Homeটুডে বাংলাবিদ্যুৎ-গ্যাসের পর এবার পানির সংকট: নাগরিক জীবনে একের পর এক জরুরি সেবার...

বিদ্যুৎ-গ্যাসের পর এবার পানির সংকট: নাগরিক জীবনে একের পর এক জরুরি সেবার ভাঙন

ঢাকায় জীবনযাত্রার মৌলিক চাহিদাগুলোই যখন অনিশ্চিত—বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির সংকট কি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি নগর ব্যবস্থাপনার গভীর সংকটের লক্ষণ?

ঢাকা | TODAY TV BD | বিশেষ বিশ্লেষণ

একটি শহর শুধু উঁচু ভবন, প্রশস্ত সড়ক, ফ্লাইওভার আর শপিং মল দিয়ে আধুনিক হয় না। একটি শহরের প্রকৃত সক্ষমতা বোঝা যায় তার নাগরিকরা প্রতিদিন কতটা নিশ্চিন্তে পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, চিকিৎসা, শিক্ষা, গণপরিবহন, নিরাপত্তা ও বাসযোগ্য পরিবেশ পেতে পারেন—সেখান থেকে।

কিন্তু ঢাকার বাস্তবতা যেন ধীরে ধীরে উল্টো পথে হাঁটছে। কিছুদিন আগে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও লোডশেডিং মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে বিপর্যস্ত করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গ্যাসের তীব্র সংকট। কোথাও দিনের বড় একটি সময় চুলা জ্বলছে না, কোথাও শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, কোথাও সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ অপেক্ষা। এর মধ্যে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পানির সরবরাহ নিয়েও অভিযোগ বাড়ছে। ফলে নাগরিক জীবনের সবচেয়ে মৌলিক তিনটি অবকাঠামো—পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস—একসঙ্গে চাপের মুখে পড়ায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।

এটি শুধু ভোগান্তির গল্প নয়। প্রশ্নটি এখন আরও বড়—একটি দেশের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্র যদি নাগরিকের মৌলিক সেবা নিশ্চিত করতেই বারবার হোঁচট খায়, তাহলে নগর উন্নয়নের আসল সাফল্য কোথায়?

এক সংকটের ওপর আরেক সংকট

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তার পেছনে গ্যাস সরবরাহের বড় ঘাটতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। জুলাইয়ের শেষ দিকে এলএনজি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্নের পর তিতাস গ্যাস তার আওতাধীন এলাকায় তীব্র নিম্নচাপের সতর্কতা দিয়েছিল। একপর্যায়ে জাতীয় গ্যাস সরবরাহ চাহিদার তুলনায় অনেক নিচে নেমে যায়। এতে আবাসিক গ্রাহকের পাশাপাশি শিল্প, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সিএনজি স্টেশনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

গ্যাসের ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি অংশ পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে না পারায় জাতীয় গ্রিডে ঘাটতি তৈরি হয়। আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের খবর আসে; ঢাকাও সেই সংকটের বাইরে থাকেনি। কিছু এলাকায় এক থেকে দুই ঘণ্টা, আবার কোথাও আরও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অর্থাৎ এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার—গ্যাসের সংকট শুধু রান্নাঘরের সমস্যা নয়; এটি বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প, পরিবহন এবং শেষ পর্যন্ত পুরো অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত।

বিদ্যুৎ গেলে বিকল্প আছে, পানি গেলে?

বিদ্যুৎ না থাকলে মানুষ কোনোভাবে ব্যাটারি, আইপিএস, জেনারেটর বা সৌরবিদ্যুতের ওপর ভরসা করতে পারেন। গ্যাস না থাকলে এলপিজি সিলিন্ডার, বৈদ্যুতিক চুলা বা বাইরে থেকে রান্না করা খাবার কিনে সাময়িকভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার কিছু সুযোগ থাকে।

কিন্তু পানি না থাকলে বিকল্প কোথায়?

এটাই পানির সংকটকে অন্য দুই সংকটের চেয়েও আলাদা করে তোলে। পানি ছাড়া রান্না, পান করা, গোসল, কাপড় ধোয়া, বাসন পরিষ্কার, টয়লেট ব্যবহার—কোনোটিই স্বাভাবিকভাবে সম্ভব নয়। ফলে পানির সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন মানে কেবল একটি পরিষেবা বন্ধ থাকা নয়; এর সঙ্গে সরাসরি মানুষের স্বাস্থ্য, পরিচ্ছন্নতা, মর্যাদা এবং জীবনযাত্রা জড়িয়ে যায়। ঢাকার মতো উচ্চঘনত্বের শহরে এই সমস্যা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পারিবারিক সংকটে রূপ নিতে পারে।

এই বাস্তবতায় পানির সংকটকে অন্য একটি সাধারণ ইউটিলিটি সমস্যার মতো দেখার সুযোগ নেই।

ঢাকার পানি সংকট কি হঠাৎ তৈরি হয়েছে?

ঢাকার পানি সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা প্রশ্ন রয়েছে—উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ, পুরোনো বিতরণ অবকাঠামো, লিকেজ, অনিয়মিত সরবরাহ এবং শহরের দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সেবার চাহিদার ব্যবধান।

সরকার নিজেও পানির চাহিদা বাড়তে থাকায় চলমান ব্যবস্থা স্থিতিশীল করতে ৯২০ কোটি ৮৫ লাখ টাকার একটি জরুরি পানি সরবরাহ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। প্রকল্পটির লক্ষ্য হলো বিদ্যমান সরবরাহব্যবস্থা স্থিতিশীল রাখা এবং নতুন বড় পৃষ্ঠজলভিত্তিক শোধনাগারগুলো চালু হওয়ার আগ পর্যন্ত বাড়তি চাহিদা সামাল দেওয়া। প্রকল্পটির মেয়াদ ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত ধরা হয়েছে।

এই প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তাই আসলে একটি বড় বাস্তবতা প্রকাশ করে—ঢাকার পানির চাহিদা ও বিদ্যমান সরবরাহব্যবস্থার সক্ষমতার মধ্যে চাপ তৈরি হয়েছে।

নগরায়ণ হয়েছে, কিন্তু নাগরিক অবকাঠামো কি একই গতিতে বেড়েছে?

ঢাকা গত কয়েক দশকে বিস্ফোরক গতিতে বিস্তৃত হয়েছে। নতুন আবাসিক এলাকা, বহুতল ভবন, বাণিজ্যিক অঞ্চল, শিল্পপ্রতিষ্ঠান—সবই বেড়েছে। কিন্তু শহরের জনসংখ্যা ও স্থাপনার বৃদ্ধির সঙ্গে পানি, পয়োনিষ্কাশন, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা সমান তালে বাড়ানো সম্ভব হয়েছে কি না—সেটিই বড় প্রশ্ন।

একটি বহুতল ভবন তৈরি হতে কয়েক বছর লাগে। কিন্তু একই ভবনে শত শত মানুষের পানি সরবরাহ, বিদ্যুৎ সংযোগ, পয়োনিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা—এসব নিশ্চিত করতে আগে থেকেই নেটওয়ার্ক পরিকল্পনা প্রয়োজন।

সমস্যা হয় তখন, যখন শহরের ভবিষ্যৎ ধারণক্ষমতার আগে ভবন তৈরি হয়ে যায়, কিন্তু নাগরিক অবকাঠামো পরে এসে সেই চাপ সামলাতে চেষ্টা করে।

তখন সংকট হয় কোথাও পানিতে, কোথাও বিদ্যুতে, কোথাও গ্যাসে।

গ্যাস সংকটের পেছনে শুধু ‘লাইন সমস্যা’ নেই

সাম্প্রতিক গ্যাস সংকটের তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে এলএনজি টার্মিনালের প্রযুক্তিগত সমস্যার কথা বলা হয়েছে। একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা কমে যায় এবং জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। পরে আবহাওয়া ও সরবরাহ-সংক্রান্ত সমস্যাও সংকটকে প্রভাবিত করেছে।

কিন্তু এখানেই দীর্ঘমেয়াদি প্রশ্নটি আসে—একটি টার্মিনাল বা একটি সরবরাহ ব্যবস্থায় সমস্যা হলেই কেন এত বড় অংশের ভোক্তা সংকটে পড়ে?

এর উত্তর খুঁজতে হলে জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতা, বিকল্প উৎস, মজুত সক্ষমতা এবং অবকাঠামোগত ঝুঁকি মূল্যায়ন করতে হবে।

কারণ একটি আধুনিক জ্বালানি ব্যবস্থা এমন হওয়া উচিত, যেখানে একটি উপাদান ব্যর্থ হলে পুরো ব্যবস্থাটি একসঙ্গে ভেঙে পড়বে না।

বিদ্যুৎ সংকটেও একই প্রশ্ন

বাংলাদেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি থাকার পরও জ্বালানি ঘাটতির কারণে কেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব না হলে বিদ্যুৎ ঘাটতি তৈরি হয়। সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান কয়েক হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আছে—শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ালেই বিদ্যুৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না।

কেন্দ্র থাকতে হবে, কিন্তু তার জন্য নির্ভরযোগ্য জ্বালানি থাকতে হবে। জ্বালানি থাকতে হবে, কিন্তু সেই জ্বালানি সরবরাহের অবকাঠামোও নির্ভরযোগ্য হতে হবে। আর সবশেষে গ্রিড ও বিতরণ ব্যবস্থাও সক্ষম হতে হবে।

অর্থাৎ বিদ্যুৎ নিরাপত্তা একটি সম্পূর্ণ শৃঙ্খল। সেই শৃঙ্খলের একটি জায়গা দুর্বল হলেই পুরো ব্যবস্থায় প্রভাব পড়ে।

তাহলে নাগরিকের ভোগান্তি কেন বারবার?

একজন নাগরিকের কাছে বিদ্যুৎ না থাকার কারণ হতে পারে গ্যাসের ঘাটতি। গ্যাস না থাকার কারণ হতে পারে এলএনজি টার্মিনালের সমস্যা। পানির সমস্যা হতে পারে বিদ্যুৎ না থাকায় পাম্প বন্ধ থাকার কারণে অথবা সরবরাহ নেটওয়ার্কের ত্রুটিতে।

কিন্তু নাগরিক এই ব্যাখ্যাগুলোর প্রতিটি আলাদাভাবে বহন করতে পারেন না।

তিনি শুধু দেখেন—
চুলায় আগুন নেই।
কল থেকে পানি আসছে না।
রাতে বাতি জ্বলছে না।

এবং এই তিনটি সংকট একসঙ্গে হলে নাগরিক জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ ভেঙে পড়ে।

বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক মানুষ, অসুস্থ ব্যক্তি, প্রতিবন্ধী নাগরিক, কর্মজীবী নারী এবং নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর ওপর এর প্রভাব তুলনামূলক বেশি পড়ে।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্যও এর বাইরে নয়

নাগরিক সেবা বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়। বিদ্যুৎ না থাকলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হয়। পানি না থাকলে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যানিটেশন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গ্যাসের সংকটে রান্না না হলে পরিবারে খাদ্যনিরাপত্তা ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় চাপ পড়ে।

হাসপাতাল ও ক্লিনিকের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুতর। সেখানে বিদ্যুৎ, পানি এবং নির্ভরযোগ্য জ্বালানি—তিনটিই অপরিহার্য। জরুরি চিকিৎসা, অস্ত্রোপচার, ল্যাবরেটরি, অক্সিজেন ব্যবস্থা, জীবাণুমুক্তকরণ—সবকিছুই নিরবচ্ছিন্ন ইউটিলিটির ওপর নির্ভর করে।

অর্থাৎ পানি-বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট শেষ পর্যন্ত স্বাস্থ্য ও শিক্ষার সংকটেও পরিণত হতে পারে।

একটি পরিবারের বাজেটেও পড়ে এর আঘাত

গ্যাস নেই—এলপিজি কিনতে হয়।

বিদ্যুৎ নেই—আইপিএস বা জেনারেটর চালাতে হয়, চার্জিং করতে হয়।

পানি নেই—বোতলজাত পানি বা জার কিনতে হয়, কখনো বাড়তি পরিবহন খরচ দিতে হয়।

একেকটি সংকট আলাদাভাবে ছোট মনে হলেও তিনটি একসঙ্গে এলে পরিবারের মাসিক ব্যয়ে নতুন চাপ তৈরি হয়।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবার, যাদের মাসিক আয় নির্দিষ্ট এবং সঞ্চয় সীমিত।

সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা কোথায়

বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু ‘সাময়িক সংকট’ হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরতা অনুধাবন করা হবে না।

সাময়িক প্রযুক্তিগত ত্রুটি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কোনো সেবা ব্যাহত হতে পারে। সেটি অস্বাভাবিক নয়। অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে যখন শহরের কোনো একটি সংকট আরেকটি সংকটকে বাড়িয়ে দেয় এবং একের পর এক নাগরিক সেবা দুর্বল হতে থাকে।

এটি আসলে Urban Resilience বা নগর সহনশীলতার প্রশ্ন।

ঢাকার মতো একটি শহরের জন্য সরকারের কাছে এখন শুধু ‘কত পানি উৎপাদন হচ্ছে’, ‘কত বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে’ বা ‘কত গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে’—এই হিসাব যথেষ্ট নয়।

জরুরি প্রশ্নগুলো হওয়া উচিত:

কোনো বড় সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যর্থ হলে বিকল্প কী?

একটি বড় এলাকা ২৪ ঘণ্টা পানি না পেলে জরুরি সরবরাহ কীভাবে হবে?

গ্যাসের চাপ হঠাৎ কমে গেলে কোন কোন খাতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে?

বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ঘাটতি হলে কী বিকল্প জ্বালানি প্রস্তুত আছে?

এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—একটি সংকট যেন আরেকটি সংকটকে বহুগুণ বাড়িয়ে না দেয়, সে জন্য সমন্বিত পরিকল্পনা কোথায়?

সমাধান শুধু নতুন প্রকল্পে নয়

ঢাকার নাগরিক সেবা উন্নত করতে নতুন প্রকল্পের পাশাপাশি বিদ্যমান অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

পুরোনো পানি ও গ্যাসলাইন কোথায় ঝুঁকিপূর্ণ—তার ডিজিটাল মানচিত্র তৈরি করা দরকার।

বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহব্যবস্থায় ঝুঁকিপূর্ণ ‘সিঙ্গেল পয়েন্ট অব ফেইলিউর’ চিহ্নিত করা দরকার।

পানি সরবরাহের ক্ষেত্রে জরুরি বিকল্প ব্যবস্থা, এলাকাভিত্তিক রিজার্ভ এবং মোবাইল ওয়াটার সাপ্লাই ব্যবস্থা প্রস্তুত রাখা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস—তিনটি খাতের তথ্য ও জরুরি পরিস্থিতি সমন্বয়ের জন্য একটি নগর ইউটিলিটি কো-অর্ডিনেশন সেল গঠন করা যেতে পারে।

নাগরিককে শুধু ‘ধৈর্য ধরুন’ বলা যথেষ্ট নয়

সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো প্রায়ই সংকটের সময় নাগরিকদের সহযোগিতা ও ধৈর্য ধরার আহ্বান জানায়। সেটি প্রয়োজনীয়। কিন্তু একই সঙ্গে নাগরিকের জানার অধিকারও আছে।

কেন পানি নেই?

কেন গ্যাসের চাপ কম?

কতক্ষণ বিদ্যুৎ থাকবে না?

সমস্যা কখন সমাধান হবে?

বিকল্প ব্যবস্থা কী?

এই প্রশ্নগুলোর নির্ভরযোগ্য ও সময়মতো উত্তর জনগণকে দেওয়া জরুরি।

কারণ তথ্যও একটি নাগরিক সেবা।

ঢাকার জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি হলো সমন্বিত পরিকল্পনা

ঢাকা বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ নগরী। এখানে প্রতিটি অবকাঠামো অন্যটির সঙ্গে যুক্ত। বিদ্যুৎ ও গ্যাস পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। পানি ও বিদ্যুৎ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। পানি ও পয়োনিষ্কাশন একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। আবার এগুলোর সবকিছুর ওপর নির্ভর করে হাসপাতাল, শিক্ষা, ব্যবসা, শিল্প ও মানুষের জীবন।

তাই প্রতিটি সেবাকে আলাদা আলাদা মন্ত্রণালয় বা সংস্থার সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না।

প্রয়োজন একটি সমন্বিত নগর নাগরিক সেবা পরিকল্পনা, যেখানে আগামী ১০, ২০ এমনকি ৩০ বছরের জনসংখ্যা ও চাহিদা বিবেচনায় পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, বর্জ্য, পয়োনিষ্কাশন এবং জরুরি সেবার সক্ষমতা নির্ধারণ করা হবে।

আজকের সংকট যেন আগামী দিনের বিপর্যয় না হয়

সাম্প্রতিক গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট দেখিয়েছে, একটি প্রযুক্তিগত বা সরবরাহগত সমস্যা কত দ্রুত জাতীয় পর্যায়ের ভোগান্তিতে পরিণত হতে পারে। একই সময়ে পানির সরবরাহে চাপ বাড়তে থাকলে নাগরিক জীবনে সংকটের মাত্রা আরও বাড়বে।

অতএব বিষয়টি এখনই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার।

কারণ মানুষ হয়তো বিদ্যুৎ না থাকলে অন্ধকারে কিছুক্ষণ থাকতে পারে। গ্যাস না থাকলে বিকল্প জ্বালানি খুঁজতে পারে। কিন্তু পানি ছাড়া কোনো শহর স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকতে পারে না।

ঢাকার মানুষ উন্নয়ন চায়, বড় প্রকল্প চায়, নতুন সড়ক চায়, আধুনিক অবকাঠামো চায়। কিন্তু তার আগে তারা চায়—কল খুললে পানি আসুক, সুইচ চাপলে বিদ্যুৎ জ্বলুক, চুলায় গ্যাস থাকুক।

এগুলো বিলাসিতা নয়। এগুলো নাগরিকের মৌলিক অধিকার এবং একটি কার্যকর রাষ্ট্রের সবচেয়ে দৃশ্যমান দায়িত্ব।

ঢাকাকে সত্যিকার অর্থে আধুনিক ও বাসযোগ্য করতে হলে এখন বড় প্রশ্নটি হওয়া উচিত শুধু—কত বিলিয়ন টাকার নতুন প্রকল্প হবে?

প্রশ্ন হওয়া উচিত—
যে শহরে কোটি মানুষ বাস করে, সেই শহরের প্রতিটি মানুষের মৌলিক নাগরিক সেবা কতটা নির্ভরযোগ্য করা গেল?

এই জায়গাতেই এখন সরকারের দ্রুত, সমন্বিত এবং দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ প্রয়োজন। কারণ পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের এই সংকটকে যদি আজকের সাময়িক ভোগান্তি ভেবে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়, তাহলে আগামী দিনের ঢাকা আরও বড় এবং আরও গভীর নাগরিক সংকটের মুখোমুখি হতে পারে।

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (BSS), তিতাস গ্যাস, পেট্রোবাংলা-সংক্রান্ত প্রকাশিত তথ্য, প্রথম আলো, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ঢাকা ট্রিবিউন, দ্য ডেইলি স্টার এবং ঢাকার পানি সরবরাহ নিয়ে সাম্প্রতিক প্রতিবেদন।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments