রংপুরের শিশুটির অসুস্থতার সঙ্গে হাঁস-মুরগির সংস্পর্শের তথ্য; ২০০৩ সাল থেকে দেশে মানব সংক্রমণ ১৭টি
বাংলাদেশে চলতি বছরে মানবদেহে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা এ(H5N1) বা বার্ড ফ্লুর চতুর্থ সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নতুন আক্রান্ত শিশুটি রংপুর বিভাগের বাসিন্দা। এ বছর বাংলাদেশে শনাক্ত চারজনই শিশু। নতুন আক্রান্ত শিশুটি হাঁস ও মুরগির সংস্পর্শে ছিল এবং অসুস্থ হওয়ার পর হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়। রিপোর্ট তৈরির সময় শিশুটির শারীরিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছিল।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য নিয়ে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ২০০৩ সাল থেকে এখন পর্যন্ত মানবদেহে H5N1 সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে ১৭টি। এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে দুজনের—একজন ২০১৩ সালে এবং আরেকজন ২০২৬ সালের শুরুতে। অর্থাৎ ২০২৬ সালের চারটি সংক্রমণের মধ্যে এখন পর্যন্ত একটি মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হয়েছে।
হাঁস-মুরগির সংস্পর্শকে গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা
নতুন আক্রান্ত শিশুটির কোনো সাম্প্রতিক বিদেশ ভ্রমণের ইতিহাস ছিল না। তবে বাড়ি ও আশপাশের এলাকায় হাঁস-মুরগির সংস্পর্শে ছিল। এ কারণে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক মানব H5N1 সংক্রমণের ক্ষেত্রে সরাসরি পোলট্রির সংস্পর্শকে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। আইইডিসিআরের পরিচালক কাজী আহমেদ জাকি বলেছেন, আক্রান্তদের ক্ষেত্রে হাঁস-মুরগির সংস্পর্শের সঙ্গে যোগসূত্র পাওয়া গেছে এবং খাবার খাওয়ার চেয়ে অসুস্থ পাখির সরাসরি সংস্পর্শ বেশি সম্ভাব্য উৎস।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অসুস্থ বা মৃত হাঁস-মুরগি হাতে ধরা, জবাই করা বা খুব কাছে থাকার সময় ভাইরাস শরীরে ঢুকতে পারে। তবে ঠিকমতো রান্না করা মুরগির মাংস বা ডিম খেলে H5N1 সংক্রমণের ঝুঁকি নেই বলে আইইডিসিআরের বক্তব্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
শিশুদের জন্য বাড়তি সতর্কতা
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ মুশতাক হুসাইন বলেছেন, গ্রামাঞ্চলের শিশুরা বাড়ির হাঁস-মুরগির সঙ্গে বেশি সময় কাটায়, ফলে তাদের সরাসরি সংস্পর্শের সুযোগও বেশি। তার পরামর্শ, শিশুদের অসুস্থ বা মৃত হাঁস-মুরগি থেকে দূরে রাখা এবং পোলট্রি খামার, বাজার ও বিক্রয়কেন্দ্রে নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেছেন, পোলট্রি শ্রমিক ও জীবন্ত পাখি বিক্রেতাদের সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার এবং কাজ শেষে হাত ধোয়ার অভ্যাস জোরদার করা দরকার। আক্রান্ত পাখি শনাক্ত হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া এবং খামারগুলোতে নিয়মিত পরীক্ষা বাড়ানোর ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে ছড়াচ্ছে কি
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মূল্যায়নে বাংলাদেশসহ সংশ্লিষ্ট H5N1 ঘটনাগুলোর কোনো ক্ষেত্রেই দীর্ঘস্থায়ী মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। নতুন আক্রান্ত রংপুরের শিশুর ক্ষেত্রেও এখন পর্যন্ত এমন কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
তবে H5N1 একটি প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়াতে পারে এমন ভাইরাস। তাই পোলট্রি খাতে নজরদারি দুর্বল হলে নতুন মানব সংক্রমণের ঝুঁকি থেকেই যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০০৩ থেকে ২০২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে এ পর্যন্ত ১ হাজার ৩টি মানব H5N1 সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে এবং ৪৭৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।
বাংলাদেশে চলতি বছরে চারটি মানব সংক্রমণের সবগুলোই শিশুদের মধ্যে শনাক্ত হওয়ায় এখন নজর রয়েছে পোলট্রি নজরদারি, রোগ শনাক্তকরণ এবং আক্রান্ত প্রাণীর সংস্পর্শ এড়ানোর ওপর। বর্তমানে মানব থেকে মানব সংক্রমণের প্রমাণ না থাকলেও নতুন সংক্রমণগুলোকে স্বাস্থ্য বিভাগ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে।
তথ্যসূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা; আইইডিসিআর; দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড; ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর ডিজিজ প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোল।




