Homeটুডে নেশনহাফেজদের দেওয়া ‘নেক্সাস’ বই কেন ফেরত নেওয়া হলো?

হাফেজদের দেওয়া ‘নেক্সাস’ বই কেন ফেরত নেওয়া হলো?

ইউভাল নোয়াহ হারারির বইয়ে কী আছে, আর কোন বিষয়টি নিয়ে তৈরি হয় বিতর্ক

ঢাকা | TODAY TV BD | জাতীয়

সৌদি আরবে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক পবিত্র কোরআন প্রতিযোগিতায় বিজয়ী বাংলাদেশি হাফেজদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে উপহার হিসেবে দেওয়া ইউভাল নোয়াহ হারারির ‘নেক্সাস’ বইটি ফেরত নিয়েছে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়। বইটি দেওয়ার পর বিভিন্ন মহলে সমালোচনা শুরু হলে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) বিজয়ী হাফেজদের কাছ থেকে বইগুলো ফেরত নেন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ শামীম কায়সার।

ধর্ম মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে বই ফেরত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে হাফেজদের জন্য ঘোষিত আন্তর্জাতিক সফর, সহায়তা ও অন্যান্য প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কাজ চলমান রয়েছে।

কোথা থেকে শুরু বিতর্ক

সৌদি আরবে অনুষ্ঠিত ৪৬তম বাদশাহ আবদুল আজিজ আন্তর্জাতিক পবিত্র কোরআন প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশি কয়েকজন হাফেজ সাফল্য অর্জন করেন। তাঁদের সম্মান জানাতে ১৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় একটি সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠানে বিজয়ী হাফেজদের বিভিন্ন উপহারের সঙ্গে ইউভাল নোয়াহ হারারির ‘নেক্সাস’ বইও দেওয়া হয়। বই দেওয়ার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশসহ কয়েকটি ইসলামপন্থি সংগঠন আপত্তি জানায়। তাদের বক্তব্য, কোরআন প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হাফেজদের অনুষ্ঠানে এমন একটি বই দেওয়া যথাযথ হয়নি।

এরপরই বইগুলো ফেরত নেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানায় ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়।

‘নেক্সাস’ আসলে কী ধরনের বই

‘নেক্সাস’ কোনো ধর্মীয় বই নয়। বইটির পূর্ণ নাম ‘Nexus: A Brief History of Information Networks from the Stone Age to AI’। ২০২৪ সালে প্রকাশিত এই বইয়ে মানুষের ইতিহাসে তথ্য কীভাবে ছড়িয়েছে এবং তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সমাজ, রাজনীতি, প্রতিষ্ঠান ও ক্ষমতার কাঠামো কীভাবে তৈরি হয়েছে—তা বিশ্লেষণ করেছেন হারারি।

বইটির আরেকটি বড় বিষয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। লেখক দেখিয়েছেন, প্রাচীন সমাজের গল্প, ধর্মীয় গ্রন্থ ও প্রশাসনিক নথি থেকে শুরু করে আধুনিক কম্পিউটার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—সবই এক অর্থে তথ্যের নেটওয়ার্ক তৈরি করে। সেই নেটওয়ার্ক মানুষের আচরণ ও সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

বইয়ে ধর্মের প্রসঙ্গ কেন এসেছে

‘নেক্সাস’-এর একটি অংশে মানুষের তৈরি তথ্যব্যবস্থা ও ভুলের বিষয়টি আলোচনা করতে বিভিন্ন ধর্মীয় ঐতিহ্যের উদাহরণ টানা হয়েছে। সেখানে বাইবেল ও কোরআনের মতো পবিত্র গ্রন্থের কথাও এসেছে।

হারারির মূল আলোচনার একটি বিষয় হলো—মানুষ বেশি তথ্য পেলেই যে বেশি সত্য জানতে পারে, এমন নয়। তথ্য সত্যও হতে পারে, আবার ভুল বা বিভ্রান্তিকরও হতে পারে। এই যুক্তি ব্যাখ্যা করতে তিনি ধর্ম, রাষ্ট্র, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন বড় মানবিক নেটওয়ার্কের উদাহরণ ব্যবহার করেছেন।

এই অংশটিই বইটি নিয়ে ধর্মীয় মহলে সবচেয়ে বেশি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে পবিত্র ধর্মগ্রন্থকে হারারির বিশ্লেষণের ভেতরে যেভাবে আলোচনা করা হয়েছে, সেটিকে কিছু ইসলামি সংগঠন ইসলামী বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে সমালোচনা করেছে।

বইটি শুধু ধর্ম নিয়েই নয়

‘নেক্সাস’-এর বড় অংশ ধর্মের বাইরে। বইটিতে মানুষের সভ্যতায় তথ্য কীভাবে ছড়িয়েছে, মুদ্রণযন্ত্র ও সংবাদমাধ্যম কীভাবে সমাজ বদলেছে, ভুল তথ্য কীভাবে বড় আকারে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং কম্পিউটার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভবিষ্যতে মানুষের জীবন ও রাজনীতিতে কী ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে—এসব বিষয়ও রয়েছে।

বিশেষ করে এআই নিয়ে বইটির দ্বিতীয়ার্ধে দীর্ঘ আলোচনা আছে। হারারি মনে করেন, আগের অনেক প্রযুক্তির তুলনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার একটি বড় পার্থক্য হলো—এটি শুধু মানুষের তৈরি তথ্য সংরক্ষণ করে না, নিজেও নতুন তথ্য তৈরি করতে এবং বিভিন্ন কাজ সম্পাদন করতে পারে।

তাহলে বই ফেরত নেওয়ার কারণ কী

এখন পর্যন্ত ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রকাশ্য বক্তব্যে বই ফেরত নেওয়ার জন্য আলাদা কোনো বিস্তারিত ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় বইগুলো দ্রুত ফেরত নেওয়া হয়েছে।

তবে প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদনগুলোতে স্পষ্ট যে, বই দেওয়ার পর এর বিষয়বস্তু নিয়ে বিভিন্ন ইসলামপন্থি সংগঠন প্রকাশ্যে আপত্তি ও প্রতিবাদ জানিয়েছিল। সেই সমালোচনার পরই বই প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত আসে।

অর্থাৎ, সরকারি বক্তব্যে প্রত্যাহারের প্রধান কারণ হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার কথা বলা হয়েছে; আর প্রকাশ্য ঘটনাপ্রবাহে বইটির বিষয়বস্তু ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক ছিল এই সিদ্ধান্তের আগের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

বই নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন

ঘটনাটি সামনে আসার পর আরেকটি প্রশ্ন উঠেছে—আন্তর্জাতিক কোরআন প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হাফেজদের সংবর্ধনায় উপহার দেওয়ার জন্য বইটি কীভাবে নির্বাচন করা হয়েছিল।

ধর্ম মন্ত্রণালয় এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে জানায়নি, ‘নেক্সাস’ বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বা বইটির বিষয়বস্তু আগে পর্যালোচনা করা হয়েছিল কি না।

তাই বই ফেরত নেওয়ার সিদ্ধান্তের বিষয়টি এখন পরিষ্কার হলেও, বইটি উপহারের তালিকায় কীভাবে এল—সে প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।

বিতর্কের দুই দিক

একদিকে ‘নেক্সাস’ তথ্য, ইতিহাস, ক্ষমতা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে লেখা একটি বহুল আলোচিত নন-ফিকশন বই। অন্যদিকে বইয়ের কিছু অংশে ধর্ম ও পবিত্র গ্রন্থ নিয়ে লেখকের নিজস্ব বিশ্লেষণ রয়েছে, যা ধর্মীয় বিশ্বাসের দৃষ্টিকোণ থেকে সমালোচিত হয়েছে।

ফলে হাফেজদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বইটি উপহার হিসেবে দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা মূলত বইটির সামগ্রিক বিষয়বস্তুর চেয়ে নির্দিষ্ট কিছু ধর্ম-সংক্রান্ত আলোচনাকে ঘিরেই বেশি তীব্র হয়েছে।

রোববার বইগুলো ফেরত নেওয়ার পর ধর্ম মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হাফেজদের আন্তর্জাতিক অর্জনকে সম্মান জানানো এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় তাঁদের অংশগ্রহণে সরকারি সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো, বিডিনিউজ২৪, যুগান্তর, বাংলা ট্রিবিউন, দৈনিক ইত্তেফাক, কালবেলা, Penguin Random House, Kirkus Reviews, The Washington Post।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments