Homeটুডে ওয়ার্ল্ডইরানকে একঘরে করার ট্রাম্পের অর্থনৈতিক যুদ্ধ: চীন-রাশিয়ার দেয়ালে কি আটকে যাবে ওয়াশিংটন?

ইরানকে একঘরে করার ট্রাম্পের অর্থনৈতিক যুদ্ধ: চীন-রাশিয়ার দেয়ালে কি আটকে যাবে ওয়াশিংটন?

‘ইকোনমিক ডি-ডে’ ঘোষণা ট্রাম্পের; তেহরানের বাণিজ্যপথ বন্ধে চাপ চীনের ওপরও—কিন্তু বেইজিং ও মস্কো কি মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বাইরে তৈরি করেছে নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতা?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | TODAY TV BD

ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক সংঘাত প্রায় ছয় মাসে পৌঁছানোর পর এবার যুদ্ধের আরেকটি ফ্রন্ট খুলতে চাইছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প—অর্থনীতি

তেহরানকে শুধু সামরিকভাবে নয়, তার বাণিজ্য, তেল বিক্রি, মুদ্রা লেনদেন, জাহাজ চলাচল এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। তাঁর ভাষায়, ইরানের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত নতুন ব্যবস্থা হতে পারে ইতিহাসে কোনো দেশের বিরুদ্ধে নেওয়া সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক অর্থনৈতিক পদক্ষেপগুলোর একটি। একই সঙ্গে যারা ইরানকে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকতে সাহায্য করবে, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন তিনি।

কিন্তু এখানেই ওয়াশিংটনের সামনে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি দাঁড়িয়েছে—

ইরানকে বিশ্ব অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করতে হলে যে দেশটির সহযোগিতা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সেই চীনকেই কি যুক্তরাষ্ট্র একই সঙ্গে চাপ দিতে পারবে?

আর দ্বিতীয় প্রশ্ন—রাশিয়াকে কি এমন কোনো অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে ফেরানো সম্ভব, যেখান থেকে মস্কো বহু বছর ধরেই বেরিয়ে এসেছে?

বিশ্লেষকদের বড় অংশের মতে, এখানেই ট্রাম্পের নতুন কৌশলের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা।


🌍 কী ঘটছে: যুদ্ধ এবার অর্থনীতির ময়দানে

ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন পরিকল্পনার লক্ষ্য শুধু ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা নয়। লক্ষ্য হলো ইরানের নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে বেঁচে থাকার অবকাঠামো ভেঙে দেওয়া

মার্কিন প্রেসিডেন্টের অভিযোগ, তেল চোরাচালান, মুদ্রা বিনিময়, নগদ অর্থ স্থানান্তর, জাহাজের মালিকানা ও নিবন্ধন এবং ভুয়া কোম্পানির মাধ্যমে ইরান এখনো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে।

ওয়াশিংটনের যুক্তি হলো—ইরানের অর্থনৈতিক প্রবাহ বন্ধ করা গেলে তেহরানের পক্ষে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালানো, সামরিক কর্মসূচি অর্থায়ন করা এবং তার আঞ্চলিক অংশীদারদের সহায়তা করা কঠিন হয়ে পড়বে।

অর্থাৎ, এবার লক্ষ্য শুধু ইরানের সামরিক ক্ষমতা নয়—যুদ্ধ চালানোর অর্থনৈতিক ক্ষমতা


🎯 কেন চীনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ?

ইরানের অর্থনীতির জন্য চীন এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অংশীদারদের একটি।

বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান Kepler-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইরানের রপ্তানি করা তেলের প্রায় ৮০ শতাংশ চীন কিনেছে।

এই একটি পরিসংখ্যানই বোঝায়, ইরানের তেল রপ্তানি বন্ধ করতে হলে শুধু তেহরানের ওপর চাপ দেওয়া যথেষ্ট নয়। বেইজিংকেও সেই ব্যবস্থার অংশ করতে হবে।

কিন্তু সমস্যা হলো—চীনা ক্রেতাদের বড় একটি অংশ মার্কিন ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর প্রত্যক্ষভাবে নির্ভরশীল নয়। ফলে ওয়াশিংটন কোনো নিষেধাজ্ঞা জারি করলেই চীনের স্বাধীনভাবে পরিচালিত কিছু শোধনাগার বা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ওপর তার প্রভাব সরাসরি পড়বে না।

এখানেই তৈরি হচ্ছে নতুন শক্তির সমীকরণ।


🇨🇳 চীন: নিষেধাজ্ঞা মানার চেয়ে নিজের স্বার্থ বড়

চীন সরাসরি বলেছে, একতরফা চাপ ও নিষেধাজ্ঞা দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট সমাধান করা যাবে না।

চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অবস্থান হলো—দায়িত্বশীল পক্ষগুলোর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমাধানের দিকে এগোনো উচিত।

চ্যাথাম হাউসের জ্যেষ্ঠ গবেষক ইউ জিয়ের মূল্যায়নও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, ট্রাম্পের নতুন হুমকিতে চীন-ইরান বিদ্যমান বাণিজ্য সম্পর্কে বড় পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা কম।

এর পেছনে শুধু ইরানের প্রতি চীনের রাজনৈতিক সহানুভূতি কাজ করছে না। চীনের নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বার্থও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইরানি তেল চীনের জন্য তুলনামূলকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি উৎস। আরও বড় বিষয় হলো, মার্কিন চাপ মেনে তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করলে বেইজিং একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক অংশীদার হারাবে।


⚠️ কিন্তু চীনের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিলে যুক্তরাষ্ট্রও কি ক্ষতিগ্রস্ত হবে?

এখানেই ট্রাম্পের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।

ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য চীনের বড় ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনতে হলে ওয়াশিংটনকে এমন একটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যার প্রতিক্রিয়া মার্কিন-চীন বাণিজ্য সম্পর্কের ওপরও পড়তে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীন এমনিতেই দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্য, প্রযুক্তি, শুল্ক এবং কৌশলগত প্রভাব নিয়ে প্রতিযোগিতায় রয়েছে।

অর্থাৎ,

ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক যুদ্ধ → চীনের ওপর চাপ → মার্কিন-চীন সম্পর্কের নতুন সংকট

এই সমীকরণই ট্রাম্পের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক।

চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সম্ভাব্য ওয়াশিংটন সফরের আগে বেইজিংয়ের সঙ্গে নতুন সংঘাত তৈরি করতে ট্রাম্প কতটা প্রস্তুত, সেটিও প্রশ্ন।


🇷🇺 রাশিয়া: নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে বসবাসে অভ্যস্ত এক শক্তি

চীনের চ্যালেঞ্জ এক ধরনের। রাশিয়ার চ্যালেঞ্জ অন্য ধরনের।

মস্কোর সঙ্গে ইরানের মোট বাণিজ্য চীনের তুলনায় অনেক কম। কিন্তু দুই দেশ বহু বছর ধরে পশ্চিমা অর্থনৈতিক কাঠামোর বাইরে নিজেদের বিকল্প সম্পর্ক তৈরি করেছে।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে রাশিয়া ও ইরান একটি ২০ বছর মেয়াদি কৌশলগত অংশীদারি চুক্তি সই করেছে। প্রদত্ত সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসে দুই দেশের বাণিজ্য প্রায় ৪৮০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।

এ সম্পর্ক শুধু বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জ্বালানি, পরিবহন, সামরিক সহযোগিতা এবং কাস্পিয়ান সাগরকেন্দ্রিক যোগাযোগ—সব ক্ষেত্রেই দুই দেশ নিজেদের মধ্যে বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলছে।


🛰️ সামরিক সহযোগিতার প্রশ্ন

ইরান-রাশিয়া সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর অংশ সামরিক সহযোগিতা।

প্রদত্ত প্রতিবেদনে ইউরোপীয় একটি সরকারি নথির বরাতে দাবি করা হয়েছে, রাশিয়া সমুদ্রপথে ইরানে ড্রোন উৎপাদনের সরঞ্জাম, গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক পাঠিয়েছে।

তবে যুদ্ধকালীন এ ধরনের দাবির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—প্রতিটি চালান বা সরঞ্জামের তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা না গেলে সেটিকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে দেখানো যাবে না।

তবে বৃহত্তর বাস্তবতা হলো, রাশিয়া নিজেই পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার দীর্ঘ তালিকার মধ্যে রয়েছে। ফলে ইরানের ওপর নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে মস্কোর ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করার জায়গা আগের তুলনায় সীমিত।


🛢️ ইরানের সবচেয়ে বড় ঢাল: তেল

ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক যুদ্ধের কেন্দ্রে রয়েছে তেল

তেহরানের জন্য তেল রপ্তানি হলো বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। আর চীনের কাছে সেই তেল বিক্রি চালু থাকলে ইরানের অর্থনীতিকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করা অত্যন্ত কঠিন।

এখানে একটি কৌশলগত বৈপরীত্য রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র চাইছে—

তেল বিক্রি বন্ধ → বৈদেশিক মুদ্রা কমে যাক → অর্থনীতি দুর্বল হোক → সামরিক ব্যয় কমুক → তেহরান আলোচনায় বাধ্য হোক।

অন্যদিকে ইরানের কৌশল হতে পারে—

তেল বিক্রি চালু → বিকল্প অর্থপ্রবাহ → যুদ্ধ চালানোর সক্ষমতা বজায় → আলোচনায় আত্মসমর্পণের বদলে দরকষাকষি।

সুতরাং যুদ্ধ এখন শুধু ক্ষেপণাস্ত্রের নয়; তেলবাজারও একটি যুদ্ধক্ষেত্র।


💰 ব্রিকস: ইরানের বিকল্প দরজা?

ইরান এখন পশ্চিমা আর্থিক ব্যবস্থার বিকল্প পথ খুঁজছে।

দেশটি BRICS-এর সদস্য এবং নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়েও কাজ করছে বলে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে।

তেহরান চাইছে—

  • সদস্য দেশগুলোর নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেন;
  • দ্বিপক্ষীয় মুদ্রা বিনিময়;
  • ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানো;
  • পশ্চিমা ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে আর্থিক যোগাযোগ বাড়ানো।

তবে এখানে বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমা আছে।

BRICS এখনো কোনো পূর্ণাঙ্গ বিকল্প বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা নয়।

ডলারভিত্তিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, ব্যাংকিং ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থার জায়গা রাতারাতি অন্য কোনো মুদ্রা বা প্রতিষ্ঠান নিতে পারবে না।

তবে দীর্ঘমেয়াদে বিকল্প অর্থনৈতিক অবকাঠামো তৈরি হলে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা কমতে পারে।


🇺🇸 ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় সমস্যা: নিষেধাজ্ঞা সর্বত্র পৌঁছায় না

ট্রাম্পের পরিকল্পনার একটি মৌলিক দুর্বলতা হলো—নিষেধাজ্ঞা তখনই সবচেয়ে কার্যকর হয়, যখন বড় অর্থনৈতিক শক্তিগুলো একই নিয়ম মেনে চলে।

ইরানের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অর্থনৈতিক অবরোধ সফল করতে হলে ওয়াশিংটনের প্রয়োজন হবে—

  • চীনের সহযোগিতা;
  • রাশিয়ার সহযোগিতা;
  • উপসাগরীয় দেশগুলোর সহযোগিতা;
  • বৈশ্বিক shipping network-এর সহযোগিতা;
  • আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার সমন্বিত প্রয়োগ।

কিন্তু এর প্রায় প্রতিটি স্তরেই এখন বিকল্প সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।

তাই কাতারের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক পল মাসগ্রেভের মূল্যায়ন—যুক্তরাষ্ট্র এমন এক ধরনের সমন্বিত নিষেধাজ্ঞা একতরফাভাবে বাস্তবায়ন করতে চাইছে, যা বাস্তবে বহুপক্ষীয় সহযোগিতা ছাড়া কঠিন।


🇦🇪 সংযুক্ত আরব আমিরাতের পদক্ষেপ কেন গুরুত্বপূর্ণ?

এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের ওপর অনির্দিষ্টকালের বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইরানের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ উপসাগরীয় বাণিজ্যিক কেন্দ্র ও পুনঃরপ্তানি ব্যবস্থার ক্ষেত্রে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।

তবে এখানেও একটি প্রশ্ন রয়েছে—

ইরানের অন্যান্য বড় অংশীদারদের কি একই পথে আনা যাবে?

বিশেষ করে চীনকে?

সেটিই এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।


🏛️ ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়: ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি মার্কিন নতুন অর্থনৈতিক পদক্ষেপকে “অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ” হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

তেহরানের যুক্তি হলো, একতরফা নিষেধাজ্ঞা কোনো রাজনৈতিক সমাধান তৈরি করবে না; বরং আন্তর্জাতিক অর্থনীতিকে বিভক্ত করবে এবং রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।

এটি কেবল ইরানের বক্তব্য নয়।

চীনও প্রকাশ্যে বলেছে, একতরফা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সমস্যা সমাধান করা যাবে না।


⚖️ কারা লাভবান, কারা ক্ষতিগ্রস্ত?

লাভবান হতে পারে

চীন:
ইরানি তেল কম দামে কেনার সুযোগ পেতে পারে এবং একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে নিজের অর্থনৈতিক প্রভাব বাড়াতে পারে।

রাশিয়া:
ইরানের সঙ্গে বিকল্প বাণিজ্য ও কৌশলগত সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ পাবে।

বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থা:
BRICS-এর মতো কাঠামোতে ডলার-বহির্ভূত লেনদেনের প্রয়োজনীয়তা বাড়তে পারে।

ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে

ইরান:
বাণিজ্য, বিনিয়োগ, বৈদেশিক মুদ্রা ও ভোক্তা অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়বে।

যুক্তরাষ্ট্র:
চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে নতুন অর্থনৈতিক সংঘাতে জড়ানোর ঝুঁকি তৈরি হবে।

বিশ্ব অর্থনীতি:
তেলবাজার ও আন্তর্জাতিক shipping network আরও অস্থিতিশীল হতে পারে।

ইউরোপ:
জ্বালানি মূল্য ও বাণিজ্যিক সরবরাহে বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।


📈 তিন স্তরে কী হতে পারে?

তাৎক্ষণিক প্রভাব

ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়বে। তেল বিক্রি, shipping, ব্যাংকিং ও বাণিজ্যিক মধ্যস্থতাকারীদের ওপর নজরদারি কঠোর হবে।

স্বল্পমেয়াদি প্রভাব

চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ে ওয়াশিংটন-বেইজিং নতুন দরকষাকষিতে যেতে পারে। রাশিয়া ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াতে পারে। উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—দুই পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক সামলে চলার চেষ্টা করবে।

দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব

সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হতে পারে বিশ্ব অর্থনীতির আরও বিভাজন

একদিকে থাকবে ডলারভিত্তিক পশ্চিমা ব্যবস্থা।

অন্যদিকে চীন-রাশিয়া-ইরান এবং BRICS-এর অংশগ্রহণে বিকল্প অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক গড়ে উঠতে পারে।

এটি হলে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার সবচেয়ে বড় শক্তি—বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা—ধীরে ধীরে দুর্বল হতে পারে।


🇧🇩 বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ কী?

বাংলাদেশ সরাসরি এই নিষেধাজ্ঞা যুদ্ধে অংশীদার নয়। কিন্তু এর অর্থনৈতিক অভিঘাত বাংলাদেশের ওপর আসতে পারে।

বিশেষ করে—

🛢️ জ্বালানি

ইরান-চীন বাণিজ্য ব্যাহত হলে এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘ হলে আন্তর্জাতিক তেলের দাম বাড়তে পারে। এতে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বাড়বে।

💵 বৈদেশিক মুদ্রা

তেলের দাম বাড়লে ডলারের চাহিদা বাড়বে এবং আমদানি ব্যয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে।

🚢 বাণিজ্য

শিপিং রুট, বীমা এবং freight cost বাড়লে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও অন্যান্য রপ্তানি খাতের পরিবহন ব্যয়ও বাড়তে পারে।

🌾 খাদ্যনিরাপত্তা

জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে কৃষি উৎপাদন এবং খাদ্য আমদানির ব্যয়ও পরোক্ষভাবে বাড়তে পারে।

তবে এসব সম্ভাব্য প্রভাব; বর্তমানে বাংলাদেশে এর নির্দিষ্ট মাত্রা কত হবে, তা নির্ভর করবে যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার সময়কাল এবং বৈশ্বিক তেলের দামের ওপর।


🧭 এরপর কী হতে পারে?

এই মুহূর্তে তিনটি দৃশ্যপট সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথম দৃশ্যপট—চীন চাপ মেনে নেয়।
এটি হলে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ নাটকীয়ভাবে বাড়বে। কিন্তু বর্তমান চীনা অবস্থান দেখে এটি সহজে ঘটবে বলে মনে হয় না।

দ্বিতীয় দৃশ্যপট—চীন সীমিতভাবে সহযোগিতা করে, কিন্তু ইরানের তেল কেনা চালিয়ে যায়।
এটাই হয়তো সবচেয়ে বাস্তবসম্মত মধ্যপন্থা। এতে ওয়াশিংটনের চাপ থাকবে, কিন্তু তেহরানের অর্থনীতি পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হবে না।

তৃতীয় দৃশ্যপট—চীন ও রাশিয়া বিকল্প অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক আরও দ্রুত গড়ে তোলে।
এটি হলে বিষয়টি শুধু ইরান যুদ্ধ থাকবে না; এটি হয়ে উঠতে পারে যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিদ্বন্দ্বিতার আরেকটি অধ্যায়।


🔎 দাবি বনাম যাচাইকৃত তথ্য

যাচাই করা তথ্য/প্রতিবেদিত তথ্য:
ইরানের বিরুদ্ধে নতুন অর্থনৈতিক চাপ ও তৃতীয় দেশগুলোর ওপর শাস্তির হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। চীন একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করেছে। রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারি কাঠামো রয়েছে। Kepler-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইরানের রপ্তানি তেলের বড় অংশ চীনে গেছে।

যা এখনো পূর্বাভাস বা বিশ্লেষণ:
চীন ও রাশিয়া ট্রাম্পের পরিকল্পনাকে পুরোপুরি ব্যর্থ করে দেবে—এটি এখনো নিশ্চিত নয়। একইভাবে BRICS দ্রুত পশ্চিমা আর্থিক ব্যবস্থার কার্যকর বিকল্প হয়ে যাবে—এ দাবিরও বাস্তব প্রমাণ এখনো সীমিত।


শেষ কথা

ইরানকে সামরিকভাবে দুর্বল করার চেষ্টা ব্যর্থ বা সফল—এই বিতর্কের বাইরে একটি বিষয় এখন ক্রমশ পরিষ্কার হচ্ছে।

তেহরানকে একঘরে করা যতটা সহজ বলে ওয়াশিংটন ভাবছে, বাস্তব বিশ্ব ততটা একমেরু নয়।

ইরানের পাশে দাঁড়ানোর অর্থ চীন বা রাশিয়া যে নিঃশর্তভাবে তেহরানের মিত্র হয়ে গেছে, তা নয়। বরং তাদের প্রত্যেকের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ রয়েছে।

চীন চায় সস্তা জ্বালানি, মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দরকষাকষির শক্তি ধরে রাখতে।

রাশিয়া চায় পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার বাইরে নিজের বিকল্প অর্থনৈতিক ও কৌশলগত নেটওয়ার্ক আরও বিস্তৃত করতে।

আর ইরান চায়—যুদ্ধ যত দীর্ঘই হোক, তার অর্থনৈতিক জীবনরেখা যেন পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন না হয়।

ফলে আসল যুদ্ধটি এখন আর শুধু তেহরানের আকাশে বা পারস্য উপসাগরে হচ্ছে না।

একটি যুদ্ধ চলছে ব্যাংকের মধ্যে।
আরেকটি তেলের বাজারে।
আরেকটি জাহাজ চলাচলের পথে।
আর সবচেয়ে বড় যুদ্ধটি চলছে—বিশ্ব অর্থনীতি কে নিয়ন্ত্রণ করবে, সেই প্রশ্নে।

ট্রাম্প যদি ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে হাঁটু গেড়ে বসাতে চান, তাঁকে শেষ পর্যন্ত শুধু তেহরানের সঙ্গে নয়—বেইজিং, মস্কো এবং ক্রমবর্ধমান বহুমেরু অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গেও লড়তে হবে।

এ কারণেই ইরান যুদ্ধের পরবর্তী অধ্যায়টি হয়তো সবচেয়ে বেশি নির্ধারিত হবে মিসাইল দিয়ে নয়, বাজার দিয়ে। :::

📌 তথ্যসূত্র

প্রথম আলো/আল-জাজিরা বিশ্লেষণ; সমকাল; Kepler-এর বাজারতথ্য; চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশ্য বক্তব্য; Chatham House ও Georgetown University-এর উদ্ধৃত বিশ্লেষণ।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments