একজন মানুষকে আমরা যে পরিচয়ে সবচেয়ে বেশি দেখি, তিনি কি সত্যিই শুধু সেই মানুষটিই? নাকি জনপ্রিয়তার আলো অনেক সময় তাঁর অন্য সৃষ্টিশীল পরিচয়গুলোকে অন্ধকারে ঠেলে দেয়?
ঢাকা | ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কখনো কখনো একটি বাক্য একটি সম্পূর্ণ সময়কে ব্যাখ্যা করে।
হুমায়ূন ফরীদিকে ঘিরে বহুদিন ধরে প্রচলিত একটি স্মৃতিচারণে “পেটের দায়” কথাটি ফিরে আসে। থিয়েটারের দিনগুলোতে রিকশা, টেলিভিশনে ট্যাক্সি, আর চলচ্চিত্রে এসে নিজের গাড়ি—এই বর্ণনার ভেতর দিয়ে শিল্পের সঙ্গে জীবিকার এক সরল অথচ নির্মম সম্পর্কের ছবি আঁকা হয়। তবে এই বক্তব্যটির মূল সাক্ষাৎকার-উৎস সহজলভ্য না হওয়ায় এটিকে প্রামাণ্য উদ্ধৃতি নয়, বহুল প্রচলিত স্মৃতিচারণ হিসেবেই দেখা উচিত।
তবু কথাটির তাৎপর্য অস্বীকার করা যায় না।
একজন শিল্পী যত বড় প্রতিভাবানই হোন, তাঁর জীবন কেবল সৃষ্টির নয়। তাঁরও বাড়িভাড়া আছে, চিকিৎসার প্রয়োজন আছে, পরিবার আছে, দৈনন্দিন ব্যয় আছে, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা আছে। শিল্পের নন্দনশাস্ত্র যতই উচ্চমার্গীয় হোক, শিল্পীর শরীর ও জীবন শেষ পর্যন্ত অর্থনীতির ভেতরেই বসবাস করে।
এই জায়গাটিই বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্যকে বোঝার ক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি—আমরা শিল্পকে ভালোবাসতে পারি, কিন্তু শিল্পীর জীবিকার প্রশ্নটি কতটা গুরুত্ব দিয়ে ভাবি?
শিল্পের সঙ্গে জীবিকার সেই পুরোনো দ্বন্দ্ব
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এমন মানুষের সংখ্যা কম নয়, যাঁদের প্রতিভার পরিসর তাঁদের জনপ্রিয় পরিচয়ের চেয়ে অনেক বড়।
কেউ কবি, পাশাপাশি অভিনেতা। কেউ গীতিকার, পাশাপাশি অভিনয়শিল্পী। কেউ মঞ্চকর্মী, পরে টেলিভিশনের পরিচিত মুখ। কেউ সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি বিজ্ঞাপন, উপস্থাপনা বা অন্য কোনো কাজ করেছেন।
এটি অস্বাভাবিক নয়। পৃথিবীর বহু শিল্পীই একাধিক মাধ্যমে কাজ করেছেন এবং করেন।
সমস্যা অন্য জায়গায়।
একজন শিল্পীর বহুমাত্রিক পরিচয় যখন তাঁর জীবিকার প্রয়োজন, বাজারের চাহিদা কিংবা জনপ্রিয় মাধ্যমের কারণে একটিমাত্র পরিচয়ে সংকুচিত হয়ে যায়, তখন শুধু একজন শিল্পীর পরিচয়ই সংকুচিত হয় না—একটি সমাজের সাংস্কৃতিক স্মৃতিও সংকুচিত হয়।
আমরা মানুষকে মনে রাখি তাঁর সবচেয়ে দৃশ্যমান কাজ দিয়ে। কিন্তু দৃশ্যমান আর গুরুত্বপূর্ণ—এই দুটি শব্দ সবসময় একই অর্থ বহন করে না।
রিফাত চৌধুরী: অভিনেতার আড়ালে যে কবি
বর্তমান সময়ে কবি ও অভিনেতা রিফাত চৌধুরীকে ঘিরে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, সেটি এই প্রশ্নটিকে নতুন করে সামনে এনেছে।
১৯৮০-এর দশক থেকে সাহিত্যচর্চা শুরু করা রিফাত চৌধুরী লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ আলিঙ্গনের নাম প্রকাশিত হয় ১৯৮৪ সালে। সাহিত্যজগতে তাঁর দীর্ঘ উপস্থিতির পাশাপাশি চার দশকের অভিনয়জীবনে তিনি পাঁচ শতাধিক নাটকে অভিনয় করেছেন বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ, তাঁর জীবনকে শুধু “অভিনেতা রিফাত চৌধুরী” বলে চিহ্নিত করলে তাঁর একটি বড় সৃষ্টিশীল পরিচয় অনিবার্যভাবেই আড়ালে পড়ে যায়।
কৌতূহলের বিষয় হলো, তিনিই সম্প্রতি বলেছেন—তিনি কখনো অভিনেতা হতে চাননি; আর্থিক প্রয়োজনেই ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, লেখালেখিই তাঁর মূল প্যাশন।
এই বক্তব্য আমাদের প্রচলিত পরিচয়ের রাজনীতিকে একটু থামিয়ে ভাবতে বাধ্য করে।
যে মানুষটিকে দর্শক অভিনেতা হিসেবে চেনে, তাঁর নিজের কাছে হয়তো অভিনয় ছিল জীবিকা; আর কবিতা ছিল তাঁর আত্মপরিচয়ের কেন্দ্র।
তাহলে একজন মানুষ আসলে কে?
সমাজ যাকে বলে সে?
নাকি মানুষটি নিজেকে যেভাবে বোঝেন, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ?
সম্ভবত দুটোই।
কিন্তু গণমাধ্যমের একটি ভূমিকা আছে—একজন মানুষের বহুমাত্রিক পরিচয়কে যতটা সম্ভব পূর্ণতায় পাঠকের সামনে তুলে ধরা।
সাম্প্রতিক সময়ে প্রথম আলো রিফাত চৌধুরীকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে “কেবিন নম্বর ১০৩, এখন কেমন আছেন ৫০০ নাটকের অভিনেতা রিফাত চৌধুরী” শিরোনামে। প্রতিবেদনটিতেই তাঁর কবি পরিচয়, দীর্ঘ অভিনয়জীবন এবং অভিনয়ে আসার আর্থিক কারণ—সবকিছুর উল্লেখ রয়েছে।
অতএব, সমস্যাটি গণমাধ্যমকে এককভাবে দায়ী করা নয়। বরং জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে কোন পরিচয়টি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, সেটি বোঝা জরুরি।
জনপ্রিয়তা কি শিল্পীর সম্পূর্ণ পরিচয়?
একজন মানুষ টেলিভিশনে জনপ্রিয় হলে দর্শক তাঁকে সেই চরিত্র দিয়েই মনে রাখে।
এটি স্বাভাবিক।
‘সিক্সটি নাইন’-এর ‘জাতীয় কাকা’ চরিত্র রিফাত চৌধুরীকে বিপুল দর্শকপরিচিতি দিয়েছে—এমন তথ্যও সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে রয়েছে।
কিন্তু জনপ্রিয় একটি চরিত্র একজন শিল্পীর পূর্ণ পরিচয় নয়।
বরং কখনো কখনো জনপ্রিয়তাই শিল্পীর অদৃশ্য পরিচয়গুলোকে ঢেকে দেয়।
এই জায়গায় আমাদের সাংস্কৃতিক স্মৃতির একটি মৌলিক সীমাবদ্ধতা আছে। দর্শক যা বেশি দেখেছে, সেটিই সে বেশি মনে রাখে। বইয়ের পাঠকসংখ্যা, কবিতার প্রচার, ছোটকাগজের ইতিহাস, মঞ্চের কাজ কিংবা দীর্ঘদিনের নীরব সাহিত্যচর্চা—এসবের অনেক কিছুই জনপ্রিয় বিনোদনের তুলনায় ধীরে চলা জগৎ।
ফলে একজন শিল্পীর সবচেয়ে গভীর কাজটি অনেক সময় তাঁর সবচেয়ে পরিচিত কাজ হয়ে উঠতে পারে না।
মারজুক রাসেল: কবিতা থেকে পর্দায়
মারজুক রাসেলের ক্ষেত্রেও একই ধরনের দ্বৈততা চোখে পড়ে।
বাংলাদেশের সাহিত্য ও বিনোদন—দুই পরিসরেই তিনি পরিচিত। তাঁর কবিতা বিভিন্ন সময়ে প্রথম আলোর সাহিত্য পাতাতেও প্রকাশিত হয়েছে; তাঁকে নিয়ে সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারগুলোতেও কবিতা, গান ও অভিনয়—এই তিন পরিচয়ের কথাই উঠে এসেছে।
তাঁর অভিনয়ের সবচেয়ে দৃশ্যমান পরিচয় তৈরি হয়েছে টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। জনপ্রিয় ধারাবাহিক ব্যাচেলর পয়েন্ট-এর মতো কাজ তাঁকে নতুন প্রজন্মের বড় একটি অংশের কাছে আরও পরিচিত করেছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে।
জনপ্রিয় কোনো নাটক বা চরিত্রকে নৈতিক কিংবা নান্দনিকভাবে “উচ্চ” বা “নিম্ন” বলে চূড়ান্ত রায় দেওয়ার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—একজন শিল্পীর অন্য কাজগুলো কি একই সঙ্গে আমাদের স্মৃতিতে জায়গা পাচ্ছে?
মারজুক রাসেলের ক্ষেত্রে উত্তরটি সহজ নয়।
তাঁর অভিনয় জনপ্রিয়—এটি একটি দৃশ্যমান বাস্তবতা। তাঁর কবিতারও একটি স্বতন্ত্র পাঠকগোষ্ঠী আছে। তাঁর লেখা কবিতা ও গান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। প্রথম আলোর সাহিত্য বিভাগে তাঁর কবিতা প্রকাশের নথিও তা দেখায়।
তবু সামাজিক স্মৃতিতে জনপ্রিয় অভিনেতা পরিচয়টি অনেক সময় কবি ও গীতিকারের পরিচয়কে ছাপিয়ে যায়।
এখানে মারজুকের কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নেই।
বরং এটি আমাদের পাঠাভ্যাসের আয়না।
আমরা কি একজন শিল্পীর বই পড়েছি?
নাকি শুধু তাঁর অভিনয় দেখেছি?
ফরীদিকে আমরা কতটা মনে রেখেছি?
হুমায়ূন ফরীদি বাংলাদেশের অভিনয়ের ইতিহাসে একটি অনন্য নাম।
মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র—তিন ক্ষেত্রেই তিনি কাজ করেছেন। ‘ভাঙনের শব্দ শুনি’-এর সেরাজ তালুকদার, ‘সংশপ্তক’-এর কানকাটা রমজান এবং চলচ্চিত্রের বিভিন্ন চরিত্র তাঁকে বিস্তৃত দর্শকসমাজের কাছে পৌঁছে দেয়।
কিন্তু ফরীদির অভিনয়শক্তিকে কেবল তাঁর জনপ্রিয় খলচরিত্র দিয়ে বোঝা যায় না।
মঞ্চের অভিনেতা ফরীদি ছিলেন আলাদা এক অভিজ্ঞতা। তাঁর কণ্ঠ, শরীরী ভাষা, বিরতি, দৃষ্টি—সবকিছু মিলে চরিত্রকে একটি স্বতন্ত্র উপস্থিতি দেওয়ার ক্ষমতা ছিল তাঁর অভিনয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
তাঁর জনপ্রিয়তা এতটাই ব্যাপক ছিল যে খলচরিত্রও তাঁর হাতে দর্শকের আগ্রহের কেন্দ্রে উঠে আসত। কিন্তু সেই জনপ্রিয়তাই আবার একটি বিপরীত ঘটনাও ঘটিয়েছে—অনেক দর্শকের কাছে “হুমায়ূন ফরীদি” নামটি ধীরে ধীরে কিছু নির্দিষ্ট জনপ্রিয় চরিত্রের সমার্থক হয়ে গেছে।
অথচ একজন শিল্পীর জীবন তাঁর জনপ্রিয় চরিত্রের চেয়ে অনেক বড়।
রাষ্ট্রও শেষ পর্যন্ত তাঁকে তাঁর কাজের জন্য স্বীকৃতি দিয়েছে। ২০১৮ সালে তিনি মরণোত্তর একুশে পদক পান।
এই স্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু এখানেও একটি প্রশ্ন থেকে যায়—শিল্পীর স্বীকৃতি কি শুধু মৃত্যুর পরের পুরস্কারে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি তাঁর জীবদ্দশার সৃষ্টিশীল নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গেও এর সম্পর্ক থাকবে?
রাষ্ট্রের দায়িত্ব কোথায়?
এখানে সবচেয়ে সতর্ক হওয়া দরকার।
“রাষ্ট্র শিল্পীর দায়িত্ব নিক”—বাক্যটি আবেগের জায়গা থেকে শক্তিশালী। কিন্তু নীতির জায়গা থেকে এটি অসম্পূর্ণ।
রাষ্ট্র কি প্রত্যেক কবি, অভিনেতা বা শিল্পীর ব্যক্তিগত জীবিকার দায়িত্ব নেবে?
তা বাস্তবসম্মত নয়। এবং সব ক্ষেত্রেই তা প্রয়োজনীয়ও নয়।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—রিফাত চৌধুরী নিজেই সম্প্রতি বলেছেন, সরকার আর্থিক সহায়তা দিলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করবেন; তাঁর যুক্তি, রাষ্ট্রের অর্থও জনগণের অর্থ। তিনি বরং ব্যক্তি ও সমাজের সহায়তাকে ভিন্নভাবে দেখেছেন।
এই বক্তব্য রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে আলোচনাকে আরও পরিণত করে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব সম্ভবত কোনো নির্দিষ্ট শিল্পীর হাতে অনুদানের খাম তুলে দেওয়া নয়।
বরং এমন একটি কাঠামো তৈরি করা, যেখানে শিল্পীর প্রয়োজন হলে তিনি সহায়তা পাওয়ার একটি স্বচ্ছ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্বাধীন প্রাতিষ্ঠানিক পথ পান।
যেখানে থাকবে কপিরাইটের কার্যকর সুরক্ষা, শিল্পীদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তার সুযোগ, সাংস্কৃতিক তহবিলের স্বচ্ছতা, আর্কাইভ ও সংরক্ষণ, বই ও প্রকাশনা শিল্পের উন্নয়ন, মঞ্চশিল্পের অবকাঠামো এবং তরুণ শিল্পীদের বিকল্প আয়ের পথ।
রাষ্ট্রের কাজ শিল্পীর হয়ে শিল্প সৃষ্টি করা নয়।
রাষ্ট্রের কাজ এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে শিল্পী কেবল বেঁচে থাকার জন্য নিজের সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় আপস করতে বাধ্য না হন।
বাজারও কি দায়মুক্ত?
শুধু রাষ্ট্রের দিকে তাকিয়েও এই সমস্যার সমাধান হবে না।
কারণ শিল্পের একটি বড় অংশ পরিচালিত হয় বাজার দিয়ে।
যে গান বেশি শোনা হয়, যে নাটক বেশি দেখা হয়, যে অভিনেতার জনপ্রিয়তা বেশি, যে বই বেশি বিক্রি হয়—বাজার স্বাভাবিকভাবেই তার দিকে ঝুঁকে যায়।
এখানে বাজারকে দোষ দেওয়া অর্থহীন।
কিন্তু বাজার যা পুরস্কৃত করে, সমাজ যদি কেবল সেটিকেই মূল্যবান বলে ধরে নেয়, তখন সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সংকুচিত হতে পারে।
একটি কবিতার বই হয়তো লাখো মানুষ পড়বে না।
একটি মঞ্চনাটক হয়তো কোটি ভিউ পাবে না।
একজন সাহিত্যিকের গবেষণার বাজার হয়তো ক্ষুদ্র হবে।
তবু তার সাংস্কৃতিক মূল্য থাকতে পারে।
এই পার্থক্যটিই গুরুত্বপূর্ণ—বাজারমূল্য আর সাংস্কৃতিক মূল্য একই জিনিস নয়।
শিল্পীর পরিচয় কি আমরা সংরক্ষণ করছি?
একজন কবি মারা গেলে তাঁর কবিতা বইয়ে থেকে যেতে পারে।
একজন অভিনেতা মারা গেলে তাঁর চলচ্চিত্র বা নাটক সংরক্ষিত থাকতে পারে।
কিন্তু একজন বহুমাত্রিক শিল্পীর ক্ষেত্রে বিপদ আরও সূক্ষ্ম।
তাঁর একটি পরিচয় থেকে যায়, অন্যটি হারিয়ে যায়।
মানুষ মনে রাখে অভিনেতাকে, ভুলে যায় কবিকে।
মনে রাখে জনপ্রিয় চরিত্রকে, ভুলে যায় মঞ্চাভিনেতাকে।
মনে রাখে গানটিকে, ভুলে যায় গীতিকারকে।
এই ভুলে যাওয়াটা সবসময় ইচ্ছাকৃত নয়।
এটি ঘটে কারণ সাংস্কৃতিক স্মৃতি অনেক সময় আর্কাইভের চেয়ে জনপ্রিয়তার ওপর বেশি নির্ভর করে।
সুতরাং শিল্পীর উত্তরাধিকার রক্ষার কাজ কেবল পুরস্কার প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।
প্রয়োজন ডিজিটাল আর্কাইভ।
প্রয়োজন পুরোনো নাটক ও চলচ্চিত্রের সংরক্ষণ।
প্রয়োজন কবিতা ও পাণ্ডুলিপির সহজলভ্যতা।
প্রয়োজন গবেষণা।
প্রয়োজন পাঠ্যক্রমে স্থান।
প্রয়োজন গণমাধ্যমে শিল্পীর বহুমাত্রিক কাজ নিয়ে নিয়মিত আলোচনা।
আজকের দর্শক, আগামী দিনের স্মৃতি
ডিজিটাল যুগে এই প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অ্যালগরিদম আমাদের সামনে সেই জিনিসই বারবার নিয়ে আসে, যেটি আমরা আগে দেখেছি বা যার প্রতি বেশি প্রতিক্রিয়া দিয়েছি।
ফলে একজন শিল্পীর একটি চরিত্র, একটি সংলাপ, একটি ভিডিও বা একটি দৃশ্য কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে; কিন্তু একই শিল্পীর বহু বছরের সাহিত্যচর্চা হয়তো কয়েক হাজার পাঠকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
জনপ্রিয়তা তাই এখন শুধু মানুষের স্মৃতি দিয়ে তৈরি হয় না—প্রযুক্তিও সেই স্মৃতি নির্মাণে অংশ নেয়।
এই নতুন বাস্তবতায় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব আরও বেড়েছে।
কারণ অ্যালগরিদম জনপ্রিয়তা তৈরি করতে পারে, কিন্তু সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার তৈরি করার জন্য মানুষের সচেতন সিদ্ধান্ত দরকার।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শিল্পীর নয়, আমাদের
রিফাত চৌধুরীর বর্তমান অসুস্থতা আমাদের তাঁর দিকে তাকাতে বাধ্য করেছে।
প্রথম আলো জানিয়েছে, ১৪ সেপ্টেম্বর তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন; পরে কেবিনে চিকিৎসা নেন। একই সময়ে অন্য প্রতিবেদনগুলোতেও তাঁর অসুস্থতা ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার তথ্য এসেছে।
কিন্তু একজন শিল্পীকে আমরা কেবল তাঁর অসুস্থতার সময়ে আবিষ্কার করব কেন?
কেন তাঁর কবিতা নিয়ে আলোচনার জন্য তাঁকে অসুস্থ হতে হবে?
কেন তাঁর বহুমাত্রিক শিল্পীসত্তাকে নতুন করে মনে করার জন্য কোনো সংকটের প্রয়োজন হবে?
এই প্রশ্নগুলো রিফাত চৌধুরীর একার নয়।
হুমায়ূন ফরীদি থেকে মারজুক রাসেল—বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জগতে এমন বহু মানুষ আছেন, যাঁদের আমরা একটি পরিচয়ে চিনি, অথচ তাঁদের সৃষ্টিশীল জীবন তার চেয়ে অনেক বড়।
শিল্পী যখন জীবিকার জন্য অন্য কাজ করেন, সেটি তাঁর শিল্পের পরাজয় নয়।
বরং অনেক সময় সেটিই তাঁর শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার উপায়।
আর আমাদের দায়িত্ব হলো সেই মানুষটিকে তাঁর পেশার সবচেয়ে দৃশ্যমান পরিচয়ের মধ্যে আটকে না রাখা।
একজন কবি অভিনয় করতে পারেন।
একজন অভিনেতা কবিতা লিখতে পারেন।
একজন গীতিকার পর্দায় চরিত্র হয়ে উঠতে পারেন।
একজন মঞ্চশিল্পী বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে কাজ করতে পারেন।
এসবের কোনোটিই তাঁর অন্য পরিচয়কে বাতিল করে না।
বরং একজন শিল্পীর বহুমাত্রিকতাই তাঁর প্রকৃত সম্পদ।
হুমায়ূন ফরীদির “পেটের দায়” নিয়ে প্রচলিত গল্প হোক কিংবা রিফাত চৌধুরীর নিজের স্বীকারোক্তি—দুটিই শেষ পর্যন্ত একই প্রশ্নের দিকে নিয়ে যায়:
একজন মানুষ শিল্পী হয়ে জন্ম নেন না; তিনি শিল্পী হয়ে ওঠেন দীর্ঘ সাধনা, শ্রম, ত্যাগ এবং জীবনের বিনিময়ে। সেই জীবনের ন্যূনতম মর্যাদা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার?
সম্ভবত উত্তরটি শুধু রাষ্ট্রের কাছে নেই, শুধু বাজারের কাছেও নেই।
উত্তরটি আমাদের সাংস্কৃতিক আচরণের মধ্যেও আছে।
আমরা কী পড়ি।
কী দেখি।
কাকে মনে রাখি।
কোন শিল্পের জন্য টাকা খরচ করি।
কোন শিল্পীকে তাঁর জনপ্রিয় চরিত্রের বাইরে গিয়ে আবিষ্কার করি।
শেষ পর্যন্ত একটি সমাজ তার শিল্পীদের কতটা সম্মান করে, তা শুধু রাষ্ট্রীয় পদক দিয়ে মাপা যায় না।
মাপা যায়—তাদের বেঁচে থাকার সময়টুকুতে আমরা তাদের কতটা দেখি, শুনি এবং পড়ি।
রিফাত চৌধুরীর দ্রুত সুস্থতা কামনা করি।
আর তাঁর মতো শিল্পীদের জন্য কামনা করি এমন একটি সাংস্কৃতিক পরিবেশ, যেখানে কোনো কবিকে তাঁর কবিতা ভুলে গিয়ে শুধু অভিনেতা হিসেবে, কোনো অভিনেতাকে তাঁর মঞ্চ ভুলে গিয়ে শুধু পর্দার চরিত্র হিসেবে, কিংবা কোনো গীতিকারকে তাঁর গান ভুলে গিয়ে শুধু জনপ্রিয় মুখ হিসেবে মনে রাখতে না হয়।
কারণ শিল্পীর সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর জনপ্রিয়তা নয়।
তাঁর রেখে যাওয়া কাজ।




