দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় কূটনীতি একদিকে, মানবাধিকার-জলবায়ু-সমুদ্র-এলডিসি উত্তরণ-প্রযুক্তি ও সাংস্কৃতিক কূটনীতি অন্যদিকে; দায়িত্ব ভাগ করে কাজের পরিধি বাড়াল সরকার
ঢাকা | TODAY TV BD | বিশেষ বিশ্লেষণ
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এখন একজন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন দুজন প্রতিমন্ত্রী। নতুন এই কাঠামোয় হুমায়ুন কবির পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ এবং শামা ওবায়েদ ইসলাম এমপি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-২ হিসেবে কাজ করবেন। তাঁদের ওপর আলাদা করে বিস্তৃত দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের নির্দেশনা ও তত্ত্বাবধানে তাঁরা এসব দায়িত্ব পালন করবেন।
নতুন দায়িত্ব বণ্টনের দিকে তাকালে দেখা যায়, সরকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজকে মোটামুটি দুটি বড় ধারায় ভাগ করেছে। একদিকে রয়েছে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপাক্ষিক সম্পর্ক, প্রবাসী বাংলাদেশি এবং ঐতিহ্যগত কূটনৈতিক কার্যক্রম। অন্যদিকে রয়েছে মানবাধিকার, জলবায়ু, গবেষণা ও উদ্ভাবন, সমুদ্রসম্পদ, বিশ্ব স্বাস্থ্য, এলডিসি উত্তরণ, আইসিটি, সৃজনশীল অর্থনীতি এবং সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া কূটনীতি।
অর্থাৎ এটি শুধু জনবল বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নয়; দায়িত্বের তালিকা দেখে বোঝা যায়, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে প্রচলিত রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের পাশাপাশি নতুন বৈশ্বিক ইস্যু ও অর্থনৈতিক কূটনীতির দিকে আরও বিস্তৃত করার একটি প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে।
প্রথমে পরিষ্কার করা দরকার—বাংলাদেশে এখন ‘দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী’ নয়
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। বাংলাদেশে দুইজন পূর্ণাঙ্গ পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া হয়নি। একজনই পররাষ্ট্রমন্ত্রী—খলিলুর রহমান। তাঁর অধীনে দুজন প্রতিমন্ত্রী কাজ করবেন।
এ ধরনের কাঠামো আন্তর্জাতিকভাবে অস্বাভাবিক নয়। উদাহরণ হিসেবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একজন External Affairs Minister-এর পাশাপাশি দুজন Minister of State for External Affairs দায়িত্ব পালন করছেন। ভারতের সরকারি কাঠামোতে বর্তমানে এস জয়শঙ্করের সঙ্গে কীর্তি বর্ধন সিং এবং পবিত্র মার্গারিটা প্রতিমন্ত্রী পর্যায়ে কাজ করছেন। তাঁদের জন্য পৃথক দায়িত্বও বণ্টন করা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যেও Foreign Secretary-এর অধীনে একাধিক Minister of State ও Parliamentary Under-Secretary কাজ করেন এবং তাঁদের নির্দিষ্ট ভৌগোলিক বা বিষয়ভিত্তিক দায়িত্ব থাকে। ব্রিটিশ FCDO-র বর্তমান কাঠামোতেও Foreign Secretary-এর পাশাপাশি একাধিক Minister of State রয়েছেন।
তাই বাংলাদেশের এই কাঠামোকে ‘একই মন্ত্রণালয়ে দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী’ বলা ঠিক হবে না। বরং এটি একজন রাজনৈতিক প্রধানের অধীনে দায়িত্বভিত্তিক একাধিক মন্ত্রী পর্যায়ের নেতৃত্ব।
হুমায়ুন কবিরের দায়িত্ব: প্রচলিত কূটনীতির মূল ফ্রন্টলাইন
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবিরের দায়িত্বের বড় অংশ মূলধারার কূটনৈতিক কার্যক্রমকে ঘিরে।
তাঁর দায়িত্বের মধ্যে থাকছে—
দ্বিপক্ষীয় বিষয়াবলি, অর্থাৎ বাংলাদেশের সঙ্গে অন্য রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সম্পর্ক।
এর পাশাপাশি বহুপক্ষীয় বিষয়াবলি, যার মধ্যে জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংস্থা এবং বহুপক্ষীয় ফোরামে বাংলাদেশের অবস্থান ও স্বার্থের বিষয়গুলো পড়বে।
তাঁর দায়িত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো অনিবাসী বাংলাদেশি বা প্রবাসী বাংলাদেশি। অর্থাৎ কূটনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের স্বার্থ, সেবা ও সম্পৃক্ততা তাঁর দায়িত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে।
এ ছাড়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী যেসব অতিরিক্ত বিষয় তাঁর ওপর অর্পণ করবেন, সেগুলোও তিনি দেখবেন।
এই দায়িত্ব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, হুমায়ুন কবির মূলত থাকছেন বাংলাদেশের প্রধান রাষ্ট্রীয় কূটনৈতিক যোগাযোগের রাজনৈতিক ফ্রন্টলাইনে।
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রতিবেশী ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা ও উন্নয়নের মতো বিষয় স্বাভাবিকভাবেই এই দায়িত্বের বড় অংশ হয়ে উঠতে পারে।
শামা ওবায়েদ ইসলামের দায়িত্ব: পররাষ্ট্রনীতির নতুন প্রজন্মের ইস্যুগুলো
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-২ শামা ওবায়েদ ইসলামের দায়িত্বের কাঠামো তুলনামূলকভাবে আরও বিস্তৃত এবং বিষয়ভিত্তিক।
তাঁর দায়িত্বের তালিকায় রয়েছে:
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি, মানবাধিকার, গবেষণা ও উদ্ভাবন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন, সৃজনশীল অর্থনীতি, এলডিসি উত্তরণ, আইসিটি, সমুদ্র আইন ও সমুদ্রসম্পদ, বিশ্ব স্বাস্থ্য কূটনীতি এবং সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া কূটনীতি।
এই তালিকাটির দিকে একটু গভীরভাবে তাকালে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বোঝা যায়—পররাষ্ট্রনীতি এখন আর শুধু রাষ্ট্রদূত, সীমান্ত, চুক্তি কিংবা রাষ্ট্রপ্রধানদের বৈঠকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
আজকের আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে জলবায়ু, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, মানবাধিকার, সমুদ্র, সংস্কৃতি, ক্রীড়া ও সৃজনশীল শিল্পও জাতীয় স্বার্থের অংশ।
সুতরাং শামা ওবায়েদের দায়িত্বকে মূলত ‘নতুন প্রজন্মের কূটনৈতিক এজেন্ডা’ পরিচালনার দায়িত্ব হিসেবে দেখা যেতে পারে।
কেন এই দায়িত্ব ভাগাভাগি গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজ গত কয়েক দশকে বহুগুণ বেড়েছে। একদিকে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, অন্যদিকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রবাসী আয়, জলবায়ু অর্থায়ন, রোহিঙ্গা সংকট, সমুদ্রসম্পদ, এলডিসি উত্তরণ, শ্রমবাজার ও প্রযুক্তি—সবকিছুই এখন পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
একজন মন্ত্রীর পক্ষে এসব ক্ষেত্রের প্রত্যেকটি বিষয়ে সমান সময় দেওয়া কঠিন।
এই বাস্তবতায় দায়িত্ব ভাগ করে দিলে মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক নেতৃত্ব একসঙ্গে অনেক বেশি ফ্রন্টে কাজ করতে পারে।
আন্তর্জাতিকভাবে এর উদাহরণও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টে Secretary of State-এর অধীনে Deputy Secretary এবং একাধিক Under Secretary বিভিন্ন ভৌগোলিক ও বিষয়ভিত্তিক ক্ষেত্র পরিচালনা করেন। যেমন Political Affairs-এর Under Secretary সামগ্রিক আঞ্চলিক ও দ্বিপক্ষীয় নীতির একটি বড় অংশ সমন্বয় করেন।
ভারতের ক্ষেত্রেও একই মন্ত্রণালয়ে একাধিক Minister of State-কে পৃথক আঞ্চলিক ও বিষয়ভিত্তিক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের নতুন কাঠামোও সেই ধারণার একটি অভিযোজিত রূপ হিসেবে দেখা যেতে পারে।
দ্বিপক্ষীয় কূটনীতিতে কী পরিবর্তন আসতে পারে?
প্রথম সম্ভাব্য পরিবর্তন হলো প্রতিক্রিয়ার গতি বাড়ানো।
আগে একটি আন্তর্জাতিক ইস্যুতে পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে একই সঙ্গে রাজনৈতিক বৈঠক, সংসদীয় বিষয়, মানবাধিকার, জলবায়ু, প্রবাসী, আন্তর্জাতিক ফোরাম—সবকিছু সামলাতে হতো। এখন দায়িত্ব ভাগ হওয়ায় অন্তত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পর্যায়ে কাজের চাপ ভাগ করা সম্ভব হবে।
দ্বিতীয়ত, গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হতে পারে।
বিশেষ করে ভারত-চীন-যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় শক্তির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এখন শুধু রাজনৈতিক নয়; এর সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, যোগাযোগ, জ্বালানি ও কৌশলগত ভারসাম্যও জড়িত।
একজন প্রতিমন্ত্রী যদি এই দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পর্কের ওপর ধারাবাহিক নজর রাখতে পারেন, তাহলে নীতিনির্ধারণে আরও দ্রুত প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে।
বহুপক্ষীয় কূটনীতিতে বাংলাদেশের সুযোগ কোথায়?
বাংলাদেশ এখন এমন এক পর্যায়ে আছে যেখানে জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন, উন্নয়ন অর্থায়ন, অভিবাসন, খাদ্য নিরাপত্তা, শান্তিরক্ষা কার্যক্রম এবং গ্লোবাল সাউথের স্বার্থ—এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে শুধু বক্তব্য দেওয়ার দেশ নয়, বরং জোট গঠনের দেশ হতে হবে।
এখানে প্রতিমন্ত্রী পর্যায়ে নির্দিষ্ট দায়িত্ব থাকলে বহুপক্ষীয় আলোচনায় প্রস্তুতি, সমন্বয় এবং ফলোআপ বাড়ানো সম্ভব।
মানবাধিকার: সবচেয়ে সংবেদনশীল দায়িত্বগুলোর একটি
শামা ওবায়েদ ইসলামের দায়িত্বের মধ্যে মানবাধিকার রাখা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
কারণ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে মানবাধিকার ইস্যু গত কয়েক বছরে একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
বিদেশি সরকার, জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে। ফলে এই ফ্রন্টে কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য যথেষ্ট নয়।
প্রয়োজন হবে—
রাষ্ট্রের অবস্থান আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাখ্যা করা,
প্রশ্নের জবাব দেওয়া,
প্রাসঙ্গিক তথ্য প্রস্তুত করা,
আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো এবং
বাংলাদেশের অবস্থানকে তথ্যভিত্তিকভাবে তুলে ধরা।
এ ক্ষেত্রে একজন প্রতিমন্ত্রীর পূর্ণ মনোযোগ থাকলে মন্ত্রণালয়ের Human Rights Diplomacy আরও সংগঠিত হতে পারে।
এলডিসি উত্তরণ: পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে অর্থনীতির সরাসরি যোগ
বাংলাদেশের জন্য এলডিসি থেকে উত্তরণ একটি বড় পরিবর্তনের মুহূর্ত। কারণ উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বাজারসুবিধা, মেধাস্বত্ব, উন্নয়ন সহযোগিতা ও বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিবেশে নতুন বাস্তবতা তৈরি হবে।
ফলে এটি আর শুধু বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিষয় নয়।
বিদেশি বাজার, উন্নয়ন অংশীদার, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বাণিজ্যিক অংশীদারদের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা প্রয়োজন।
এখানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক নেতৃত্ব থাকলে Economic Diplomacy-কে আরও কার্যকরভাবে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হতে পারে।
সমুদ্রসম্পদ: ভবিষ্যতের নতুন কূটনৈতিক ফ্রন্ট
বাংলাদেশের জন্য সমুদ্র এখন শুধু নৌপথ নয়। সমুদ্রের সঙ্গে জড়িত রয়েছে মৎস্যসম্পদ, জ্বালানি, বন্দর, সামুদ্রিক বাণিজ্য, পরিবেশ, নিরাপত্তা, নীল অর্থনীতি এবং সমুদ্রসীমা।
শামা ওবায়েদ ইসলামের দায়িত্বের মধ্যে সমুদ্র আইন ও সমুদ্রসম্পদ অন্তর্ভুক্ত হওয়া তাই দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের সমুদ্র অর্থনীতির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় এবং বিনিয়োগ কূটনীতি—সবকিছুকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে।
জলবায়ু কূটনীতিতে নতুন সুযোগ
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি হিসেবে বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক আলোচনায় রয়েছে।
কিন্তু ভবিষ্যতের কূটনীতি শুধু ক্ষতির কথা বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। বাংলাদেশকে জলবায়ু অর্থায়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর, অভিযোজন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং ক্ষয়ক্ষতির অর্থায়নের ক্ষেত্রে আরও ফলপ্রসূ কূটনীতি করতে হবে।
শামা ওবায়েদের অধীনে জলবায়ু ও পরিবেশের দায়িত্ব থাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে এ বিষয়ে একটি বিশেষায়িত রাজনৈতিক ফোকাস তৈরি হতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য কূটনীতি: কোভিডের পর নতুন বাস্তবতা
বিশ্বব্যাপী মহামারির পর স্বাস্থ্য এখন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ভ্যাকসিন, ওষুধ, স্বাস্থ্য প্রযুক্তি, মহামারি প্রস্তুতি, আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বৈশ্বিক স্বাস্থ্য অর্থায়ন—এসব ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রগুলো কূটনৈতিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ হলো, স্বাস্থ্য কূটনীতিকে শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিষয় না রেখে পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে যুক্ত করা।
এই দায়িত্বটি যদি কার্যকরভাবে পরিচালিত হয়, বাংলাদেশ ভবিষ্যতে ওষুধ, চিকিৎসা প্রযুক্তি ও স্বাস্থ্যসেবা রপ্তানির ক্ষেত্রেও কূটনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
আইসিটি ও গবেষণা: ভবিষ্যতের কূটনীতি
ডিজিটাল কূটনীতি এখন বিশ্ব রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল অবকাঠামো, ডেটা গভর্ন্যান্স এবং প্রযুক্তি বিনিয়োগ—এসব বিষয়ে আন্তর্জাতিক সমঝোতা ক্রমেই বাড়ছে।
শামা ওবায়েদের দায়িত্বের মধ্যে গবেষণা, উদ্ভাবন ও আইসিটি থাকা এই পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এখানে সবচেয়ে বড় সুযোগ হলো—পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যদি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি খাতের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় করে, তাহলে বাংলাদেশের কূটনীতি আরও তথ্য ও গবেষণানির্ভর হতে পারে।
সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া কূটনীতি: ‘দেশের ব্র্যান্ড’ গড়ার নতুন পথ
পররাষ্ট্রনীতির শক্তি শুধু রাষ্ট্রীয় বক্তব্যে নয়; একটি দেশের সংস্কৃতি, শিল্প, খেলাধুলা ও সৃজনশীলতার মধ্যেও রয়েছে।
বাংলাদেশের সংগীত, চলচ্চিত্র, সাহিত্য, পোশাক, খাবার, ক্রিকেট এবং অন্যান্য ক্রীড়া আন্তর্জাতিকভাবে দেশের পরিচিতি বাড়াতে পারে।
একে বলা যায় Soft Power Diplomacy।
সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া কূটনীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া গেলে বাংলাদেশ শুধু রাজনৈতিক সম্পর্ক নয়, জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্কও শক্তিশালী করতে পারবে।
তাহলে কি দুই প্রতিমন্ত্রী মানেই কূটনীতি দ্বিগুণ শক্তিশালী?
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো—সংখ্যা বাড়লেই কি দক্ষতা বাড়ে?
উত্তর হলো, অবশ্যই নয়।
দুইজন প্রতিমন্ত্রী থাকা নিজে কোনো সাফল্যের নিশ্চয়তা নয়। বরং সাফল্য নির্ভর করবে চারটি বিষয়ের ওপর—দায়িত্বের স্পষ্টতা, সমন্বয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি এবং জবাবদিহি।
দায়িত্ব স্পষ্টভাবে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে—এটি ইতিবাচক।
কিন্তু একই বিষয়ে যদি দুই প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে ওভারল্যাপ তৈরি হয়, তাহলে সিদ্ধান্ত বিলম্বিত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
তাই পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে হতে হবে এই পুরো কাঠামোর কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি: দ্বৈত নেতৃত্ব নয়, দ্বৈত নির্দেশনা
পররাষ্ট্রনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো একক রাষ্ট্রীয় অবস্থান।
একটি দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে যদি একই বিষয়ে দুই ধরনের বক্তব্য বের হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
তাই নতুন কাঠামোর সাফল্যের জন্য একটি স্পষ্ট নিয়ম প্রয়োজন:
একটি বিষয়ে রাজনৈতিক অবস্থান একজনের; দায়িত্ব ভাগ হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় বার্তা হবে এক।
এই জায়গায় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সমন্বয় ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশাসনে কী ধরনের উন্নয়ন হতে পারে?
নতুন কাঠামো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলে মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক সক্ষমতায় কয়েকটি পরিবর্তন আসতে পারে।
প্রথমত, Specialization বাড়বে। নির্দিষ্ট প্রতিমন্ত্রী নির্দিষ্ট ইস্যুতে দীর্ঘ সময় কাজ করতে পারবেন।
দ্বিতীয়ত, Follow-up diplomacy বাড়বে। বিদেশি রাষ্ট্রদূত, আন্তর্জাতিক সংস্থা, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি বা জলবায়ু সম্মেলনে কোনো আলোচনা হওয়ার পর তার ফলাফল বাস্তবায়নের রাজনৈতিক তদারকি করা সহজ হবে।
তৃতীয়ত, মন্ত্রণালয়ের গবেষণা ও নীতি প্রণয়ন সক্ষমতা বাড়তে পারে।
চতুর্থত, সংসদীয় জবাবদিহি আরও সক্রিয় হতে পারে, কারণ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বিষয়ে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দায়িত্ব থাকবে।
পঞ্চমত, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
বাংলাদেশ কি এখন উন্নত দেশের মডেলের দিকে যাচ্ছে?
আংশিকভাবে বলা যায়, হ্যাঁ। তবে কাঠামোগতভাবে বাংলাদেশের ব্যবস্থা এখনো যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যের মতো নয়।
যুক্তরাষ্ট্রে Secretary of State-এর অধীনে Deputy Secretary এবং একাধিক Under Secretary বিভিন্ন বৃহৎ নীতিক্ষেত্র ও অঞ্চল পরিচালনা করেন।
যুক্তরাজ্যের FCDO-তেও Foreign Secretary-এর অধীনে একাধিক Minister of State ও Parliamentary Under-Secretary নির্দিষ্ট দায়িত্বে কাজ করেন।
ভারতেও একজন External Affairs Minister-এর পাশাপাশি দুজন Minister of State নির্দিষ্ট দায়িত্বে কাজ করছেন।
বাংলাদেশের নতুন কাঠামো এসব দেশের সঙ্গে পুরোপুরি একই নয়, তবে দায়িত্বকে বিষয়ভিত্তিকভাবে ভাগ করার প্রবণতার সঙ্গে সাদৃশ্য রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য এটি কেন সময়োপযোগী হতে পারে
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি জটিল।
একদিকে ভারত ও চীনের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্য ও কৌশলগত সম্পর্ক।
মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমবাজার ও প্রবাসী বাংলাদেশি।
রোহিঙ্গা সংকট।
এলডিসি উত্তরণ।
জলবায়ু পরিবর্তন।
সমুদ্রসম্পদ।
ডিজিটাল অর্থনীতি।
বৈশ্বিক স্বাস্থ্য।
মানবাধিকার।
এসব একসঙ্গে সামলাতে হলে কূটনৈতিক নেতৃত্বের বিষয়ভিত্তিক বিশেষায়ন প্রয়োজন।
এই অর্থে দুটি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব ভাগ করা বাংলাদেশের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি পদক্ষেপ হতে পারে।
কিন্তু সাফল্যের চাবিকাঠি কোথায়?
সাফল্যের জন্য শুধু নতুন দুটি পদ যথেষ্ট নয়।
প্রয়োজন একটি Foreign Policy Coordination Mechanism—যেখানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী, দুই প্রতিমন্ত্রী, পররাষ্ট্রসচিব এবং সংশ্লিষ্ট উইংগুলো নিয়মিত সমন্বয় করবেন।
প্রতিটি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব অনুযায়ী বার্ষিক লক্ষ্য নির্ধারণ করা যেতে পারে।
যেমন—
কতগুলো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন উদ্যোগ নেওয়া হলো?
কতগুলো আন্তর্জাতিক সমঝোতা বাস্তবায়িত হলো?
কতজন প্রবাসী বাংলাদেশির সমস্যা সমাধান হলো?
কতগুলো নতুন জলবায়ু অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হলো?
এলডিসি উত্তরণে কতগুলো বাজারসুবিধা নিশ্চিত হলো?
কতগুলো আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সহযোগিতা চুক্তি হলো?
কতগুলো সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া কূটনৈতিক উদ্যোগ বাস্তব ফল দিল?
এভাবে কাজ পরিমাপযোগ্য হলে নতুন কাঠামোর কার্যকারিতাও মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশের কূটনীতিতে সম্ভাব্য বড় পরিবর্তন: ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ থেকে ‘প্রোঅ্যাকটিভ’
সবচেয়ে বড় সম্ভাব্য পরিবর্তন হতে পারে কূটনীতির ধরনে।
বাংলাদেশ বহু সময় আন্তর্জাতিক ইস্যুতে কোনো ঘটনা ঘটার পর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। কিন্তু ভবিষ্যতের কূটনীতি হতে হবে প্রোঅ্যাকটিভ—আগেই সম্ভাব্য ঝুঁকি চিহ্নিত করা, মিত্র তৈরি করা এবং বাংলাদেশের স্বার্থের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন তৈরি করা।
দুই প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব যদি সত্যিকার অর্থে বিষয়ভিত্তিক বিশেষায়নে রূপ নেয়, তাহলে এই পরিবর্তন সম্ভব।
শেষ কথা: দুই প্রতিমন্ত্রীর কাঠামো সুযোগ, সাফল্য নির্ভর করবে ব্যবস্থাপনায়
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এখন একজন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দুই প্রতিমন্ত্রী—এটি বাংলাদেশের জন্য নিজে কোনো গ্যারান্টি নয়। তবে সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে এটি পররাষ্ট্রনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ।
হুমায়ুন কবিরের হাতে যদি দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় কূটনীতি আরও সক্রিয় করা যায়, আর শামা ওবায়েদ ইসলামের দায়িত্বের আওতায় মানবাধিকার, জলবায়ু, সমুদ্র, আইসিটি, গবেষণা, স্বাস্থ্য, এলডিসি উত্তরণ এবং সাংস্কৃতিক কূটনীতিকে কার্যকর নীতিতে রূপ দেওয়া যায়, তাহলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি আরও বহুমাত্রিক, বিশেষায়িত ও ভবিষ্যতমুখী হতে পারে।
তবে এর জন্য তিনটি বিষয় অপরিহার্য—দায়িত্বের স্পষ্ট সীমারেখা, একজনের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্রীয় অবস্থান এবং ফলাফলভিত্তিক জবাবদিহি।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি তাই দুই প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ হয়েছে কি না, সেটি নয়। আসল প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশ কি এই নতুন কাঠামোকে ব্যবহার করে এমন একটি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তৈরি করতে পারবে, যা শুধু বিশ্বের ঘটনাবলির প্রতিক্রিয়া জানাবে না, বরং আগেভাগেই বাংলাদেশের স্বার্থের জন্য আন্তর্জাতিক পরিবেশ তৈরি করবে?
সেটিই হবে এই পরিবর্তনের প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২৩ আগস্ট ২০২৬-এর দায়িত্ব বণ্টনসংক্রান্ত পরিপত্র; প্রথম আলো; বাংলা ট্রিবিউন; ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সরকারি সাংগঠনিক কাঠামো ও মন্ত্রীদের দায়িত্বসংক্রান্ত তথ্য; যুক্তরাজ্যের Foreign, Commonwealth & Development Office-এর সরকারি কাঠামো; যুক্তরাষ্ট্রের Department of State-এর সরকারি সাংগঠনিক ও দায়িত্বসংক্রান্ত তথ্য।




