Homeশোবিজ টুডেবিদায়, নীরব কারিগর: বিটিভির সোনালি যুগের স্থপতি মুস্তাফিজুর রহমান আর নেই

বিদায়, নীরব কারিগর: বিটিভির সোনালি যুগের স্থপতি মুস্তাফিজুর রহমান আর নেই

একজন প্রযোজক, প্রশাসক, শিক্ষক ও স্বপ্নস্রষ্টার চিরবিদায়; যাঁর হাতে গড়ে উঠেছিল বাংলাদেশের টেলিভিশনের স্বর্ণযুগের বহু অধ্যায়

কিছু মানুষ চলে যান নিঃশব্দে, অথচ রেখে যান এমন এক উত্তরাধিকার, যা প্রজন্মের পর প্রজন্মের মনে বেঁচে থাকে। মুস্তাফিজুর রহমান ছিলেন ঠিক তেমনই একজন মানুষ — যাঁর মুখ হয়তো টেলিভিশনের পর্দায় কখনো দেখা যায়নি, কিন্তু যাঁর রুচি, চিন্তা আর সৃজনশীলতা মিশে আছে আমাদের প্রতিটি শৈশব-স্মৃতির ভাঁজে।

রোববার (২৬ জুলাই) রাজধানীর উত্তরার নিজ বাসভবনে বার্ধক্যজনিত কারণে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) সাবেক মহাপরিচালক, কিংবদন্তি প্রযোজক মুস্তাফিজুর রহমান। তাঁর প্রয়াণে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। এই বিদায় শুধু একজন সাবেক আমলার বিদায় নয় — এটি বাংলাদেশের টেলিভিশন ইতিহাসের এক উজ্জ্বল, সোনালি অধ্যায়ের নীরব সমাপ্তি।

যে মানুষটি পর্দার আড়ালে থেকেও ইতিহাস গড়েছিলেন

আশির দশক। বাংলাদেশে সবেমাত্র টেলিভিশন হয়ে উঠছে মানুষের ঘরের সবচেয়ে আপন সঙ্গী। প্রতিটি সন্ধ্যায় পরিবার জড়ো হতো একটিমাত্র পর্দার সামনে। সেই সময়ের সবচেয়ে নেপথ্য অথচ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারিগরদের একজন ছিলেন মুস্তাফিজুর রহমান।

তিনি শুধু অনুষ্ঠান বানাননি — তিনি তৈরি করেছিলেন একটি সংস্কৃতি, একটি মান, একটি বিশ্বাসযোগ্যতা। বিটিভির অসংখ্য জনপ্রিয় নাটক, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান আর বিশেষ আয়োজনের পেছনে লুকিয়ে ছিল তাঁর অক্লান্ত পরিকল্পনা আর নিখুঁত প্রযোজনা-দক্ষতা।

‘এইসব দিনরাত্রি’: যেখানে একটি প্রজন্মের হৃদয় থমকে গিয়েছিল

বাংলাদেশের টেলিভিশন নাটকের ইতিহাসে হুমায়ূন আহমেদের ‘এইসব দিনরাত্রি’ একটি অবিস্মরণীয় নাম — এমন একটি ধারাবাহিক, যার জন্য পুরো দেশ অপেক্ষায় থাকত একটি নির্দিষ্ট সন্ধ্যার। এই কালজয়ী ধারাবাহিকের প্রযোজক ছিলেন মুস্তাফিজুর রহমান নিজেই।

একইভাবে ‘শঙ্খনীল কারাগার’-এর মতো কালজয়ী নাটকও তাঁর হাতের ছোঁয়ায় দর্শকের হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন করে নেয়। তাঁর প্রযোজনার প্রতিটি কাজে ছিল একটি অভিন্ন স্বাক্ষর — গল্প নির্বাচনে রুচিশীলতা, নির্মাণে বাস্তবতার নিখুঁত ছোঁয়া, শিল্পীদের প্রতি সৃজনশীল স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের প্রতি মনোযোগ, আর সবচেয়ে বড় কথা — দর্শকের আবেগকে সবসময় সম্মান করার এক অটুট প্রতিশ্রুতি।

এই কারণেই তাঁর হাতে গড়া কাজগুলো সময়ের স্রোত পেরিয়েও আজও সমান প্রাসঙ্গিক, সমান আবেগময়।

যখন প্রযোজক হয়ে উঠলেন প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার

সৃজনশীল প্রযোজক হিসেবে তাঁর অবিরাম সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি দায়িত্ব পান বাংলাদেশ টেলিভিশনের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদ — মহাপরিচালক (ডিজি)-এর। কিন্তু প্রশাসক হয়েও তিনি কখনো শিল্পের কাছ থেকে দূরে সরে যাননি। বরং বিটিভিকে একটি আধুনিক, পেশাদার সম্প্রচার প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের লক্ষ্যে নিরলস কাজ করে গেছেন।

তাঁর সহকর্মীদের ভাষায়, তিনি ছিলেন এক বিরল প্রজাতির মানুষ — একজন “সৃজনশীল প্রশাসক”, যিনি নিয়মের কঠোরতা আর শিল্পের কোমলতার মধ্যে নিখুঁত ভারসাম্য রক্ষা করতে জানতেন।

সরকারি দায়িত্বের পরও থেমে থাকেননি যাত্রা

সরকারি দায়িত্ব থেকে অবসর নেওয়ার পরও তাঁর সৃজনশীল যাত্রা থামেনি। তিনি দায়িত্ব নেন দেশের অন্যতম বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেল বাংলাভিশন-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে। তাঁর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি সংবাদ, নাটক, টকশো ও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানে গড়ে তোলে নিজস্ব এক স্বতন্ত্র পরিচয়।

যিনি শুধু নির্মাতা নন, ছিলেন এক জাতির শিক্ষক

মুস্তাফিজুর রহমান শুধু একজন সফল প্রযোজক ছিলেন না। তিনি ছিলেন অসংখ্য প্রযোজক, উপস্থাপক, নাট্যকার, পরিচালক, ক্যামেরাপারসন ও টেলিভিশনকর্মীর নীরব শিক্ষক, পরামর্শদাতা ও অভিভাবক।

বিটিভির অগণিত কর্মকর্তা-কর্মচারী তাঁর কাছ থেকেই শিখেছেন কীভাবে একটি অনুষ্ঠান পরিকল্পনা করতে হয়, কীভাবে দর্শকের মন বোঝা যায়, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ — কীভাবে টেলিভিশনকে নিছক একটি চাকরি নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক দায়িত্ব হিসেবে দেখতে হয়। তাঁর ছাত্র-শিষ্যদের অনেকেই আজ নিজেরাই প্রতিষ্ঠিত নাম।

একটি সোনালি প্রজন্মের প্রতিনিধি

বাংলাদেশ টেলিভিশনের ইতিহাসে যে প্রজন্ম প্রতিষ্ঠানটিকে নিয়ে গিয়েছিল অভূতপূর্ব উচ্চতায়, মুস্তাফিজুর রহমান ছিলেন সেই উজ্জ্বল প্রজন্মের অন্যতম উজ্জ্বল সদস্য। তাঁর সমসাময়িক ছিলেন কিংবদন্তি সম্প্রচার ব্যক্তিত্ব মোস্তফা কামাল সৈয়দসৈয়দ আলী হায়দার রিজভীর মতো নাম — যাঁরা মিলে বাংলাদেশে টেলিভিশন নাটক, সংগীত, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক সম্প্রচারের ভিত্তি আরও মজবুত করেছিলেন।

আজ এই প্রজন্মের প্রায় সকলেই ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছেন — কিন্তু তাঁদের রেখে যাওয়া কাজ আজও কথা বলে।

যিনি স্মৃতিতে চিরকাল বেঁচে থাকবেন

একজন নির্মাতা মারা যান, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি কখনো মরে না। আজও যখন কোনো দর্শক ‘এইসব দিনরাত্রি’ কিংবা বিটিভির সেই স্বর্ণযুগের নাটকগুলোর কথা স্মরণ করেন, তখন অজান্তেই তিনি স্মরণ করেন সেই মানুষটিকেও, যিনি পর্দার আড়াল থেকে নীরবে পরিচালনা করেছিলেন গোটা এক নির্মাণযজ্ঞ।

তাঁর জীবন প্রমাণ করে যায় একটি চিরন্তন সত্য — জনপ্রিয়তা শুধু ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো মানুষের একচেটিয়া অধিকার নয়। ইতিহাস প্রায়ই গড়ে ওঠে ক্যামেরার পেছনে থাকা সেইসব নীরব, নিবেদিতপ্রাণ মানুষের হাতে, যাঁদের নাম হয়তো কখনো টাইটেল কার্ডের বাইরে বেশি আলোচিত হয় না।

শেষ বিদায়

মুস্তাফিজুর রহমানের মৃত্যুতে দেশের নাট্যাঙ্গন, টেলিভিশন শিল্প, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং অসংখ্য শিল্পী-কলাকুশলী গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। সহকর্মী, শিল্পী ও শুভানুধ্যায়ীরা তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছেন। আগামী ৩০ জুলাই তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার পর দাফন সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।

একটি যুগের নীরব সমাপ্তি

বাংলাদেশ টেলিভিশনের ইতিহাস যখনই লেখা হবে, কিছু নাম কখনো এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। মুস্তাফিজুর রহমান সেই চিরস্মরণীয় নামগুলোর একটি।

তিনি শুধু একজন সাবেক মহাপরিচালক ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন রুচিশীল প্রযোজক, দূরদর্শী সংগঠক, দক্ষ প্রশাসক এবং টেলিভিশন শিল্পের এক নিরলস, নীরব কারিগর।

তাঁর চলে যাওয়া মানে বাংলাদেশের সম্প্রচার ইতিহাসের একটি আলোকিত অধ্যায়ের সমাপ্তি। কিন্তু তাঁর নির্মাণ-দর্শন, কর্মনিষ্ঠা আর সৃজনশীল উত্তরাধিকার আগামী বহু প্রজন্মের নির্মাতাদের পথ দেখিয়ে যাবে বহু বহু বছর।

বিদায়, মুস্তাফিজুর রহমান। আপনার তৈরি করা প্রতিটি গল্প বেঁচে থাকবে আমাদের স্মৃতিতে, প্রজন্মান্তরে।

তথ্যসূত্র: দৈনিক যুগান্তর, জাগো নিউজ২৪, বাংলাদেশ টেলিভিশনের সাবেক কর্মকর্তা ও সহকর্মীদের স্মৃতিচারণ

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments