মৃত্যুর তিন দিন পর স্ত্রীর ব্যাংক হিসাবে অর্থ জমা; সাংবাদিকদের বকেয়া পাওনা সময়মতো পরিশোধের আহ্বান
বরিশাল | নাগরিক সাংবাদিকতা
দৈনিক সমকালের বরিশাল বিভাগের সাবেক ব্যুরো প্রধান ও সদ্য প্রয়াত সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জির পরিবারের কাছে তাঁর বকেয়া পাওনা বাবদ ১০ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে সমকাল কর্তৃপক্ষ। সোমবার পুলক চ্যাটার্জির স্ত্রী প্রিয়াঙ্কা চ্যাটার্জির ব্যাংক হিসাবে ওই অর্থ জমা দেওয়া হয়েছে।
তথ্যটি নিশ্চিত করেছেন দৈনিক সমকালের বর্তমান বরিশাল ব্যুরো প্রধান সুমন চৌধুরী।
পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যুর তিন দিন পর তাঁর পরিবারের কাছে বকেয়া অর্থ পরিশোধের এ তথ্য সামনে এলো। ঘটনাটি এরই মধ্যে সাংবাদিকদের পাওনা, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
সমকাল কার্যালয় থেকে উদ্ধার হয় মরদেহ
এর আগে শুক্রবার সন্ধ্যায় বরিশাল নগরীর প্যারারা রোডে সমকাল কার্যালয়ের ভেতর থেকে ৫৭ বছর বয়সী সিনিয়র সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জির ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
পুলক চ্যাটার্জিকে ২০২৩ সালের মে মাসে সমকাল থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল। চাকরি হারানোর পর তিনি বেকার ছিলেন। এ সময়ে তিনি গভীর মানসিক কষ্টে ছিলেন বলে জানিয়েছেন তাঁর স্বজনেরা।
চিরকুটে ছিল পাওনা টাকা পরিবারের কাছে দেওয়ার অনুরোধ
মৃত্যুর আগে পুলক চ্যাটার্জি পাঁচটি চিরকুট লিখে গেছেন বলে পরিবার ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এর মধ্যে একটি চিরকুটে দীর্ঘদিনের সহকর্মী সুমন চৌধুরীর উদ্দেশে সমকাল কার্যালয়ে গচ্ছিত থাকা তাঁর পাওনা টাকা উদ্ধার করে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের অনুরোধ করা হয়েছিল।
চিরকুটটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে সমকাল কর্তৃপক্ষের সমালোচনা শুরু হয়। এর মধ্যেই পরিবারের হিসাবে ১০ লাখ টাকা জমা দেওয়ার তথ্য জানানো হলো।
স্ত্রী ও মেয়ের উদ্দেশে লেখা একটি চিরকুটে পুলক লিখেছিলেন, ‘আমাকে ক্ষমা করে দিও। পৃথিবীতে কারও জন্য কিছু থেমে থাকে না।’ ছোট ভাই দীপক চ্যাটার্জির প্রতিও স্ত্রী ও সন্তানকে আগলে রাখার আকুতি ছিল বলে পরিবার সূত্রে জানা গেছে।
দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে বরিশালে পরিচিত মুখ
পুলক চ্যাটার্জি বরিশালের গণমাধ্যম অঙ্গনে দীর্ঘদিন সক্রিয় ছিলেন। তিনি একসময় বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। সমকালের বরিশাল বিভাগের ব্যুরো প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সাংবাদিকতায় তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ছিল।
মৃত্যুর সময় তিনি স্ত্রী প্রিয়াঙ্কা চ্যাটার্জি ও একমাত্র মেয়ে প্রকৃতিকে রেখে গেছেন।
মৃত্যুর কারণ এখনো চূড়ান্ত নয়
পুলিশ ঘটনাটিকে প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যা বলে ধারণা করছে। তবে উদ্ধার হওয়া চিরকুটগুলোর সত্যতা যাচাই এবং ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
তাই তাঁর মৃত্যুর পেছনে বকেয়া পাওনা বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট কারণকে এখনই চূড়ান্তভাবে দায়ী করা যাচ্ছে না। তবে মৃত্যুর আগে পাওনা অর্থ পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অনুরোধ এবং পরবর্তী সময়ে সেই অর্থ পরিশোধের ঘটনা সাংবাদিকদের আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টিকে সামনে এনেছে।
আর কোনো পুলক চ্যাটার্জি নয়
একজন সাংবাদিক চাকরি হারানোর পর দীর্ঘদিন বেকার থাকলে তাঁর ওপর আর্থিক চাপ কতটা তৈরি হতে পারে—পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু সেই প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের বেতন, বকেয়া পাওনা, চাকরির নিরাপত্তা এবং সংকটকালে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নিয়েও ভাবার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারের কাছে ১০ লাখ টাকা পাওনা পরিশোধ করা হলেও প্রশ্ন থেকে যায়—এই অর্থসহ সাংবাদিকদের প্রাপ্য টাকা যদি চাকরি শেষ হওয়ার সময়ই নিয়মিতভাবে পরিশোধ করা হয়, তাহলে অনেক অনিশ্চয়তা কি কমানো সম্ভব নয়?
দেশের সব গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের প্রতি আহ্বান—সাংবাদিক ও কর্মীদের বেতন, ভাতা এবং অন্যান্য বৈধ পাওনা যেন যথাসময়ে পরিশোধ করা হয়। একটি মানুষের শ্রমের মূল্য পরিশোধ করা শুধু আর্থিক দায় নয়, এটি একটি প্রতিষ্ঠানের নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বও।
আমরা আর কোনো পুলক চ্যাটার্জিকে আর্থিক অনিশ্চয়তা, পাওনা নিয়ে দীর্ঘ অপেক্ষা কিংবা একাকিত্বের ভারে ভেঙে পড়তে দেখতে চাই না।
তথ্যসূত্র: পরিবার ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের বক্তব্য; সমকাল বরিশাল ব্যুরো প্রধান সুমন চৌধুরীর বক্তব্য; আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রাথমিক তথ্য।




