বিএনপির মনোনয়ন জমা, ২০ আগস্ট ভোটের সম্ভাবনা; ঠাকুরগাঁওয়ের শিক্ষক পরিবার থেকে জাতীয় রাজনীতির শীর্ষে ওঠা মির্জা ফখরুলের জীবন, শিক্ষা, আমলা-শিক্ষকতার পেশা ও চার দশকের রাজনৈতিক পথচলার গল্প
ঢাকা | TODAY TV BD | বিশেষ প্রতিবেদন
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) বেলা আড়াইটার দিকে বিএনপির একটি প্রতিনিধিদল প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের নির্বাচনী কর্তা এ এম এম নাসির উদ্দিনের কাছে তাঁর মনোনয়নপত্র জমা দেয়।
মির্জা ফখরুলের মনোনয়নপত্রে প্রস্তাবক হিসেবে সই করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সংসদ সদস্য আবদুল মঈন খান এবং সমর্থক হিসেবে সই করেছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সংসদ সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। বিএনপির প্রতিনিধিদলে আরও ছিলেন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী, হুইপ আশরাফ উদ্দীন নিজান, মিয়া নুরুদ্দীন অপু, রকিবুল ইসলামসহ দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল অনুযায়ী ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র বাছাই, ১৮ আগস্ট প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন এবং ২০ আগস্ট ভোটগ্রহণের দিন নির্ধারিত রয়েছে। একাধিক বৈধ প্রার্থী থাকলে সেদিন জাতীয় সংসদ ভবনের সংসদ কক্ষে ভোট হবে।
মির্জা ফখরুলের সামনে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বাস্তবতা হলো—রাষ্ট্রপতি পদে তাঁর প্রার্থিতা শুধু ক্ষমতাসীন দলের একটি মনোনয়ন নয়; বরং তাঁর প্রায় ছয় দশকের রাজনৈতিক-প্রশাসনিক জীবনের দীর্ঘ পথচলার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিণতি।
ঠাকুরগাঁওয়ে জন্ম, রাজনৈতিক পরিবারে বেড়ে ওঠা
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জন্ম ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে। তাঁর বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী ও রাজনীতিক এবং একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তাঁর পরিবারে রাজনীতির দীর্ঘ ঐতিহ্য ছিল। চাচা মির্জা গোলাম হাফিজও ছিলেন বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিক; তিনি ভূমিমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী এবং দ্বিতীয় জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আরেক চাচা উইং কমান্ডার এস আর মির্জা মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন।
তবে ফখরুলের নিজের রাজনৈতিক পথচলা সরাসরি পারিবারিক রাজনীতির ধারাবাহিকতায় শুরু হয়নি। তাঁর ছাত্রজীবনের রাজনীতি ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বামঘরানার ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত।
ছাত্ররাজনীতিতে হাতেখড়ি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি পড়ার সময় ষাটের দশকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় হন। তিনি তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (EPSU)-এ যুক্ত হন। সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এস এম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পর ধীরে ধীরে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বেও উঠে আসেন।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল সময়ে তিনি সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন। অর্থাৎ তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রথম বড় অধ্যায়টি বিএনপির মাধ্যমে নয়, বরং আইয়ুববিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময়কার বামপন্থী ছাত্ররাজনীতির মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছিল।
এই সময়ের রাজনীতি তাঁকে একদিকে গণআন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করে, অন্যদিকে সংগঠন পরিচালনা, জনসংযোগ ও রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার অভিজ্ঞতা দেয়। পরবর্তী জীবনের জাতীয় রাজনীতিতে এই অভিজ্ঞতার প্রভাব ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থনীতির ছাত্র থেকে সরকারি কলেজের শিক্ষক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে অনার্সসহ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন মির্জা ফখরুল। পড়াশোনা শেষ করে ১৯৭২ সালে তিনি বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দেন এবং ঢাকা কলেজে অর্থনীতির প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে কয়েকটি সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন।
শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি সরকারের বিভিন্ন দায়িত্বেও কাজ করেন। বাংলাদেশ সরকারের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে উপপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। অর্থাৎ তাঁর কর্মজীবনের দীর্ঘ একটি সময় ছিল প্রশাসন ও শিক্ষাক্ষেত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
জিয়াউর রহমানের প্রশাসনে প্রবেশ
সত্তরের দশকের শেষদিকে মির্জা ফখরুলের কর্মজীবনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক আসে। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রশাসনে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৯ সালের দিকে শুরু হওয়া এই দায়িত্ব তিনি ১৯৮২ সালে এস এ বারীর পদত্যাগ পর্যন্ত পালন করেন।
এই সময় সরকারি প্রশাসনের পাশাপাশি রাষ্ট্র পরিচালনার কাছ থেকে কাজ দেখার সুযোগ পান তিনি। তবে এরপরও তিনি সরাসরি দলীয় রাজনীতিতে স্থায়ীভাবে প্রবেশ করেননি।
সরকারি চাকরি ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে
১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে মির্জা ফখরুল সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশের পথ বেছে নেন। ১৯৮৮ সালে তিনি নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। স্থানীয় সরকারে সরাসরি জনপ্রতিনিধি হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক ভিত্তি আরও শক্ত হয়।
এরপর স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী আন্দোলনের সময় তিনি বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৯২ সালে তাঁকে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি করা হয়। এই পর্যায় থেকেই তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় ক্রমশ জাতীয় পর্যায়ের দিকে এগোতে থাকে।
প্রথম জাতীয় নির্বাচনে পরাজয়, তারপর সংসদে প্রবেশ
১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন মির্জা ফখরুল। কিন্তু ওই নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী খাদেমুল ইসলাম চৌধুরীর কাছে পরাজিত হন।
১৯৯৬ সালের নির্বাচনেও একই আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তিনি এবং এবারও আওয়ামী লীগের প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন। তবে এই সময়ের মধ্যে তাঁর রাজনৈতিক সংগঠক হিসেবে অবস্থান আরও শক্ত হয়ে ওঠে।
অবশেষে ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে জয়ী হয়ে সংসদে প্রবেশ করেন মির্জা ফখরুল। সেই নির্বাচনের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারে তিনি প্রথমে কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হন। পরে তাঁকে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়।
একজন শিক্ষক ও সরকারি কর্মকর্তা থেকে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, তারপর সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী—এই পর্যায়ে এসে তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার জাতীয় পর্যায়ে সুস্পষ্ট অবস্থান তৈরি করে।
২০০৮-এর পর সংসদে না থেকেও দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে উত্থান
২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আবার ঠাকুরগাঁও-১ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন মির্জা ফখরুল। তবে সে নির্বাচনে তিনি জয়ী হতে পারেননি। সংসদের বাইরে থাকলেও তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব কমেনি; বরং দলীয় সাংগঠনিক দায়িত্ব বাড়তে থাকে।
২০০৯ সালের বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে তাঁকে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব করা হয়। এরপর ২০১১ সালে দলের তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তাঁকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করেন।
এই দায়িত্ব তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরগুলোর একটি। কারণ এর পর থেকেই জাতীয় নির্বাচনী রাজনীতির পাশাপাশি বিএনপির কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক কর্মসূচি, সরকারবিরোধী আন্দোলন, দলীয় কূটনীতি ও সাংগঠনিক কার্যক্রমে তাঁকে সামনের সারিতে দেখা যায়।
২০১৬ সালে মহাসচিব
২০১৬ সালের ৩০ মার্চ বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলের পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে দলের সপ্তম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় তিনি বিএনপির আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বে উঠে আসেন।
এরপর থেকে তিনি বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচির অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাবাস, দলীয় আন্দোলন, নির্বাচন, সরকারবিরোধী কর্মসূচি এবং রাজনৈতিক সংলাপ—প্রায় প্রতিটি বড় রাজনৈতিক ইস্যুতেই তিনি বিএনপির প্রধান বক্তা ও মুখপাত্রের ভূমিকা পালন করেছেন।
রাজনীতি থেকে কারাগারেও যেতে হয়েছে
বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলন ও সংঘর্ষের ঘটনায় মির্জা ফখরুলকে একাধিকবার গ্রেপ্তার ও কারাবরণ করতে হয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে ঢাকায় বিএনপির মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে সহিংসতার পর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং পরবর্তী সময়ে তিনি কারাগারে ছিলেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি বারবার মামলা, গ্রেপ্তার ও কারাবাসের মুখোমুখি হয়েছেন—যা বিএনপির রাজনীতিতে তাঁর দীর্ঘস্থায়ী নেতৃত্বের পাশাপাশি দলটির আন্দোলন-সংগ্রামের সময়কার ঝুঁকিপূর্ণ রাজনৈতিক বাস্তবতারও অংশ।
শিক্ষক, প্রশাসক ও রাজনীতিক—তিন অভিজ্ঞতার সমন্বয়
মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের একটি ব্যতিক্রমী দিক হলো তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের তিনটি আলাদা অভিজ্ঞতা—শিক্ষকতা, সরকারি প্রশাসন এবং দলীয় রাজনীতি।
তিনি রাজনীতিতে আসার আগে সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেছেন, সরকারি প্রশাসনে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতর থেকে কাজ দেখেছেন। আবার একই সঙ্গে ষাটের দশকের ছাত্রআন্দোলনের রাজনীতিও করেছেন। ফলে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় শুধু দলীয় পদ-পদবিতে সীমাবদ্ধ নয়; তাঁর কর্মজীবনে একাডেমিয়া, প্রশাসন, স্থানীয় সরকার ও জাতীয় রাজনীতির অভিজ্ঞতা যুক্ত হয়েছে।
ব্যক্তিজীবন ও পরিবার
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের স্ত্রী রাহাত আরা বেগম কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং ঢাকায় একটি বীমা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন বলে সরকারি ও দলীয় জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে। তাঁদের দুই মেয়ে—মির্জা শামারুহ ও মির্জা সাফারুহ। শামারুহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা ও শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় পোস্টডক্টরাল গবেষণার সঙ্গে যুক্ত; সাফারুহও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক এবং শিক্ষকতা করেন।
রাষ্ট্রপতি পদে কেন ফখরুল?
বিএনপির রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, দলীয় ঐক্য ধরে রাখার ভূমিকা এবং সরকার ও বিরোধী রাজনীতি—দুই পর্যায়েই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা—মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি পদের জন্য একটি স্বাভাবিকভাবে আলোচিত নাম করে তুলেছে।
বিশেষ করে তিনি একই সঙ্গে একজন প্রবীণ রাজনীতিক এবং সাবেক সরকারি কর্মকর্তা। রাষ্ট্র পরিচালনার প্রশাসনিক কাঠামো সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতা এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ভূমিকা—দুই দিক থেকেই তাঁকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদের জন্য বিবেচনা করা হয়েছে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করছেন।
তবে রাষ্ট্রপতি পদটি দলীয় নির্বাহী পদের মতো নয়। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের Head of State এবং সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হন। সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদে এই নির্বাচনব্যবস্থা নির্ধারিত রয়েছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট কীভাবে হয়?
বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন জনগণের সরাসরি ভোটে হয় না। সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্যরা রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করেন। ১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইনের ১০ ধারায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের প্রকাশ্য ভোটে নির্বাচিত হন এবং প্রত্যেক সংসদ সদস্যের একটি ভোট থাকে। ভোটে প্রত্যেক প্রার্থী সর্বোচ্চ ভোট পেলে নির্বাচিত হন।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের এই প্রকাশ্য ভোটব্যবস্থা সাধারণ সংসদীয় ভোটের চেয়ে আলাদা আইনি কাঠামোয় পরিচালিত হয়। অর্থাৎ ভোটের ব্যালটে সংসদ সদস্যের পরিচয়-সংবলিত ব্যবস্থা রয়েছে এবং ভোট গণনাও প্রকাশ্যে করা হয়।
বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা কেন গুরুত্বপূর্ণ
বর্তমান সংসদে বিএনপির শক্তিশালী সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় মির্জা ফখরুলের নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে। তবে তাঁর মনোনয়ন এখনও নির্বাচন কমিশনের যাচাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে এবং একাধিক প্রার্থী বৈধ থাকলে ২০ আগস্ট ভোট অনুষ্ঠিত হবে। সাম্প্রতিক বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার নজির বেশি থাকলেও এবার বিরোধী প্রার্থী থাকায় নির্বাচনটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতে পারে।
অলি আহমদ প্রার্থী হওয়ায় বদলেছে সমীকরণ
বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষ থেকে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ প্রার্থী হয়েছেন বলে সংবাদমাধ্যমে এসেছে। ফলে মির্জা ফখরুলের মনোনয়ন বৈধ হওয়ার পরও যদি অলি আহমদের প্রার্থিতা বহাল থাকে এবং তিনি প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করেন, তাহলে ২০ আগস্ট সংসদে ভোটের প্রয়োজন হবে।
এমন নির্বাচন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৯১ সালের পর একাধিক প্রার্থীর কারণে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদে প্রকৃত ভোটের নজির খুব সীমিত; পরবর্তী বেশিরভাগ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।
শিক্ষকতা থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জীবনের দিকে ফিরে তাকালে তাঁর বর্তমান অবস্থানকে এক ধাপের রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি দীর্ঘ কয়েক দশকের ধারাবাহিক যাত্রার ফল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতি থেকে শুরু করে সরকারি কলেজের শিক্ষকতা; সরকারি প্রশাসনের দায়িত্ব থেকে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি; সেখান থেকে বিএনপির জেলা নেতৃত্ব; সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী; পরে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং শেষ পর্যন্ত মহাসচিব—প্রতিটি ধাপ তাঁকে ধীরে ধীরে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
এখন সেই দীর্ঘ যাত্রার সামনে আরেকটি বড় অধ্যায়—বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদ।
২০ আগস্টের ভোটের ফলই নির্ধারণ করবে, ঠাকুরগাঁওয়ের সেই শিক্ষক পরিবারের সন্তান মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্বে বসছেন কি না। তবে তাঁর মনোনয়ন জমা দেওয়ার মধ্য দিয়ে একটি বিষয় ইতোমধ্যে নিশ্চিত—বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর নিজের নামটি এখন দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদের প্রার্থীদের তালিকায় যুক্ত হয়ে গেছে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর
জন্ম: ২৬ জানুয়ারি ১৯৪৮, ঠাকুরগাঁও
শিক্ষা: ঢাকা কলেজ; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে অনার্স ও স্নাতকোত্তর
প্রথম পেশা: সরকারি কলেজের শিক্ষক
বিসিএস: শিক্ষা ক্যাডার
সরকারি দায়িত্ব: পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর, ইউনেস্কো জাতীয় কমিশন, জিয়াউর রহমানের প্রশাসনে ব্যক্তিগত সচিব
পৌর রাজনীতি: ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান
বিএনপিতে যোগ: নব্বইয়ের দশকের শুরু
ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপি: সভাপতি, ১৯৯২
সংসদ সদস্য: ঠাকুরগাঁও-১, ২০০১
প্রতিমন্ত্রী: কৃষি; পরে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন
সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব: ২০০৯
ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব: ২০১১
বিএনপি মহাসচিব: ৩০ মার্চ ২০১৬ থেকে
রাষ্ট্রপতি প্রার্থী: বিএনপি মনোনীত, ২০২৬
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: ২০ আগস্ট ২০২৬, একাধিক বৈধ প্রার্থী থাকলে
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (BSS), প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার, বাংলাদেশ সরকারের পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের জীবনবৃত্তান্ত, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (BNP)–এর জীবনীসংক্রান্ত তথ্য, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১, বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ, সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট রায়।




