বালোগান বিতর্ক, রেফারিং, ৬৪ দলের বিশ্বকাপ, হাফটাইম শো, টিকিটের মূল্য—একটির পর একটি ইস্যুতে মুখোমুখি বিশ্ব ফুটবলের দুই প্রভাবশালী সংস্থা
TODAY SPORTS | ২১ জুলাই ২০২৬
বিশ্বকাপ ফাইনাল সাধারণত বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মিলনমেলা। ফিফা, উয়েফা, বিভিন্ন মহাদেশীয় কনফেডারেশনের শীর্ষ কর্মকর্তারা এক মঞ্চে উপস্থিত থাকেন। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে ঘটল ব্যতিক্রমী এক ঘটনা। ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফার সভাপতি আলেক্সান্দার সেফেরিন ইচ্ছাকৃতভাবেই ফাইনাল ম্যাচে উপস্থিত হননি। ফুটবল অঙ্গনের একাধিক সূত্র বলছে, এটি ছিল ফিফার সাম্প্রতিক বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তাঁর নীরব কিন্তু শক্তিশালী প্রতিবাদ। (Reuters)
ফাইনাল বয়কট: প্রতিবাদের সবচেয়ে বড় বার্তা
বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ উপলক্ষে মেক্সিকো সফর করলেও ফাইনালের জন্য নিউ জার্সিতে যাননি সেফেরিন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, তাঁর এই সিদ্ধান্ত কোনো ব্যক্তিগত কারণ নয়; বরং ফিফার একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ। (Reuters)
বিশ্লেষকদের মতে, ফিফা ও উয়েফার সম্পর্ক গত কয়েক বছরে এতটা উত্তপ্ত আগে কখনো দেখা যায়নি।
বালোগান বিতর্কেই শুরু বড় সংঘাত
দুই সংস্থার দ্বন্দ্বের সবচেয়ে বড় কারণ হয়ে ওঠে যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগানকে ঘিরে বিতর্ক।
বিশ্বকাপে লাল কার্ড দেখার পর স্বাভাবিক নিয়মে তাঁর এক ম্যাচ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরে ফিফা সেই নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা স্থগিত করে। এই সিদ্ধান্তের পর উয়েফা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে একে “অভূতপূর্ব, বোধগম্যতাহীন ও অযৌক্তিক” বলে মন্তব্য করে। ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থার অভিযোগ, এমন সিদ্ধান্ত প্রতিযোগিতার নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে। (Reuters)
ট্রাম্পের ফোন—বিতর্কে নতুন মাত্রা
বিতর্ক আরও গভীর হয় যখন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দাবি করা হয়, তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সঙ্গে যোগাযোগ করার পরই বালোগানের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করা হয়।
যদিও ফিফা আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, শৃঙ্খলা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত স্বাধীনভাবেই নেওয়া হয়েছে, তবু রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। (TalkSport)
হাফটাইম শো নিয়েও আপত্তি
শুধু শৃঙ্খলাজনিত সিদ্ধান্ত নয়, বিশ্বকাপের বিনোদনকেন্দ্রিক উপস্থাপনাও উয়েফার অসন্তোষের বড় কারণ।
ফাইনালে ম্যাডোনা, শাকিরা, বিটিএস ও জাস্টিন বিবারের পারফরম্যান্সের কারণে স্বাভাবিক ১৫ মিনিটের বিরতি বেড়ে প্রায় ২৭ মিনিটেরও বেশি হয়।
সেফেরিন বরাবরই বলে আসছেন, ফুটবলের মূল আকর্ষণ খেলা; অতিরিক্ত বিনোদন নয়। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ কিংবা ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে এ ধরনের দীর্ঘ হাফটাইম শোর কোনো পরিকল্পনা নেই। (Reuters)
৬৪ দলের বিশ্বকাপ নিয়েও মতবিরোধ
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ইতোমধ্যেই ২০৩০ বিশ্বকাপে ৬৪ দল রাখার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু করার কথা জানিয়েছেন।
কিন্তু এই পরিকল্পনার কড়া বিরোধিতা করছে উয়েফা। তাদের আশঙ্কা, অতিরিক্ত দল বাড়ালে বিশ্বকাপের মান কমে যেতে পারে, বাছাইপর্বের গুরুত্ব হ্রাস পাবে এবং আন্তর্জাতিক ফুটবলের ক্যালেন্ডার আরও জটিল হয়ে উঠবে। (Reuters)
রেফারি ওমর আরতান ইস্যুতেও ক্ষুব্ধ উয়েফা
সোমালিয়ার রেফারি ওমর আবদুলকাদির আরতান যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি না পাওয়ায় বিশ্বকাপে দায়িত্ব পালন করতে পারেননি।
এই ঘটনার পর উয়েফা তাঁকে সম্মান জানিয়ে আগামী সুপার কাপের ফাইনালে দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এটিও ফিফার প্রতি একটি প্রতীকী বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। (Reuters)
টিকিটের মূল্য নিয়েও সমালোচনা
২০২৬ বিশ্বকাপে টিকিটের উচ্চমূল্য নিয়েও প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছে উয়েফা।
তাদের দাবি, ২০২৮ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে দর্শকদের জন্য তুলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্যে টিকিট রাখা হবে। ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রে একটি স্টেডিয়ামে গাড়ি পার্কিংয়ের যে খরচ, সেই অর্থেই ইউরোর একাধিক ম্যাচের টিকিট কেনা সম্ভব হবে।
VAR ও নতুন নিয়মেও ভিন্ন অবস্থান
ভিএআর ব্যবহারের নীতিমালা নিয়েও দুই সংস্থার মধ্যে মতপার্থক্য স্পষ্ট।
বিশ্বকাপে কিছু নতুন প্রটোকল ও শাস্তিমূলক নিয়ম চালু করলেও উয়েফা জানিয়েছে, তাদের প্রতিযোগিতায় এসব নিয়ম অনুসরণ করা হবে না। বিশেষ করে “মিসটেকেন আইডেন্টিটি” প্রটোকল এবং মুখ ঢেকে কথা বললে সরাসরি লাল কার্ড দেখানোর নিয়ম তারা গ্রহণ করছে না। (Reuters)
বিশ্লেষণ | এটি কি শুধু মতবিরোধ, নাকি ক্ষমতার লড়াই?
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো স্পষ্ট করে দিচ্ছে, ফিফা ও উয়েফার বিরোধ এখন কেবল একটি সিদ্ধান্তকে ঘিরে নয়।
বিশ্বকাপের সম্প্রসারণ, বাণিজ্যিকীকরণ, রেফারিং নীতি, শৃঙ্খলা বিধি, টিকিটের মূল্য, রাজনৈতিক প্রভাব—সব মিলিয়ে বিশ্ব ফুটবলের ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে, সেই প্রশ্নেই দুই সংস্থা এখন ভিন্ন মেরুতে দাঁড়িয়ে।
আলেক্সান্দার সেফেরিনের বিশ্বকাপ ফাইনাল বয়কট ছিল সেই দ্বন্দ্বের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীক। ফুটবল মাঠের লড়াই শেষ হলেও প্রশাসনিক অঙ্গনে ফিফা ও উয়েফার এই টানাপোড়েন যে এখনো শেষ হয়নি, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেটিই স্পষ্ট করে দিচ্ছে।
তথ্যসূত্র: Reuters, The Times, BBC Sport, FIFA, UEFA। (Reuters)



