Homeটুডে বাংলাজঙ্গল সলিমপুরের ছায়া কি পড়েছে চট্টগ্রামের বরইতলীতে?

জঙ্গল সলিমপুরের ছায়া কি পড়েছে চট্টগ্রামের বরইতলীতে?

সরকারি খাসজমিতে শত শত বসতি, পাহাড় কেটে প্লট বেচাকেনা, ১৮,৯৯৪ ঘনফুট মাটি কাটার সরকারি প্রমাণ—জরিমানার পরও কাটা পাহাড়ে ঘর; বড় হতে থাকা এক ‘ভূমি দখল অর্থনীতি’র অনুসন্ধান

টুডে টিভি বিডি | বিশেষ অনুসন্ধান

চট্টগ্রাম নগরের ব্যস্ততা পেরিয়ে পাহাড়ের দিকে এগোতে থাকলে হঠাৎ বদলে যায় দৃশ্যপট। পাকা রাস্তা ফুরিয়ে আসে। সরু মেঠোপথ উঠে যায় পাহাড়ের গা বেয়ে। দুই পাশে টিন, বাঁশ আর বেড়ার ঘর। কোথাও পাহাড়ের ঢালে ঠেস দিয়ে ঘর, কোথাও কেটে সমান করা মাটির ওপর নতুন কাঠামো। কোথাও আবার সদ্য কাটা পাহাড়ের দাগ।

জায়গাটির নাম বরইতলী—জঙ্গল দক্ষিণ পাহাড়তলী।

চট্টগ্রাম নগরের ১ নম্বর দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডের এই এলাকা এখনো ‘জঙ্গল সলিমপুর’ হয়নি। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে—এখনই কি সেই ভবিষ্যতের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে?

সরকারি নথি বলছে, জঙ্গল দক্ষিণ পাহাড়তলী মৌজার চারটি বিএস দাগে মোট ৯৪ দশমিক ৪৫ একর জমি ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত সরকারি ভূমি। অথচ এই সরকারি জমির বড় অংশে গড়ে উঠেছে বসতি। স্থানীয়দের হিসাবে শুধু বরইতলীতেই তিন শতাধিক পরিবার; আশপাশের পাহাড়ে আরও কয়েক শ ঘর। সুনির্দিষ্ট সরকারি জরিপ না থাকায় মোট দখলকৃত জমি বা পরিবারের সংখ্যা এখনো নির্ধারিত হয়নি।

আর এখানেই গল্পটি শুধু ‘অবৈধ বসতি’র থাকে না।

এটি হয়ে উঠছে পাহাড় → প্লট → বিক্রি → বসতি → স্থায়ী দখল—একটি সম্ভাব্য চক্রের গল্প।


একটি পাহাড় কীভাবে ‘জমি’ হয়ে যায়?

বরইতলীতে কথা বলে যে চিত্র পাওয়া যায়, তাতে অনেক বাসিন্দাই জমি কেনার কথা বলেছেন।

কারও দাবি, ৭০ হাজার টাকা দিয়ে জায়গা নিয়েছেন। কারও ১ লাখ, কারও ৩ লাখ টাকা। প্রতিবেদনে পাওয়া গেছে এমন একটি লিখিত কাগজও, যেখানে পাঁচটি সেমিপাকা ঘরসহ একটি জায়গা ৭ লাখ টাকায় হাতবদলের কথা লেখা আছে।

কিন্তু কাগজটি নিবন্ধিত দলিল নয়; স্ট্যাম্পে করা একটি হস্তান্তরপত্র।

অর্থাৎ, একজন ক্রেতা টাকা দিয়েছেন। একজন বিক্রেতা জায়গা বুঝিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু সেই জায়গার বৈধ মালিকানা কোথায়—সেটিই প্রশ্ন।

একজন পোশাকশ্রমিক আবদুর রহিমের বক্তব্য,

“আমরা নিজেরা পাহাড় কাটিনি। যারা জায়গা বিক্রি করেছে, তারাই পাহাড় কেটে ছোট ছোট প্লট তৈরি করে বুঝিয়ে দিয়েছে। কোনো কাগজ দেয়নি।”

এই একটি বক্তব্যই পুরো চক্রটির সম্ভাব্য কাঠামো বুঝতে সাহায্য করে।

যদি কোনো পাহাড় বা সরকারি জমিকে প্রথমে কেটে ছোট ছোট অংশে ভাগ করা হয়, তারপর সেই অংশ দরিদ্র মানুষের কাছে বিক্রি করা হয়, তাহলে নতুন বসতি স্থাপনের পর সেই জায়গা খালি করা প্রশাসনের জন্য অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়ে।


শুরুটা চার দশক আগে, কিন্তু গতি বেড়েছে কখন?

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বরইতলীতে বসতি শুরু হয় প্রায় চার দশক আগে।

মোহাম্মদ মানিকের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৮৬ সালের দিকে সেখানে মাত্র ১০–১৫টি ঘর ছিল। ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর সন্দ্বীপ, হাতিয়া ও উপকূলের বিভিন্ন এলাকা থেকে বাস্তুচ্যুত মানুষ এসে বসতি বাড়াতে থাকে।

অর্থাৎ এর সূচনায় বাস্তুচ্যুতি ও আবাসনের প্রয়োজন ছিল বলে স্থানীয় ইতিহাসে উঠে আসে।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই বসতি কি একটি সংগঠিত ভূমি-বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে?

এটাই এখন বড় প্রশ্ন।

কারণ বর্তমান চিত্রে শুধু ঘর নেই। আছে—

প্লট।

হস্তান্তর।

দাম।

মধ্যস্থতাকারী।

পাহাড় কাটার অভিযোগ।

এবং সরকারি জমি।


সরকারি জমি, ব্যক্তিগত বাজার

জঙ্গল দক্ষিণ পাহাড়তলীর চারটি দাগ—৩৫৯২, ৩৬৯৬, ৩০৫৩ ও ৩৫৪০—মিলে ৯৪ দশমিক ৪৫ একর জমি ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত বলে ভূমি অফিসের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনটি জানিয়েছে। এর একটি দাগ ‘টিলা’, একটি ‘ছন খোলা’ এবং অন্য দুটি ‘নাল’ হিসেবে রেকর্ডভুক্ত। বাস্তবে অবশ্য এই এলাকাগুলোর বড় অংশেই পাহাড় রয়েছে।

এই বৈপরীত্যও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

কারণ যখন বাস্তবে পাহাড় রয়েছে, কিন্তু কোনো রেকর্ডে জমির শ্রেণি অন্য নামে দেখা যায়, তখন ভবিষ্যৎ দখল ও ভূমি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।

চট্টগ্রামের একই অঞ্চলে বিএস জরিপে পাহাড়কে ‘নাল’, ‘বাড়ি’ বা অন্য শ্রেণিতে রেকর্ড করার নজির নিয়েও আলাদা অনুসন্ধান প্রকাশিত হয়েছে। জঙ্গল দক্ষিণ পাহাড়তলীর অন্য একটি পাহাড়কে ‘শণখোলা’ এবং আরেকটিকে ‘নাল’ হিসেবে রেকর্ডের তথ্যও সামনে এসেছে।

অর্থাৎ এখানে ভূমির শ্রেণিবিন্যাস নিজেই একটি অনুসন্ধানের বিষয়।


১৮,৯৯৪ ঘনফুট পাহাড় কাটা: সংখ্যাটি আসলে কত বড়?

পরিবেশ অধিদপ্তর ১৪টি স্থান পরিদর্শন করে ১৮ হাজার ৯৯৪ ঘনফুট, অর্থাৎ প্রায় ৫৩৮ ঘনমিটার পাহাড়ি মাটি কাটার প্রমাণ পেয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এটি পুরো এলাকার হিসাব নয়।

অর্থাৎ সরকারি সংস্থার পাওয়া সংখ্যা যতটুকু তারা পরিদর্শন করেছে, ততটুকুর

এটি যদি পুরো বরইতলীর পাহাড় কাটার হিসাব না হয়, তাহলে বাস্তব ক্ষতির পরিমাণ আরও বড় কি না—সেটি অজানা।

১৪ জনকে শনাক্ত করে মোট ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। কিন্তু জরিমানার পরও অনেক কাটা জায়গায় ঘর রয়ে গেছে এবং সরকারি খাসজমি দখলমুক্ত হয়নি।

এখানেই প্রশাসনের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন—

পাহাড় কেটে ফেলার পর জরিমানা দিলে কি পাহাড় ফিরে আসে?

উত্তর—না।

আর একটি বসতি গড়ে ওঠার পর সেটি উচ্ছেদ করাও আগের চেয়ে কঠিন।


জরিমানা হলো, কিন্তু দখল গেল না

এই জায়গাটিই বরইতলীকে ভবিষ্যৎ ‘জঙ্গল সলিমপুর’ হওয়ার আশঙ্কার সঙ্গে যুক্ত করছে।

গত ১০ বছরে এখানে কোনো উচ্ছেদ অভিযান হয়নি বলে বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে জানা গেছে। চলতি বছরের জুনে পাহাড় কাটার অভিযোগের পর ভূমি অফিস পরিদর্শন করে। পরিবেশ অধিদপ্তর পরে ১৪টি স্থানে পাহাড় কাটার প্রমাণ পায় এবং ৪ আগস্ট জরিমানা করা হয়।

কিন্তু জরিমানার পরেও—

ঘর আছে।

দখল আছে।

কাটা পাহাড় আছে।

এই পরিস্থিতি যদি চলতেই থাকে, তবে আজকের ‘অবৈধ বসতি’ আগামী দশকের ‘স্থায়ী জনপদ’ হয়ে যেতে পারে।

ঠিক এভাবেই জঙ্গল সলিমপুরের মতো এলাকায় সমস্যাটি বহু বছর ধরে বড় হয়েছে।


জঙ্গল সলিমপুর থেকে শিক্ষা কী?

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর এখন প্রশাসনের জন্য বড় নিরাপত্তা ও ভূমি-দখল চ্যালেঞ্জ।

২০২৬ সালেও সেখানে বড় যৌথ অভিযান, সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক, অস্ত্র এবং পাহাড়ি এলাকায় অপরাধী নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অভিযান হয়েছে। মার্চে প্রশাসনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবি করা হয়, আবার মে মাসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলার পর যৌথ অভিযান চালানো হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, জঙ্গল সলিমপুর “১৭ বছরের রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের ফসল” এবং সাধারণ বাসিন্দাদের উচ্ছেদ না করে অপরাধী ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন।

অর্থাৎ প্রশাসনের বর্তমান উপলব্ধি হলো—জঙ্গল সলিমপুরের সমস্যাকে শুধু ‘অবৈধ বসতি’ বলে দেখা যায় না। এটি ভূমি দখল, অপরাধ, রাজনৈতিক প্রভাব ও দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক ব্যর্থতার সমন্বিত ফল।

বরইতলীতে এখনো সেই পরিমাণ অপরাধী কাঠামোর প্রমাণ নেই।

কিন্তু ভূমি দখলের প্রাথমিক লক্ষণগুলো—প্লট তৈরি, অর্থের বিনিময়ে হাতবদল, পাহাড় কাটা ও বসতি—একই ধরনের।


দরিদ্র মানুষ কি দখলদার, নাকি বড় চক্রের ‘ফ্রন্টলাইন ক্রেতা’?

এই প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বরইতলীতে যাদের সঙ্গে কথা হয়েছে, তাদের বড় অংশ নিম্ন আয়ের মানুষ—পোশাকশ্রমিক, গাড়িচালক, দিনমজুর, রংমিস্ত্রি।

তাঁরা টাকা দিয়ে জায়গা কিনেছেন।

কেউ বৈধ দলিল পাননি।

অনেকে জানিয়েছেন, পাহাড় আগে থেকেই কেটে প্লট বানিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

অর্থাৎ যদি এখানে কোনো সংগঠিত দখল-বাণিজ্য থেকে থাকে, তাহলে এই নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো সম্ভবত শেষ পর্যায়ের ক্রেতা—মূল দখল বা বিক্রয়চক্রের নির্মাতা নয়।

এখানে প্রশাসনের জন্য একটি কঠিন ভারসাম্য আছে।

অবৈধ দখলমুক্ত করতে হবে।

কিন্তু একই সঙ্গে দেখতে হবে—

দখলের সুবিধাভোগী কারা?

কারা পাহাড় কাটল?

কারা প্লট বানাল?

কারা টাকা নিল?

কারা মধ্যস্থতা করল?

শুধু যে পরিবার ৭০ হাজার বা ১ লাখ টাকা দিয়ে ঘর তুলেছে, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে যদি মূল বিক্রয়চক্রকে অন্ধকারে রাখা হয়, তাহলে সমস্যার উৎস অক্ষত থেকে যাবে।


রুবেলকে ঘিরে অভিযোগ: মধ্যস্থতা কতটা, দখল কতটা?

স্থানীয় কয়েকজন বর্তমান সময়ে পাহাড় কাটা ও জায়গা হাতবদলে মো. রুবেলের প্রভাব থাকার অভিযোগ করেছেন।

রুবেল নিজেকে হাটহাজারী উপজেলা শ্রমিক দলের সাবেক সহদপ্তর সম্পাদক পরিচয় দেন। তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

তবে বরইতলীতে একটি জমি কেনাবেচায় মধ্যস্থতার কথা তিনি স্বীকার করেছেন।

তাঁর বিরুদ্ধে আবুধাবিপ্রবাসী স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ ফরহাদ ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ করেছেন এবং ২৭ জুলাই বাংলাদেশ দূতাবাসে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন—এমন তথ্য প্রতিবেদনে এসেছে।

রুবেল এই অভিযোগও অস্বীকার করেছেন।

এই অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীন তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত করা যাবে না।

কিন্তু একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে একই এলাকায় জমি কেনাবেচার মধ্যস্থতা ও চাঁদা দাবির অভিযোগ—দুটি বিষয়ই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আলাদা করে যাচাই করা প্রয়োজন।


রাজনৈতিক ছায়ার অভিযোগও আছে—কিন্তু প্রমাণ কোথায়?

বাসিন্দাদের একাংশ অভিযোগ করেছেন, আগের আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তৎকালীন কাউন্সিলর গাজী শফিউল আজমের অনুসারী হিসেবে পরিচিত কয়েকজন পাহাড় কাটা ও ঘর নির্মাণে প্রভাব খাটাতেন।

তবে এই অভিযোগের পক্ষে লিখিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং গাজী শফিউল আজমের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।

তাই এই অভিযোগকে প্রমাণিত তথ্য হিসেবে প্রকাশ করা যাবে না

তবে এখানে বৃহত্তর প্রশ্নটি থাকে—

রাজনৈতিক পরিচয় বদলালেও কি ভূমি দখলের পদ্ধতি বদলায়?

জঙ্গল সলিমপুরের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, যে কোনো রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার সঙ্গে ভূমি-দখল চক্রের সম্পর্ক তৈরি হলে প্রশাসনের জন্য সমস্যাটি বহু গুণ বাড়তে পারে।


সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়: ‘পাহাড়’কে ‘প্লট’ হিসেবে দেখা

পাহাড় কাটার ক্ষতি শুধু কয়েক ঘনমিটার মাটি কমে যাওয়া নয়।

পাহাড় তার প্রাকৃতিক ঢাল, মাটি ধরে রাখার ক্ষমতা এবং জলধারণের ভূমিকা হারালে বর্ষায় ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ে।

চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায় বসতি স্থাপন ও পাহাড় কাটার সঙ্গে ভূমিধস, জলাবদ্ধতা, প্রাকৃতিক নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি—এসব ঝুঁকি দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা ও প্রশাসনিক আলোচনার অংশ।

আর আইনও এখানে পরিষ্কার।

বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এর ধারা ৬(খ) অনুযায়ী সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত কিংবা ব্যক্তিমালিকানাধীন পাহাড় ও টিলা কাটা বা মোচন নিষিদ্ধ; অপরিহার্য জাতীয় স্বার্থে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেওয়ার বিধান রয়েছে।

অর্থাৎ প্রশ্নটি শুধু প্রশাসনিক অনুমতির নয়—

পাহাড় কাটার আইনি নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও তা হলো কীভাবে?


‘৫০ টাকার স্ট্যাম্পে’ পাহাড়ের মালিকানা?

বরইতলীর গল্পের সবচেয়ে প্রতীকী দলিলগুলোর একটি হলো—৫০ টাকার স্ট্যাম্পে করা হস্তান্তরপত্র

যেখানে পাঁচটি সেমিপাকা ঘরসহ একটি জায়গা ৭ লাখ টাকায় হস্তান্তরের কথা আছে।

কাগজ আছে।

টাকা লেনদেনের দাবি আছে।

ঘর আছে।

কিন্তু নিবন্ধিত মালিকানা দলিল নেই।

এটি যদি সরকারি খাসজমি হয়, তবে প্রশ্ন আরও বড়—

যে জমির মালিক রাষ্ট্র, সেই জমি কে বিক্রি করছে?

আর—

কোন আইনি ক্ষমতায় বিক্রি করছে?

এখানে কেবল ক্রেতার অপরাধ খোঁজা যথেষ্ট নয়। বিক্রেতার পরিচয়, জমি বিভাজনের পদ্ধতি, মধ্যস্থতাকারী, অর্থের প্রবাহ ও স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ভূমিকা অনুসন্ধানের দাবি রাখে।


প্রশাসনের সামনে এখন তিনটি সময়সীমা

বরইতলী এখনো এমন জায়গায় আছে যেখানে সমস্যার আকার নিয়ন্ত্রণযোগ্য।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা ইতোমধ্যে বলেছেন—

“আরেকটা জঙ্গল সলিমপুর হওয়ার কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না। দ্রুত সেখানে অভিযান পরিচালনা করে অবৈধভাবে বসবাসকারীদের উচ্ছেদ করা হবে।”

এই বক্তব্য এখন বাস্তব পদক্ষেপে রূপ নেওয়ার অপেক্ষায়।

কারণ সামনে তিনটি সম্ভাব্য পথ।

প্রথম পথ: এখনই সরকারি জমি চিহ্নিত, নতুন স্থাপনা বন্ধ, পাহাড় কাটা বন্ধ ও দখলমুক্ত করা।

দ্বিতীয় পথ: শুধু জরিমানা—তারপর আবার নতুন ঘর।

তৃতীয় পথ: কিছু বছর অপেক্ষা করে বসতি আরও বাড়তে দেওয়া, তারপর হাজার পরিবারকে উচ্ছেদের অসম্ভব রাজনৈতিক ও মানবিক সংকটে পড়া।

জঙ্গল সলিমপুরের ইতিহাস তৃতীয় পথটির ঝুঁকি দেখিয়ে দিয়েছে।


কিন্তু উচ্ছেদ করলেই কি সমস্যার সমাধান হবে?

এখানেই আরও একটি মানবিক প্রশ্ন।

স্থানীয় বহু পরিবার নিম্ন আয়ের।

কেউ হয়তো বহু বছর ধরে সেখানে বসবাস করছে।

কেউ হয়তো জায়গাটি বৈধভাবে নিজের বলে বিশ্বাস করেই টাকা দিয়েছে।

যদি প্রশাসন এখন উচ্ছেদ করে, তাহলে তাদের কোথায় পাঠানো হবে?

সুতরাং জঙ্গল দক্ষিণ পাহাড়তলীর জন্য প্রয়োজন দ্বিমুখী ব্যবস্থা

অবৈধ পাহাড় কাটা ও দখলচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান

এবং

দীর্ঘদিন বসবাসকারী প্রকৃত নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর জন্য ন্যায়সংগত যাচাই ও প্রয়োজনে পুনর্বাসন।

জঙ্গল সলিমপুর নিয়েও বর্তমান সরকারের বক্তব্যে প্রকৃত বাসিন্দাদের টেকসই পুনর্বাসনের কথা এসেছে।

বরইতলীতেও একই নীতি প্রয়োগ করা যেতে পারে।


প্রশাসনের জন্য যে তদন্ত এখনই দরকার

এই এলাকার প্রকৃত চিত্র বের করতে একটি সমন্বিত অভিযান প্রয়োজন।

ভূমি অফিস বের করবে—কোন দাগ সরকারি, কোনটি ব্যক্তি মালিকানাধীন, কোথায় দখল।

পরিবেশ অধিদপ্তর নির্ধারণ করবে—কোথায় কত পাহাড় কাটা হয়েছে।

প্রশাসন যাচাই করবে—কোন বসতি কখন গড়ে উঠেছে।

সিএস/এসএ/আরএস/বিএস রেকর্ড মিলিয়ে দেখা হবে—ভূমির শ্রেণি ও মালিকানা কীভাবে বদলেছে।

স্যাটেলাইট ও পুরোনো aerial imagery দিয়ে দেখা হবে—১০, ১৫ বা ২০ বছর আগে পাহাড়ের আকৃতি কেমন ছিল।

অর্থনৈতিক অনুসন্ধান করবে—কাদের মাধ্যমে প্লটের টাকা নেওয়া হয়েছে।

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—

যারা জায়গা বিক্রি করেছে, তাদের তালিকা বের করতে হবে।

কারণ—

ক্রেতাকে উচ্ছেদ করলে ঘর কমবে।
বিক্রেতাকে ধরলে বাজার বন্ধ হতে পারে।


দাবি বনাম নথিভিত্তিক বাস্তবতা

বিষয়বর্তমান তথ্য
৯৪.৪৫ একর জমি খাসভূমি অফিসের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে উল্লেখ
বরইতলীতে ৩০০+ পরিবারস্থানীয়দের হিসাব; পূর্ণ সরকারি জরিপ নেই
১৪ স্থানে পাহাড় কাটাপরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শনে প্রমাণিত
কাটা মাটি১৮,৯৯৪ ঘনফুট ≈ ৫৩৮ ঘনমিটার
জরিমানা১৪ জনকে মোট ১.৬৫ লাখ টাকা
গত ১০ বছরে উচ্ছেদস্থানীয় ও কর্মকর্তাদের মতে তথ্য পাওয়া যায়নি
প্লট বিক্রিবাসিন্দাদের বক্তব্য ও হস্তান্তরপত্রের উদাহরণ
রুবেলের প্রভাবস্থানীয় অভিযোগ; রুবেল অস্বীকার করেছেন
রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতাস্থানীয় অভিযোগ; লিখিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি
নতুন ‘জঙ্গল সলিমপুর’ হওয়ার আশঙ্কাবিশেষজ্ঞ ও প্রশাসনের সতর্কতা

সাসপেন্সের জায়গাটা আসলে কোথায়?

বরইতলীর গল্পের সবচেয়ে বড় রহস্য পাহাড়ের ওপর ঘর নয়।

রহস্য হলো—

এই ঘরগুলো উঠছে কীভাবে?

যদি জায়গা সরকারি হয়—

বিক্রি করছে কে?

যদি পাহাড় কাটা নিষিদ্ধ হয়—

কাটছে কে?

যদি ১৪ জনের বিরুদ্ধে প্রমাণ থাকে—

শুধু ১৪ জনই কি পুরো চক্র?

যদি মানুষ ৭০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকা দিয়ে জায়গা কিনে—

টাকাগুলো যাচ্ছে কার হাতে?

যদি স্ট্যাম্পে জমি বিক্রি হয়—

বিক্রেতার কাছে জমির অধিকার এল কীভাবে?

আর যদি প্রশাসন এতদিন কোনো উচ্ছেদ অভিযান না চালিয়ে থাকে—

তাহলে এত বছরের মধ্যে কে নজরদারি করছিল?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত বরইতলী শুধু একটি পাহাড়ি বসতি নয়।

এটি একটি সম্ভাব্য ভূমি দখল অর্থনীতির প্রাথমিক মানচিত্র


শেষ সতর্কবার্তা: আজ বরইতলী, কাল জঙ্গল সলিমপুর?

জঙ্গল সলিমপুরের গল্প একদিনে তৈরি হয়নি।

প্রথমে পাহাড়।

তারপর একটি ঘর।

তারপর আরও কয়েকটি ঘর।

তারপর মানুষের প্রয়োজন।

তারপর জমির হাতবদল।

তারপর দখল।

তারপর রাজনৈতিক প্রভাব।

তারপর অপরাধী গোষ্ঠী।

শেষে এমন এক জনপদ, যেখানে প্রশাসনের প্রবেশই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

বরইতলী এখনো সেই জায়গায় পৌঁছায়নি।

এটাই সবচেয়ে বড় সুযোগ।

সমস্যা এখনো ছোট।

পাহাড় এখনো আছে।

সরকারি জমি এখনো শনাক্ত করা সম্ভব।

দখলকারীদের অনেককে শনাক্ত করা সম্ভব।

প্লট বিক্রির চক্র এখনো পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যায়নি।

সুতরাং প্রশ্নটি প্রশাসনের সামনে এখনই—

আরেকটি জঙ্গল সলিমপুর তৈরি হওয়ার পর অভিযান চালানো হবে, নাকি বরইতলীকে জঙ্গল সলিমপুর হয়ে ওঠার আগেই থামানো হবে?

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক বলেছেন, “আরেকটা জঙ্গল সলিমপুর হওয়ার কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না।”

এই প্রতিশ্রুতির বাস্তব পরীক্ষা এখন মাঠে।

কারণ পাহাড় একবার কেটে সমতল হলে তা আগের অবস্থায় ফিরতে দশকও যথেষ্ট নাও হতে পারে।

আর সরকারি জমি একবার শত শত ঘরের নিচে চলে গেলে সেটি ফেরত নেওয়া শুধু প্রশাসনিক অভিযান থাকে না—তখন তা হয়ে ওঠে আইন, পরিবেশ, মানবিকতা ও রাজনীতির একসঙ্গে লড়াই।

বরইতলী এখনো সেই সীমানার আগের দিকে দাঁড়িয়ে।

এই পাহাড় কি বাঁচবে—নাকি কয়েক বছর পর এটিও হয়ে উঠবে ‘আরেক জঙ্গল সলিমপুর’?

উত্তরটি নির্ভর করছে আজকের সিদ্ধান্তের ওপর।

—টুডে টিভি বিডি | বিশেষ অনুসন্ধান

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments