Homeটুডে হেলথ‘কফি এনিমা’ কী, সত্যিই কি কাজ করে? সামাজিক মাধ্যমের নতুন ট্রেন্ডের আড়ালে...

‘কফি এনিমা’ কী, সত্যিই কি কাজ করে? সামাজিক মাধ্যমের নতুন ট্রেন্ডের আড়ালে কতটা ঝুঁকি

পায়ুপথে ব্ল্যাক কফি প্রবেশ করিয়ে ‘ডিটক্স’, কোষ্ঠকাঠিন্য নিরাময় কিংবা ক্যানসার প্রতিরোধের দাবি ছড়াচ্ছে সামাজিক মাধ্যমে; কিন্তু বৈজ্ঞানিক গবেষণা কী বলছে?

হেলথ ডেস্ক | TODAY TV BD

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বাস্থ্য নিয়ে নতুন নতুন ট্রেন্ডের অভাব নেই। তারই একটি হলো ‘কফি এনিমা’—অর্থাৎ মুখে কফি পান না করে তৈরি করা কফি পায়ুপথের মাধ্যমে বৃহদান্ত্রে প্রবেশ করানো। সামাজিক মাধ্যমে এর পক্ষে নানা ধরনের দাবি ছড়াচ্ছে। কেউ বলছেন, এতে শরীরের ‘টক্সিন’ বের হয়ে যায়, কেউ বলছেন কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়, আবার কেউ এটিকে ক্যানসারসহ বিভিন্ন রোগের ‘বিকল্প চিকিৎসা’ হিসেবে প্রচার করছেন।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—সত্যিই কি কফি এনিমা শরীরকে ডিটক্স করে? কোষ্ঠকাঠিন্য কমায়? ক্যানসার প্রতিরোধ বা চিকিৎসায় কোনো ভূমিকা আছে?

বর্তমান বৈজ্ঞানিক প্রমাণের উত্তর বেশ পরিষ্কার: কফি এনিমার উপকারিতা প্রমাণ করার মতো নির্ভরযোগ্য ক্লিনিক্যাল evidence নেই; বরং এর ক্ষতির প্রমাণ রয়েছে। ২০২০ সালের একটি systematic review-তে কফি এনিমা নিয়ে প্রকাশিত নয়টি adverse-event case report পাওয়া যায়। এর মধ্যে সাতটিতে colitis বা বৃহদান্ত্রে প্রদাহের কথা বলা হয়েছে এবং বাকি কয়েকটিতে আরও গুরুতর জটিলতা পাওয়া গেছে। পর্যালোচনায় এমন কোনো গবেষণা পাওয়া যায়নি যা কফি এনিমার কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে। গবেষকেরা স্ব-ব্যবহারের ক্ষেত্রে এটি সুপারিশ করেননি।

কফি এনিমা আসলে কী?

সাধারণ এনিমায় একটি তরল পায়ুপথ দিয়ে মলাশয় বা নিম্ন অন্ত্রে প্রবেশ করানো হয়। কোষ্ঠকাঠিন্য বা নির্দিষ্ট কিছু চিকিৎসা পরিস্থিতিতে চিকিৎসকের পরামর্শে এনিমা ব্যবহার করা হয়।

কফি এনিমায় সেই তরলের বদলে তৈরি করা কফি ব্যবহার করা হয়।

সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত পদ্ধতিতে সাধারণত ব্ল্যাক কফি পায়ুপথ দিয়ে প্রবেশ করানোর কথা বলা হয়। সমর্থকেরা দাবি করেন, অন্ত্রের মাধ্যমে কফির কিছু উপাদান শোষিত হয়ে লিভার ও অন্ত্রের কার্যক্রম বাড়িয়ে শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ বের করে দিতে পারে।

কিন্তু এই দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য মানব-গবেষণা নেই। Cleveland Clinic-ও কফি এনিমাকে সুপারিশ না করে জানিয়েছে, এ পদ্ধতির মাধ্যমে immunity বাড়ানো, energy বৃদ্ধি বা ‘toxins’ দূর করার দাবির পক্ষে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

‘ডিটক্স’ করার দাবি কতটা সত্য?

কফি এনিমার সবচেয়ে প্রচলিত দাবি হলো এটি শরীরের জমে থাকা ‘বিষ’ বা টক্সিন বের করে দেয়।

কিন্তু মানবদেহের লিভার, কিডনি, ফুসফুস ও অন্ত্র স্বাভাবিকভাবেই বিপাকজাত বর্জ্য ও বিভিন্ন পদার্থ প্রক্রিয়াজাত ও বের করার কাজে যুক্ত। নিয়মিত ‘colon cleansing’ করে শরীরের টক্সিন বের করতে হবে—এমন ধারণার পক্ষে শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

Cleveland Clinic বলছে, শরীর সাধারণত নিজস্ব ব্যবস্থায় বর্জ্য অপসারণ করতে সক্ষম এবং নিয়মিত colon cleansing-এর বৈজ্ঞানিক উপকার প্রমাণিত নয়।

অর্থাৎ কফি এনিমা শরীরের একটি বিশেষ ‘ডিটক্স সিস্টেম’ চালু করে—এমন দাবির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

কফি খেলে যদি অন্ত্র সক্রিয় হয়, পায়ুপথে দিলেও কি একই কাজ হবে?

এই যুক্তিটিও সামাজিক মাধ্যমে দেখা যায়।

কফি পান করার পর কিছু মানুষের অন্ত্রের নড়াচড়া বা peristalsis বাড়তে পারে। কিন্তু মুখে কফি পান করা এবং পায়ুপথে কফি প্রবেশ করানো এক জিনিস নয়।

Cleveland Clinic-এর গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিশেষজ্ঞের মতে, কিছু মানুষের ক্ষেত্রে কফি পান করলে অন্ত্রের contractions বাড়তে পারে; কিন্তু সেই তথ্য কফি এনিমার কার্যকারিতা প্রমাণ করে না।

কোষ্ঠকাঠিন্যে কি কফি এনিমা কাজ করে?

এনিমা নিজেই কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে। কিন্তু সেটি কফির বিশেষ গুণের কারণে নয়

চিকিৎসকের পরামর্শে উপযুক্ত এনিমা কোষ্ঠকাঠিন্যের চিকিৎসায় ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু কফিকে এনিমার তরল হিসেবে ব্যবহার করার বাড়তি উপকারিতা প্রমাণিত হয়নি।

অর্থাৎ কেউ কফি এনিমার পর পায়খানা করলে সেটি দেখে ‘ডিটক্স হয়েছে’ বা ‘শরীরের বিষ বের হয়ে গেছে’ বলা ঠিক নয়।

ক্যানসারের চিকিৎসা হিসেবে কফি এনিমা?

এখানেই সবচেয়ে বড় বিপদের সম্ভাবনা।

কফি এনিমা Gerson therapy নামের একটি বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতির অংশ হিসেবে বহু বছর ধরে প্রচারিত হয়েছে। ওই থেরাপিতে বিশেষ খাদ্য, সাপ্লিমেন্ট এবং বারবার কফি এনিমার মাধ্যমে শরীর থেকে ‘টক্সিন’ বের করার ধারণা রয়েছে।

কিন্তু National Cancer Institute (NCI) জানিয়েছে, Gerson therapy-র কার্যকারিতা প্রমাণ করার মতো পর্যাপ্ত ক্লিনিক্যাল গবেষণা নেই এবং এটি ক্যানসারের চিকিৎসা হিসেবে FDA অনুমোদিত নয়। NCI-র তথ্য অনুযায়ী, কফি এনিমা-সহ এই ধরনের থেরাপির সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুতর ক্ষতির ঘটনাও রিপোর্ট হয়েছে।

আরও সরাসরি ভাষায় বলা যায়—

কফি এনিমা ক্যানসার সারায়—এমন কোনো নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

তাহলে ঝুঁকি কোথায়?

পায়ুপথ ও বৃহদান্ত্রের আবরণ অত্যন্ত সংবেদনশীল। সেখানে ভুল তরল, ভুল তাপমাত্রা বা ভুল পদ্ধতিতে কিছু প্রবেশ করালে আঘাত ও প্রদাহ হতে পারে।

সম্ভাব্য জটিলতার মধ্যে রয়েছে—

Colitis: বৃহদান্তুর আবরণে প্রদাহ হতে পারে। এতে পেটব্যথা, ডায়রিয়া, মলত্যাগের সময় অস্বস্তি বা রক্তপাত হতে পারে।

Proctitis: মলাশয়ে প্রদাহ হতে পারে, যার ফলে ব্যথা, জ্বালা, রক্তপাত বা বারবার পায়খানার বেগ হতে পারে।

Rectal burn: কফি অতিরিক্ত গরম হলে মলাশয়ের ভেতরের টিস্যু পুড়ে যেতে পারে।

Electrolyte imbalance: বারবার এনিমা ব্যবহার করলে শরীরের পানি ও গুরুত্বপূর্ণ ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে এটি হৃদ্‌যন্ত্র ও অন্যান্য অঙ্গের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

সংক্রমণ: অনিরাপদ পানি, সরঞ্জাম বা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অন্ত্রে সংক্রমণ হওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে। NCI-তে কফি এনিমা-সম্পর্কিত গুরুতর সংক্রমণের একটি case report-এর কথাও উল্লেখ রয়েছে।

‘প্রাকৃতিক’ মানেই নিরাপদ নয়

কফি একটি পরিচিত খাদ্য। সেখান থেকেই হয়তো অনেকের মনে হতে পারে—এটি শরীরে প্রবেশ করালে নিশ্চয় ক্ষতি হবে না।

কিন্তু কোনো উপাদান খাবার হিসেবে নিরাপদ হওয়া আর পায়ুপথ দিয়ে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে প্রবেশ করানো নিরাপদ হওয়া এক বিষয় নয়।

মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গের গঠন, শোষণক্ষমতা ও সংবেদনশীলতা আলাদা। তাই মুখে খাওয়ার জন্য উপযোগী কোনো পদার্থ অন্য পথে ব্যবহার করলেই নিরাপদ থাকবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

কারা বিশেষভাবে সতর্ক থাকবেন?

নিজে থেকে কোনো ধরনের কফি এনিমা ব্যবহার করা উচিত নয়। বিশেষ করে যাদের—

  • অন্ত্রের প্রদাহজনিত রোগ রয়েছে
  • মলদ্বার বা বৃহদান্তুর সমস্যা রয়েছে
  • কিডনি রোগ রয়েছে
  • হৃদ্‌রোগ রয়েছে
  • শরীরে পানি ও ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্যজনিত সমস্যা রয়েছে
  • বয়স্ক বা দুর্বল শারীরিক অবস্থায় রয়েছেন
  • ক্যানসারের চিকিৎসা চলছে

তাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সামাজিক মাধ্যমে ‘সাফল্যের গল্প’ কেন বিভ্রান্তিকর হতে পারে?

কেউ একটি ভিডিওতে বলতে পারেন—“কফি এনিমা দেওয়ার পর আমার পেট পরিষ্কার হয়েছে”, “শরীর হালকা লাগছে” কিংবা “পুরনো রোগ ভালো হয়েছে।”

কিন্তু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নয়

একজনের কোনো পরিবর্তন অন্য মানুষের ক্ষেত্রেও একইভাবে ঘটবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। কোনো চিকিৎসা কার্যকর কি না জানতে হলে নিয়ন্ত্রিত গবেষণা, পর্যাপ্ত রোগী, নিরাপত্তা তথ্য এবং পুনরায় যাচাই করা ফলাফল প্রয়োজন।

২০২০ সালের systematic review-তে কফি এনিমার কার্যকারিতা নিয়ে এমন কোনো গবেষণা পাওয়া যায়নি, অথচ adverse-event case reports পাওয়া গেছে।

কফি এনিমা বনাম চিকিৎসকের পরামর্শে সাধারণ এনিমা

এই দুই বিষয় এক করে দেখা উচিত নয়।

কিছু ক্ষেত্রে কোষ্ঠকাঠিন্য বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা পরিস্থিতিতে চিকিৎসকের পরামর্শে উপযুক্ত এনিমা ব্যবহার করা হয়। কিন্তু সেটি কফি এনিমার কার্যকারিতা প্রমাণ করে না।

কোষ্ঠকাঠিন্য হলে প্রথমে কারণ খুঁজে দেখা, পর্যাপ্ত পানি, খাদ্যে আঁশ, শারীরিক সক্রিয়তা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ ব্যবহার—এসব বেশি যুক্তিসঙ্গত পথ।

দাবি বনাম বাস্তবতা

দাবি: কফি এনিমা শরীরের টক্সিন বের করে।

বাস্তবতা: এ দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য মানব-গবেষণা নেই।

দাবি: কফি এনিমা ক্যানসার চিকিৎসা করতে পারে।

বাস্তবতা: ক্যানসার চিকিৎসায় এর কার্যকারিতার প্রমাণ নেই এবং Gerson therapy FDA অনুমোদিত ক্যানসার চিকিৎসা নয়।

দাবি: কফি এনিমা সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক, তাই নিরাপদ।

বাস্তবতা: colitis, proctitis, পোড়া, dehydration, electrolyte disturbance এবং অন্যান্য গুরুতর জটিলতার রিপোর্ট রয়েছে।

দাবি: পায়খানা হয়ে গেলেই প্রমাণ হয় যে শরীর ‘ডিটক্স’ হয়েছে।

বাস্তবতা: এনিমা অন্ত্র খালি করতে পারে, কিন্তু সেটাকে শরীর থেকে বিশেষ ‘বিষাক্ত পদার্থ’ বের হওয়ার প্রমাণ বলা যায় না।

তাহলে করণীয় কী?

সামাজিক মাধ্যমে কোনো ‘ডিটক্স’ বা ‘বিকল্প চিকিৎসা’ ট্রেন্ড দেখে নিজে থেকে শুরু করার আগে একটি প্রশ্ন করুন—এটির কার্যকারিতা নিয়ে peer-reviewed clinical evidence কী? ঝুঁকি কতটা?

কোষ্ঠকাঠিন্য, পেটের সমস্যা বা অন্য কোনো অসুস্থতার জন্য চিকিৎসা প্রয়োজন হলে রোগের কারণ অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়াই নিরাপদ। আর ক্যানসারের মতো গুরুতর রোগে সামাজিক মাধ্যমের কোনো বিকল্প পদ্ধতির জন্য প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসা বন্ধ বা বিলম্ব করা উচিত নয়।

শেষ কথা

কফি পান করার সঙ্গে কফি এনিমার কোনো বৈজ্ঞানিক সমতুল্যতা নেই। কফি একটি পানীয়; কফি এনিমা একটি অনাবশ্যক ও ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতি, যার কথিত ‘ডিটক্স’ বা রোগ নিরাময়ের উপকারিতা প্রমাণিত নয়।

সামাজিক মাধ্যমের ট্রেন্ড হিসেবে এটি যতই আকর্ষণীয় দেখাক, চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বর্তমানে উপকারের চেয়ে ঝুঁকির প্রমাণই বেশি। তাই ‘ডিটক্স’ করার নামে নিজের শরীরের সংবেদনশীল অন্ত্রকে অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকিতে ফেলা উচিত নয়।

তথ্যসূত্র: Cleveland Clinic; PubMed/Medicine—The safety and effectiveness of self-administered coffee enema: A systematic review of case reports; National Cancer Institute (NCI), Gerson Therapy PDQ; U.S. Food and Drug Administration-সংক্রান্ত চিকিৎসা নিরাপত্তা তথ্য।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments