Homeটুডে নেশনগ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে পারটেক্সের কারখানা বন্ধ: শিল্প কি এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে?

গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে পারটেক্সের কারখানা বন্ধ: শিল্প কি এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে?

পাঁচ স্পিনিং মিল বন্ধের দাবি, পার্টিকেল বোর্ড মিলও বন্ধের সিদ্ধান্ত; জ্বালানি সংকট, ঋণের চাপ ও আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকি নিয়ে বড় প্রশ্ন

ঢাকা | ৩০ আগস্ট ২০২৬

বাংলাদেশের শিল্পখাতে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব এবার দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী পারটেক্সের ওপরও দৃশ্যমান হয়েছে। পারটেক্স গ্রুপের মালিক ও সিটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান আজিজ আল কায়সার জানিয়েছেন, গ্যাস-বিদ্যুতের পরিস্থিতি আগামী দুই বছরেও স্বাভাবিক হবে না—এমন বার্তা পাওয়ার পর তিনি গ্রুপের পার্টিকেল বোর্ড মিল বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। একই সঙ্গে গ্রুপের পাঁচটি স্পিনিং মিল ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে বলেও দাবি করেছেন তিনি।

এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোর বড় অংশ দীর্ঘস্থায়ী গ্যাসের নিম্নচাপ, বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং বিকল্প জ্বালানির বাড়তি ব্যয়ের মধ্যে রয়েছে। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (DCCI) হিসাবে, চলমান জ্বালানি সংকটে দেশের শিল্পখাতে দৈনিক সর্বোচ্চ প্রায় ২ হাজার ৩৮৭ কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। এমনকি কারখানাগুলো গড়ে ৫৫ শতাংশ সক্ষমতায় চললেও দৈনিক ক্ষতি প্রায় ১ হাজার ৭৪ কোটি টাকা হতে পারে বলে সংগঠনটি জানিয়েছে।

ফলে পারটেক্সের সংকটকে শুধু একটি শিল্পগোষ্ঠীর ব্যবসায়িক সমস্যা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না। এটি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্পায়ন, ব্যাংক ঋণ, কর্মসংস্থান, রপ্তানি সক্ষমতা এবং আমদানিনির্ভরতার ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি বড় অর্থনৈতিক প্রশ্ন তৈরি করছে।

💰 কী ঘটেছে

আজিজ আল কায়সারের বক্তব্য অনুযায়ী, পারটেক্সের পাঁচটি স্পিনিং মিল ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তায় পার্টিকেল বোর্ড মিলও বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় উৎপাদন বন্ধ রেখে বেতন দেওয়া এবং ব্যাংকের দায় বাড়ানো সম্ভব নয়। তাই গ্রুপের বাকি ব্যবসাগুলোকে একত্র করে পরিচালন ব্যয় কমানোর চেষ্টা করা হবে এবং প্রয়োজনে সম্পদ বিক্রি করে বিদ্যমান ব্যাংক দায় পরিশোধের চেষ্টা করা হবে।

পারটেক্স গ্রুপের মতো বড় একটি শিল্পগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্তের অর্থ হলো—গ্যাস সংকট এখন শুধু উৎপাদন কমাচ্ছে না; এটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক viability বা টিকে থাকার সক্ষমতা নিয়েই প্রশ্ন তুলছে।

📊 এক নজরে পারটেক্সের সংকট

বিষয়তথ্য
বন্ধ স্পিনিং মিল৫টি—গ্রুপ মালিকের বক্তব্য অনুযায়ী
পার্টিকেল বোর্ড মিলবন্ধের সিদ্ধান্ত
প্রধান সমস্যাগ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট
গ্রুপের অবস্থানব্যবসা কনসোলিডেশন ও ব্যয় কমানোর পরিকল্পনা
ব্যাংক দায়বিদ্যমান দায় পরিশোধে সম্পদ বিক্রির কথা জানিয়েছেন মালিক
বিকল্প জ্বালানিডিজেলের বাড়তি খরচে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি

🛢️ সংকটটি কি শুধু পারটেক্সের?

না।

সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহে দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাস সংকটের যে চিত্র পাওয়া যাচ্ছে, তা পারটেক্সের সংকটকে একটি বৃহত্তর জাতীয় সমস্যার অংশ হিসেবে দেখাচ্ছে।

গাজীপুরে প্রায় ১৭–১৮ শতাংশ কারখানা সাময়িক বন্ধ ঘোষণা করেছিল এবং জেলায় গ্যাসের চাহিদার তুলনায় সরবরাহে প্রায় ৪৫ শতাংশ ঘাটতি থাকার কথা জানিয়েছিল তিতাস।

নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, সাভার-আশুলিয়া ও চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলেও উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। কোথাও কারখানা পুরোপুরি বন্ধ, কোথাও উৎপাদন ৫০ শতাংশের নিচে নেমেছে, আবার কোথাও ডিজেল, কাঠ, সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারি ব্যবহার করে উৎপাদন সচল রাখার চেষ্টা হয়েছে।

প্রথম আলোর প্রতিবেদনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ১০০টির বেশি কারখানায় উৎপাদন বন্ধের কথাও উঠে এসেছে।

⚡ বাংলাদেশে হঠাৎ এত বড় জ্বালানি সংকট কেন?

বর্তমান সংকটের তাৎক্ষণিক কারণগুলোর একটি হলো এলএনজি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন। ২১ জুলাই মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর সেটির গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। ওই টার্মিনাল থেকে স্বাভাবিক সময়ে প্রায় ৪৫০–৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ হতো।

পরে টার্মিনাল আংশিকভাবে চালু হলেও সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ১৫ আগস্ট জাতীয় গ্রিডে মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল প্রায় ২ হাজার ৪৪৩ মিলিয়ন ঘনফুট; এর বিপরীতে দেশীয় ও আমদানিকৃত গ্যাস মিলিয়ে চাহিদা অনেক বেশি।

১৮ আগস্টও মোট গ্যাসপ্রাপ্যতা ছিল প্রায় ২ হাজার ৪২০ মিলিয়ন ঘনফুট, যেখানে জাতীয় চাহিদা ছিল প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট।

অর্থাৎ সমস্যাটি কেবল একটি টার্মিনালের দুর্ঘটনা নয়; এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ-চাহিদার ব্যবধান, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া এবং আমদানিকৃত এলএনজির ওপর বাড়তি নির্ভরতা।

🌍 বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারও কঠিন

বাংলাদেশের সংকটের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতিও যুক্ত হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় অতিরিক্ত ৪–৫ বিলিয়ন ডলার বাড়িয়েছে।

অন্যদিকে Reuters-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাতার থেকে এলএনজি রপ্তানি ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় এশিয়ার বাজারে এলএনজির দাম বেড়েছে।

অর্থাৎ বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর জ্বালানি অর্থনীতিতে বৈশ্বিক সংকট সরাসরি শিল্প ব্যয়ের ওপর আঘাত করছে।

💸 ডিজেল দিয়ে কারখানা চালানো কতটা টেকসই?

গ্যাস না থাকলে অনেক কারখানা ডিজেলচালিত জেনারেটরের দিকে যাচ্ছে। কিন্তু এতে উৎপাদন ব্যয় দ্রুত বেড়ে যায়।

DCCI জানিয়েছে, শিল্পে গ্যাসের ব্যয় প্রতি ঘনমিটারে প্রায় ৪০ টাকা, যেখানে বিকল্প হিসেবে ডিজেলের ব্যয় প্রতি লিটারে প্রায় ১১৫ টাকা। কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান ডিজেল সংগ্রহে প্রতি লিটারে অতিরিক্ত ১০ টাকা পর্যন্ত দিচ্ছে।

এখানে একটি বড় অর্থনৈতিক সমস্যা তৈরি হয়:

গ্যাসের অনিশ্চয়তা → ডিজেল ব্যবহার → উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি → পণ্যের দাম বৃদ্ধি → প্রতিযোগিতা কমে যাওয়া।

এভাবে কয়েক মাস উচ্চ ব্যয়ে উৎপাদন চালানো সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা ব্যবসাকে আর্থিকভাবে দুর্বল করে দিতে পারে।

🏭 পারটেক্সের ক্ষেত্রে ঝুঁকিটা আরও বড় কেন?

স্পিনিং, টেক্সটাইল, বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট শিল্পে উৎপাদন ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একটি শিল্প ইউনিট বন্ধ থাকলেও—

  • শ্রমিকদের বেতন দিতে হয়
  • ব্যাংকের সুদ জমতে থাকে
  • যন্ত্রপাতি পড়ে থাকে
  • রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় থাকে
  • সরবরাহকারী ও পরিবেশকের অর্থপ্রবাহ কমে
  • বাজার হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়

ফলে উৎপাদন বন্ধ মানেই খরচ বন্ধ নয়।

বরং অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নগদ প্রবাহের সংকট আরও তীব্র হয়।

🏦 ব্যাংক ঋণের চাপও কি সংকটকে বাড়াচ্ছে?

এটি এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান কয়েক মাস উৎপাদন কমালে বা বন্ধ রাখলে তার ঋণ পরিশোধের ক্ষমতা কমে যায়। ফলে ব্যাংকের কাছে ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন বা নতুন কার্যকর মূলধনের প্রয়োজন হতে পারে।

পারটেক্স গ্রুপের মালিক নিজেই বলেছেন, দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ রেখে নতুন ব্যাংক দায় বাড়াতে চান না এবং প্রয়োজনে সম্পদ বিক্রি করে পুরোনো দায় পরিশোধের চেষ্টা করবেন।

তবে পারটেক্স গ্রুপের মোট ঋণের নির্ভরযোগ্য, সাম্প্রতিক একীভূত চিত্র প্রকাশ্য উৎসে পাওয়া যাচ্ছে না। তাই এই মুহূর্তে গ্রুপটির মোট ব্যাংক দায় বা সম্ভাব্য খেলাপি হওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে নির্দিষ্ট অঙ্ক বলা দায়িত্বশীল হবে না।

তবে ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য সাধারণ ঝুঁকিটি স্পষ্ট—একটি বড় শিল্পগোষ্ঠী উৎপাদন বন্ধ করলে ব্যাংকের করপোরেট ঋণের মানও খারাপ হতে পারে।

পারটেক্স-সংশ্লিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানের বড় ঋণের তথ্য অবশ্য ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে। ট্রাস্ট ব্যাংকের ২০২৪ সালের বড় ঋণ তালিকায় Partex Petro Ltd. ও Partex Beverage Ltd.-এর সম্মিলিত ঋণসুবিধার পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ১৫৩ কোটি টাকা দেখানো হয়েছে এবং হিসাবটি তখন Standard হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ ছিল।

এটি পুরো গ্রুপের ঋণ নয়; কেবল নির্দিষ্ট দুটি প্রতিষ্ঠানের একটি ব্যাংকের প্রকাশিত এক্সপোজার।

📉 শিল্প বন্ধ হলে বাংলাদেশের ক্ষতি কোথায়?

পারটেক্সের মতো শিল্পগোষ্ঠীর সংকটের প্রভাব কয়েকটি স্তরে ছড়িয়ে পড়ে।

১. কর্মসংস্থান

কারখানা বন্ধ হলে সরাসরি শ্রমিক আয় হারান।

২. ব্যাংকিং খাত

নগদ প্রবাহ কমলে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কমে যেতে পারে।

৩. সরবরাহ শৃঙ্খল

কাঁচামাল সরবরাহকারী, পরিবহনকারী, ডিলার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন।

৪. রাজস্ব

উৎপাদন ও বিক্রি কমলে ভ্যাট, কর ও অন্যান্য রাজস্বও কমতে পারে।

৫. আমদানি নির্ভরতা

দেশীয় উৎপাদন কমলে একই পণ্য আমদানি করতে হতে পারে।

এটাই আজিজ আল কায়সারের বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশ—দেশীয় উৎপাদন ক্ষমতা হারালে আমদানিনির্ভরতা বাড়বে এবং কর্মসংস্থান কমবে।

🚢 আমদানির ওপর বেশি নির্ভর করলে কী হবে?

দেশীয় কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে বাজারের চাহিদা পূরণ করতে আমদানি বাড়াতে হয়।

ফলে—

কারখানা বন্ধ → উৎপাদন কমে → আমদানি বাড়ে → ডলারের চাহিদা বাড়ে → বৈদেশিক মুদ্রার চাপ বাড়ে।

তবে কোনো নির্দিষ্ট শিল্পের আমদানি বৃদ্ধির ফলে সামগ্রিক বৈদেশিক মুদ্রা সংকট কতটা বাড়বে, তা নির্ভর করবে পণ্যের ধরন ও আমদানির মোট পরিমাণের ওপর।

📈 তিন স্তরের অর্থনৈতিক প্রভাব

সময়কালসম্ভাব্য প্রভাব
তাৎক্ষণিকউৎপাদন বন্ধ, শ্রমিকের কর্মঘণ্টা কমা, বিকল্প জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি
স্বল্পমেয়াদিনগদ প্রবাহ সংকট, ব্যাংক ঋণ পরিশোধে চাপ, সরবরাহে ঘাটতি
দীর্ঘমেয়াদিবিনিয়োগ নিরুৎসাহিত, শিল্প স্থানান্তর, আমদানিনির্ভরতা ও কর্মসংস্থান সংকট

👨‍👩‍👧‍👦 সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব

শিল্প বন্ধের প্রভাব সরাসরি শুধু শ্রমিকদের ওপর পড়ে না।

যদি স্পিনিং ও টেক্সটাইল কারখানা বন্ধ হয়, তাহলে কাপড় ও পোশাক উৎপাদনের খরচ বাড়তে পারে। বোর্ড ও কাঠজাত শিল্পে উৎপাদন কমলে নির্মাণ ও আসবাব খাতেও সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো—শিল্পে ব্যয় বাড়লে তার একটি অংশ শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামে স্থানান্তরিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

অর্থাৎ গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট একদিকে কর্মসংস্থান কমায়, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াতে পারে।

📊 বড় ছবিতে বাংলাদেশের শিল্পখাত

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে বড় শিল্পের উৎপাদন সূচক আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ০.৩৮ শতাংশ কমেছে; আগের বছর একই সময়ে ৭.২৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ছিল।

অর্থাৎ বর্তমান জ্বালানি সংকটের আগে থেকেই উৎপাদন খাতে দুর্বলতার লক্ষণ ছিল। এখন জ্বালানি সংকট সেই চাপকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

⚠️ সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা

সরকারের পক্ষ থেকে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। ৬ আগস্ট বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী জানিয়েছিলেন, এলএনজি টার্মিনাল পুনরায় চালুর পর দুই-তিন দিনের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার আশা করা হচ্ছে।

কিন্তু পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে শিল্পাঞ্চলে নিম্নচাপ ও সরবরাহ ঘাটতি অব্যাহত থাকার খবর এসেছে। ফলে এখন স্পষ্ট যে শুধু একটি টার্মিনাল পুনরায় চালু করলেই দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সমস্যা সমাধান হবে না।

🔎 দাবি বনাম বাস্তবতা

দাবিবাস্তবতা
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটেই পারটেক্সের কারখানা বন্ধপারটেক্স মালিক নিজেই জ্বালানি সংকটকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন; তবে প্রতিটি কারখানার আর্থিক কারণ আলাদাভাবে যাচাই প্রয়োজন
শুধু পারটেক্সই ক্ষতিগ্রস্তজাতীয় শিল্পাঞ্চলের বহু কারখানা উৎপাদন কমিয়েছে বা বন্ধ করেছে
গ্যাস এলেই সব সমস্যার সমাধানবিদ্যুৎ, ঋণের খরচ, কাঁচামাল ও বৈশ্বিক বাজারও ব্যবসার ওপর প্রভাব ফেলে
শিল্প বন্ধ মানেই সব কর্মী চাকরি হারাবেনএখন পর্যন্ত পারটেক্সের সব কর্মীর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এমন কোনো নিশ্চিত তথ্য নেই
জ্বালানি সংকট শুধু সাময়িক সমস্যাবর্তমান সংকটের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস-চাহিদা ও সরবরাহ ব্যবধানও জড়িত

🧭 এখন যে বিষয়গুলোর দিকে নজর থাকবে

প্রথমত—গ্যাস সরবরাহ: শিল্পাঞ্চলে পর্যাপ্ত চাপ কবে ফিরবে।

দ্বিতীয়ত—কারখানা পুনরায় চালু: পারটেক্সসহ বন্ধ হওয়া শিল্পগুলো কত দ্রুত উৎপাদনে ফিরতে পারে।

তৃতীয়ত—ব্যাংক ঋণ: উৎপাদন বন্ধের কারণে করপোরেট ঋণের মান কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

চতুর্থত—কর্মসংস্থান: দীর্ঘমেয়াদি বন্ধে কত শ্রমিক ছাঁটাই বা ছুটিতে যেতে বাধ্য হন।

পঞ্চমত—বিনিয়োগ আস্থা: নতুন উদ্যোক্তারা বাংলাদেশে বড় শিল্প স্থাপনে আগের মতো আগ্রহী থাকবেন কি না।

💡 মূল শিক্ষা: শিল্পনীতির কেন্দ্রে জ্বালানি নিরাপত্তা

পারটেক্স গ্রুপের ঘটনাটি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত।

কোনো উদ্যোক্তা জমি, যন্ত্রপাতি ও কারখানা স্থাপন করে বিলিয়ন টাকার বিনিয়োগ করলেন—কিন্তু উৎপাদনের জন্য নির্ভরযোগ্য গ্যাস ও বিদ্যুৎ পেলেন না—তাহলে শুধু উদ্যোক্তাই ক্ষতিগ্রস্ত হন না। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ব্যাংক, শ্রমিক, সরবরাহকারী, সরকার এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তা।

বাংলাদেশ যদি বড় শিল্পে বিনিয়োগ ধরে রাখতে চায়, তাহলে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগকে বিনিয়োগ অনুমোদনের পরের বিষয় নয়, বিনিয়োগ পরিকল্পনার মৌলিক অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

একই সঙ্গে উদ্যোক্তাদেরও কেবল আশাবাদী সরকারি প্রতিশ্রুতির ওপর নির্ভর না করে প্রকল্প গ্রহণের আগে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিশ্চয়তা, বিকল্প জ্বালানি ব্যয়, ঋণের বোঝা ও বাজারের ঝুঁকি হিসাব করতে হবে।

📌 শেষ কথা

আজিজ আল কায়সারের বক্তব্যে যে আশঙ্কা উঠে এসেছে—“কারখানা না থাকলে উৎপাদন হবে না, কর্মসংস্থান হবে না”—তা কেবল একটি ব্যবসায়ী পরিবারের উদ্বেগ হিসেবে দেখলে ভুল হবে।

বাংলাদেশে শিল্প উৎপাদন ইতোমধ্যে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে চাপের মধ্যে। DCCI-র দৈনিক হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতির হিসাব এবং দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন বন্ধের খবর দেখাচ্ছে, সমস্যাটি এখন সামষ্টিক অর্থনীতির স্তরে পৌঁছে গেছে।

তাই পারটেক্সের পাঁচটি স্পিনিং মিল ও পার্টিকেল বোর্ড মিলের সংকটকে একটি বৃহত্তর প্রশ্নের অংশ হিসেবে দেখা প্রয়োজন—

বাংলাদেশ কি এমন একটি শিল্প অর্থনীতি তৈরি করতে পারবে, যেখানে বিনিয়োগকারী শুধু কারখানা তৈরির সুযোগ নয়, সেই কারখানা চালানোর নিশ্চয়তাও পাবেন?

এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের আগামী দিনের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি।

তথ্যসূত্র: পারটেক্স গ্রুপের মালিক আজিজ আল কায়সারের বক্তব্য; বাংলাদেশ ব্যাংক; পেট্রোবাংলা; ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (DCCI); The Business Standard; The Daily Star; bdnews24.com; Prothom Alo; Reuters।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments