গ্যাস-বিদ্যুৎ-সারের ঘাটতি ও ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের দাবিতে ১১ দলীয় জোটের কর্মসূচি; চট্টগ্রামে গিয়ে শেষ হয়েছে সমাবেশ
ঢাকা/চট্টগ্রাম | ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
দেশের তীব্র গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সারের সংকটকে সামনে রেখে রাজধানী ঢাকা থেকে চট্টগ্রামমুখী লংমার্চ করেছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় রাজনৈতিক জোট। শনিবার ঢাকায় সমাবেশের পর শুরু হওয়া এই কর্মসূচি রোববার চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানের সমাবেশের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে। বিরোধী জোটের নেতারা অভিযোগ করেছেন, সরকার জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে এবং সংকট মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি। একই সঙ্গে তারা ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নসহ ছয় দফা দাবি সামনে এনেছেন।
রাজপথে বিরোধীদের প্রথম বড় চাপ
বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার প্রায় ছয় মাসের মাথায় এটি ছিল বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির অন্যতম বড় রাজপথের কর্মসূচি। AFP-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাজারো নেতা-কর্মী ঢাকায় জড়ো হয়ে চট্টগ্রামের দিকে লংমার্চে অংশ নেন।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, রান্নার গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সারের সংকটের কারণে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান উভয়েই চাপে রয়েছে।
জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেছেন, আন্দোলনের উদ্দেশ্য হলো জনগণের ঘরে গ্যাস নিশ্চিত করা এবং প্রতিটি ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া।
‘সংকটের সুযোগে অরাজকতা’—সরকারের পাল্টা বক্তব্য
সরকার অবশ্য বিরোধীদের অভিযোগকে সরাসরি রাজনৈতিক চাপ তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এর আগে বলেছেন, দেশের বাস্তব সমস্যাগুলোকে কাজে লাগিয়ে কিছু রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তি বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে অরাজকতা তৈরির চেষ্টা করছে।
রোববার পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদও প্রশ্ন তুলেছেন, জ্বালানি সংকটের মধ্যে হাজার হাজার যানবাহন নিয়ে লংমার্চ আয়োজন কতটা যৌক্তিক।
তিনি বিরোধীদের সংসদে এসে দাবি উত্থাপনের আহ্বান জানিয়েছেন।
সংকটের পেছনে শুধু রাজনীতি নয়
বাংলাদেশের বর্তমান জ্বালানি সংকটের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে।
দেশীয় গ্যাস উৎপাদনে দীর্ঘদিনের ঘাটতি, আমদানিনির্ভর LNG, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ—সব মিলিয়ে দেশের জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি LNG ও পরিবহন ব্যয়ও বাড়ছে। ফলে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে এর প্রভাব সরাসরি বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদনের ওপর পড়ে।
হরমুজ সংকট পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করছে
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহের বড় অংশ আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় দীর্ঘস্থায়ী বৈশ্বিক সরবরাহ সংকট দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকে আরও চাপের মধ্যে ফেলতে পারে।
এ কারণেই জ্বালানি সংকট এখন শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক সমস্যা নয়; এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি ও বিশ্ববাজারও যুক্ত হয়েছে।
লংমার্চের রাজনৈতিক তাৎপর্য
বিরোধীদের এই কর্মসূচির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে প্রথম বড় সমন্বিত চাপের উদাহরণ।
সরকার সংকট মোকাবিলায় নতুন গ্যাস অনুসন্ধান, LNG আমদানি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে। কিন্তু পরিকল্পনার সঙ্গে বাস্তব ফলাফলের পার্থক্য থাকলে রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়তে পারে।
অন্যদিকে বিরোধী দলগুলো যদি সংসদ ও রাজপথ—দুই জায়গাতেই জনগণের অসন্তোষকে সংগঠিত করতে পারে, তাহলে সরকারের সামনে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জও বাড়বে।
সরকারের জন্য এখন মূল পরীক্ষা
জ্বালানি সংকটের সমাধানে এখন সবচেয়ে জরুরি হলো সরবরাহ স্বাভাবিক করা এবং জনগণকে পরিষ্কারভাবে জানানো—কখন পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। শিল্পে গ্যাস, বাসাবাড়িতে বিদ্যুৎ এবং কৃষকের জন্য সার—এই তিন জায়গায় দৃশ্যমান উন্নতি আনতে পারলেই সরকারের প্রতি জনআস্থা বাড়তে পারে।
📊 লংমার্চের মূল বিষয়
- আয়োজক: জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট
- শুরু: ঢাকা
- গন্তব্য: চট্টগ্রাম
- প্রধান ইস্যু: গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সার সংকট
- অন্যান্য দাবি: জুলাই সনদ বাস্তবায়নসহ ছয় দফা
- সরকারের অবস্থান: রাজপথের বদলে সংসদে দাবি উত্থাপনের আহ্বান
🧭 সামনে কী?
লংমার্চ শেষ হলেও জ্বালানি সংকটের রাজনৈতিক অধ্যায় শেষ হচ্ছে না। এখন সরকারকে দেখাতে হবে, সমস্যাটি মোকাবিলায় ঘোষিত পরিকল্পনার বাস্তব অগ্রগতি কোথায়।
অন্যদিকে বিরোধী জোটও এই কর্মসূচির পর নতুন আন্দোলন কর্মসূচি দেয় কি না, সেটিই হবে পরবর্তী রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণের বিষয়।
তথ্যসূত্র: AFP, The Daily Star, Prothom Alo, BSS, বাংলাদেশ সরকারের বক্তব্য




