্রায় চার বছরের ক্যারিয়ারে তিনি অভিনয় করেন ২৭টি চলচ্চিত্রে। এর মধ্যে ছিল ‘তুমি আমার’, ‘সুজন সখী’, ‘বিক্ষোভ’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘এই ঘর এই সংসার’, ‘তোমাকে চাই’, ‘স্বপ্নের পৃথিবী’, ‘সত্যের মৃত্যু নেই’, ‘প্রেম পিয়াসী’, ‘চাওয়া থেকে পাওয়া’, ‘স্বপ্নের নায়ক’, ‘আনন্দ অশ্রু’, ‘বুকের ভিতর আগুন’সহ বহু আলোচিত ছবি।

এই সংখ্যাকে শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে বিচার করলে ভুল হবে। কারণ একই সময়ে একজন অভিনেতার এমন ধারাবাহিক জনপ্রিয়তা বাংলাদেশি চলচ্চিত্রে খুব কমই দেখা গেছে।

তাঁর সিনেমা মুক্তি পাওয়া মানেই ছিল দর্শকের আলাদা আগ্রহ।

নায়ক মানে শুধু অভিনয় নয়, একটি স্টাইল

সালমান শাহর জনপ্রিয়তার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল—তিনি শুধু সিনেমার গল্পের নায়ক ছিলেন না; তিনি হয়ে উঠেছিলেন ফ্যাশন আইকন।

চুলের কাট, সানগ্লাস, টি-শার্ট, জিনস, জ্যাকেট, হাঁটার ভঙ্গি—সবকিছুই তরুণদের মধ্যে অনুসরণযোগ্য হয়ে উঠেছিল।

আজও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর পুরোনো ছবি ও সিনেমার দৃশ্য নতুন করে ভাইরাল হয়। তাঁর প্রভাব শুধু একটি প্রজন্মে থেমে থাকেনি; পরবর্তী প্রজন্মের অভিনেতারাও তাঁর অভিনয় ও স্টাইল থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়ার কথা বলেছেন।

এই জায়গাতেই সালমান শাহ অন্য অনেক তারকা থেকে আলাদা। তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল চলচ্চিত্র, সংগীত, ফ্যাশন ও তারকা-সংস্কৃতির সম্মিলিত প্রভাব।

১৯৯৬: যে সকাল বদলে দিল সবকিছু

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সালমান শাহর ইস্কাটনের বাসায় তাঁর মরদেহ পাওয়া যায়। তখন তাঁর বয়স মাত্র ২৫ বছর।

মাত্র ২৫ বছরের একজন তারকার এমন মৃত্যু দেশজুড়ে শোক ও বিস্ময়ের জন্ম দেয়। খুব অল্প বয়সে এমন জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে যাওয়া এই নায়কের আকস্মিক মৃত্যু ভক্তদের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই এক গভীর আঘাত হয়ে আছে।

প্রথমদিকে ঘটনাটি অস্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবে মামলা হয়। সালমানের পরিবার দীর্ঘদিন ধরে তাঁর মৃত্যু নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসছিল এবং ঘটনাটিকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে তদন্তের দাবি জানিয়ে আসছিল।

বছরের পর বছর বিভিন্ন তদন্ত, আদালতের আদেশ এবং পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের কারণে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে বিতর্ক আরও দীর্ঘ হয়েছে।

৩০ বছর পর মামলায় নতুন মোড়

সালমান শাহর মৃত্যুর প্রায় ২৯ বছর পর, ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত আগের অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা বাতিল করে ঘটনাটিকে হত্যা মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করার নির্দেশ দেন। আদালতের ওই আদেশের পর ২১ অক্টোবর সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম, তাঁর মা নীলা চৌধুরীর পক্ষে, রাজধানীর রমনা থানায় ১১ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন।

মামলায় আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সালমানের সাবেক স্ত্রী সামিরা হক, অভিনেতা আশরাফুল হক ডন, ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই এবং আরও কয়েকজন।

তবে মামলা হওয়া মানেই অভিযুক্তরা দোষী—এমন নয়। অভিযোগগুলো এখনো তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার অধীন।

বন্ধু ডন গ্রেপ্তার, আবার আলোচনায় পুরোনো ঘটনা

মামলায় সবচেয়ে আলোচিত সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর একটি হলো অভিনেতা আশরাফুল হক ওরফে ডনের গ্রেপ্তার।

৯ আগস্ট ২০২৬ সকালে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সৌদি আরব যাওয়ার প্রস্তুতির সময় ইমিগ্রেশন পুলিশ তাঁকে আটক করে। পরে তাঁকে সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং আদালতের আদেশে কারাগারে পাঠানো হয়।

ডন ও সালমান শাহ ছিলেন ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং একসঙ্গে অন্তত ১৩টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন। ফলে তাঁর গ্রেপ্তার মামলাটিকে আবারও জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।

ডনের জামিন আবেদন আদালত নাকচ করে। পরে ২৭ আগস্ট তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়।

সিআইডি এর আগে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেছিল।

তদন্ত এখনো শেষ হয়নি

সালমান শাহ হত্যা মামলার তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময়সীমা একাধিকবার পরিবর্তিত হয়েছে। সর্বশেষ ৩০ আগস্ট প্রতিবেদন দাখিল করা সম্ভব না হওয়ায় আদালত ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন। এটিই প্রতিবেদন জমার নবমবারের মতো সময় পেছানোর ঘটনা বলে প্রথম আলো জানিয়েছে।

অন্যদিকে, সালমান শাহর দেহাবশেষ উত্তোলনের বিষয়েও আদালতে আবেদন হয়েছিল। ২০২৬ সালের জুনে তাঁর মামার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আগের দেহাবশেষ উত্তোলনের আদেশ বাতিল চেয়ে করা আবেদন আদালত নথিভুক্ত করে।

অর্থাৎ তিন দশক পরও মামলাটি এখনো তদন্তাধীন এবং এর চূড়ান্ত আইনি নিষ্পত্তি হয়নি।

রহস্যের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে একজন শিল্পীর উত্তরাধিকার

সালমান শাহর মৃত্যুকে ঘিরে যত বিতর্কই থাকুক, তাঁর শিল্পীজীবন নিয়ে বিতর্ক তুলনামূলকভাবে কম।

তিনি এমন এক সময়ে এসেছিলেন, যখন বাংলাদেশের সিনেমা পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে ছিল। মাত্র চার বছরে তিনি যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন, তা দেখায়—তিনি হয়তো শুধু একজন সফল নায়ক ছিলেন না; তাঁর মধ্যে ছিল সময়কে প্রভাবিত করার ক্ষমতাও।

আজ তাঁর মৃত্যুর ৩০ বছর পরও তিনি আলোচনায় থাকেন।

কখনো তাঁর অভিনয় নিয়ে।

কখনো তাঁর গান নিয়ে।

কখনো তাঁর ফ্যাশন নিয়ে।

আর এখনো সবচেয়ে বেশি—তাঁর অসমাপ্ত জীবনের সম্ভাবনা নিয়ে।

যদি সালমান শাহ আজ বেঁচে থাকতেন?

এই প্রশ্নের উত্তর কেউ নিশ্চিতভাবে দিতে পারবেন না।

তবে তাঁর চার বছরের ক্যারিয়ার যদি ৩০ বছর বা তারও বেশি সময় চলত, তাহলে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে তাঁর অবস্থান যে আরও বড় হতো, সেটি অনুমান করা কঠিন নয়।

তিনি সম্ভবত আরও অনেক নতুন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করতেন। চলচ্চিত্রের ভাষা বদলের সঙ্গে নিজেকেও বদলাতেন। প্রযোজনা বা পরিচালনায় যেতেন কি না, তাও কল্পনার বিষয়। কিন্তু তাঁর প্রজন্মে যে তারকা-ক্ষমতা তিনি দেখিয়েছিলেন, তা দীর্ঘ ক্যারিয়ার পেলে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সিনেমার ওপর আরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারত।

বাংলাদেশি চলচ্চিত্রে যে শূন্যতা তাঁর মৃত্যুর পর তৈরি হয়েছিল, সেটি আজও অনেকের কাছে অনুভবযোগ্য।

তাই সালমান শাহকে শুধু ‘অকালপ্রয়াত নায়ক’ হিসেবে মনে রাখলে তাঁর প্রতি সুবিচার হয় না।

তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের এমন এক অধ্যায়, যার শেষ পৃষ্ঠা লেখা হয়নি।

জন্মদিনে সালমান শাহকে শুভেচ্ছা

১৯ সেপ্টেম্বর তাঁর জন্মদিন।

যদি তিনি আজ বেঁচে থাকতেন, ২০২৬ সালে তাঁর বয়স হতো ৫৫ বছর।

হয়তো তখন তিনি শুধু ‘নায়ক সালমান শাহ’ থাকতেন না—হয়ে উঠতেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের একজন অভিজ্ঞ অভিনেতা, নির্মাতা কিংবা চলচ্চিত্র-ব্যক্তিত্ব।

কেমন হতো সেই সালমান শাহকে দেখা—তার উত্তর আমাদের জানা নেই।

আমরা শুধু জানি, তিনি মাত্র ২৫ বছর বয়সে চলে গিয়েও তিন দশক ধরে বেঁচে আছেন দর্শকের স্মৃতিতে।

জন্মদিনে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সেই স্বপ্নের নায়ক সালমান শাহকে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

শুভ জন্মদিন, সালমান শাহ।

আপনি ছিলেন অল্প সময়ের এক দীর্ঘস্থায়ী গল্প—আর সেই গল্পের পরিসমাপ্তি আজও হয়নি।

তথ্যসূত্র: The Daily Star, প্রথম আলো, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (BSS), এবং আদালত ও সংশ্লিষ্ট তদন্তের প্রকাশিত তথ্য।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments