স্বঘোষিত ‘রিপাবলিক অব বেলুচিস্তান’ ঘোষণা ঘিরে নতুন বিতর্ক, তবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এখনো অধরা
স্টাফ রিপোর্টার | TODAY TV BD
ঢাকা: দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী জাতিগত ও ভূ-রাজনৈতিক সংকট আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনায় উঠে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রে প্রচারিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই মাসে মীর ইয়ার বালুচ নামের একজন বেলুচ স্বাধীনতাকামী নেতা “রিপাবলিক অব বেলুচিস্তান” নামে একটি স্বঘোষিত সরকারের ঘোষণা দিয়েছেন এবং জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে স্বীকৃতি চেয়েছেন।
একই সঙ্গে স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠীগুলোর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তারা বেলুচিস্তানের প্রায় ৮৫ শতাংশ অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করছে। তবে এই দাবির স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক যাচাই এখনো পাওয়া যায়নি। পাকিস্তান সরকারও এ ধরনের দাবিকে স্বীকৃতি দেয়নি।
এই ঘোষণাকে ঘিরে আবারও প্রশ্ন উঠেছে—বেলুচিস্তানের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস কী, কেন এই আন্দোলন এত দীর্ঘ, আর বর্তমান পরিস্থিতি কতটা বাস্তব পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে?
বেলুচিস্তান কোথায়?
বেলুচিস্তান পাকিস্তানের বৃহত্তম প্রদেশ। আয়তনের দিক থেকে এটি দেশের প্রায় ৪৪ শতাংশ এলাকা জুড়ে বিস্তৃত হলেও জনসংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম।
প্রদেশটির সীমান্ত রয়েছে—
- ইরান
- আফগানিস্তান
- আরব সাগর
এই ভৌগোলিক অবস্থান বেলুচিস্তানকে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অঞ্চলে পরিণত করেছে।
প্রাকৃতিক সম্পদের ভাণ্ডার
বিশ্লেষকদের মতে, বেলুচিস্তানে রয়েছে—
- বিশাল প্রাকৃতিক গ্যাস
- তামা
- স্বর্ণ
- কয়লা
- বিরল খনিজ
- গভীর সমুদ্রবন্দর গওয়াদর (Gwadar Port)
চীনের চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (CPEC)-এর অন্যতম কেন্দ্রও এই গওয়াদর বন্দর।
স্বাধীনতাকামীদের অভিযোগ, এসব সম্পদ থেকে স্থানীয় জনগণ ন্যায্য অংশ পাচ্ছে না; বরং সম্পদের অধিকাংশ সুবিধা পাচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকার ও বহিরাগত বিনিয়োগকারীরা।
স্বাধীনতার দাবি কোথা থেকে?
বেলুচ জাতীয়তাবাদের ইতিহাস ব্রিটিশ উপনিবেশিক যুগ পর্যন্ত বিস্তৃত।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত ভাগ হওয়ার পর কালাত নামে একটি বেলুচ রাষ্ট্র অল্প সময়ের জন্য স্বাধীনতার দাবি করে।
১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে অন্তর্ভুক্তির পর থেকেই একাধিকবার বিদ্রোহ শুরু হয়।
ইতিহাসবিদদের মতে, এরপর বিভিন্ন সময়ে অন্তত পাঁচটি বড় বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছে—
- ১৯৪৮
- ১৯৫৮–৫৯
- ১৯৬২–৬৩
- ১৯৭৩–৭৭
- ২০০৪ সাল থেকে চলমান সশস্ত্র আন্দোলন
কেন ক্ষোভ?
স্বাধীনতাকামী সংগঠনগুলোর প্রধান অভিযোগ—
- প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর স্থানীয় জনগণের নিয়ন্ত্রণ নেই
- রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ
- জোরপূর্বক গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ
- সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি
- উন্নয়নের সুবিধা স্থানীয়দের কাছে না পৌঁছানো
পাকিস্তান সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, বেলুচিস্তানে উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।
কারা লড়ছে?
বিভিন্ন স্বাধীনতাকামী সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
- Baloch Liberation Army (BLA)
- Baloch Liberation Front (BLF)
- Baloch Republican Guards (BRG)
পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি দেশ BLA-কে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।
এসব সংগঠন পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনী, অবকাঠামো এবং বিদেশি বিনিয়োগ সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে হামলার দায় স্বীকার করেছে।
নতুন কী ঘটেছে?
সাম্প্রতিক ঘোষণায় মীর ইয়ার বালুচ নিজেকে “রিপাবলিক অব বেলুচিস্তান”-এর প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন।
ঘোষণায় বলা হয়েছে—
- একটি অস্থায়ী সরকার গঠন করা হয়েছে।
- জাতিসংঘের কাছে স্বীকৃতি চাওয়া হয়েছে।
- আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা আহ্বান করা হয়েছে।
এছাড়া স্বাধীনতাকামীদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তারা বেলুচিস্তানের ৮৫ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে।
তবে এই দাবির পক্ষে স্বাধীন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের কোনো যাচাই এখনো প্রকাশিত হয়নি। পাকিস্তানও এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।
আন্তর্জাতিক অবস্থান কী?
এ পর্যন্ত—
- জাতিসংঘ
- যুক্তরাষ্ট্র
- ইউরোপীয় ইউনিয়ন
- চীন
- রাশিয়া
- ওআইসি
—কোনো পক্ষই স্বাধীন “রিপাবলিক অব বেলুচিস্তান”কে স্বীকৃতি দেয়নি।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখনো বেলুচিস্তানকে পাকিস্তানের অংশ হিসেবেই স্বীকৃতি দেয়।
চীনের উদ্বেগ
বেলুচিস্তানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক দিক হলো গওয়াদর বন্দর।
এটি চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI)-এর অন্যতম প্রধান প্রকল্প।
ফলে বেলুচিস্তানের অস্থিতিশীলতা শুধু পাকিস্তান নয়, চীনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থকেও প্রভাবিত করতে পারে।
মানবাধিকার বিতর্ক
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বহু বছর ধরে অভিযোগ করে আসছে—
- গুম
- বিচারবহির্ভূত হত্যা
- মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা
- সাংবাদিক ও কর্মীদের নিখোঁজ হওয়া
অন্যদিকে পাকিস্তান দাবি করে, নিরাপত্তা অভিযান সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদ দমনের জন্য পরিচালিত হচ্ছে এবং সাধারণ জনগণকে লক্ষ্য করে নয়।
ভবিষ্যৎ কোন দিকে?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বাধীন বেলুচিস্তান প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা এখনো সীমিত।
কারণ—
- আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির অভাব
- পাকিস্তানের শক্তিশালী সামরিক উপস্থিতি
- আঞ্চলিক শক্তিগুলোর কৌশলগত স্বার্থ
- চীনের বিনিয়োগ ও নিরাপত্তা বিবেচনা
তবে একই সঙ্গে বিশ্লেষকদের মতে, বেলুচ জনগণের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও মানবাধিকারসংক্রান্ত অভিযোগের টেকসই সমাধান না হলে অঞ্চলটি ভবিষ্যতেও অস্থিরতার কেন্দ্র হয়ে থাকতে পারে।
বিশ্লেষণ
বেলুচিস্তান প্রশ্নটি কেবল একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের বিষয় নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা, জ্বালানি করিডর, চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ, পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
স্বঘোষিত সরকারের সাম্প্রতিক ঘোষণা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিলেও, স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে হলে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, কার্যকর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং বিস্তৃত কূটনৈতিক সমর্থনের মতো গুরুত্বপূর্ণ শর্ত পূরণ করতে হবে। বর্তমানে এসব শর্তের কোনোটিই নিশ্চিতভাবে পূরণ হয়েছে বলে নিরপেক্ষভাবে বলা যায় না।



