অতিরিক্ত সময়ের একমাত্র গোলেই শেষ হলো বিশ্বকাপের মহারণ্য; টানা ৩৮ ম্যাচ অপরাজিত থেকে ইতিহাসের পাতায় আরও উজ্জ্বল লুইস দে লা ফুয়েন্তের স্পেন
ইস্ট রাদারফোর্ড | TODAY SPORTS | ২০ জুলাই ২০২৬
শুরুতে দখল, শেষে শিরোপা—স্পেনের রাত ছিল সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের
ফাইনালের প্রথম মিনিট থেকেই বোঝা গিয়েছিল, এটি কোনো সাধারণ ম্যাচ নয়। বর্তমান ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন স্পেন শুরু থেকেই বল দখল, পাসিং আর চাপ তৈরিতে এগিয়ে ছিল। তারা আর্জেন্টিনার রক্ষণকে বারবার ভেঙে ঢুকতে চেষ্টা করেছে, আর প্রথম ২০টি শট ও প্রথম ১০টি কর্নারের মধ্যে ৯টিই আদায় করেছে। শেষ পর্যন্ত সেই প্রভাবই ফলাফলে নেমে আসে—অতিরিক্ত সময়ের ১০৬তম মিনিটে ফেরান তোরেসের একমাত্র গোলে ১-০ ব্যবধানে বিশ্বকাপ জেতে ‘লা রোহা’।
ফেরান তোরেসের এক স্পর্শ, এক দেশের ইতিহাস
এই ফাইনালে স্পেনের জয়সূচক মুহূর্তটি আসে নিকো উইলিয়ামসের হেড-ব্যাক থেকে। লামিনে ইয়ামালের সাজানো আক্রমণে পেদ্রো পোরোর ক্রসের পর নিকো উইলিয়ামস বল ফিরিয়ে দেন বক্সের মধ্যে, আর সেখানেই ফেরান তোরেসের বাম পায়ের জোরালো শটে জাল কাঁপে। ১০৬তম মিনিটের ওই গোলই স্পেনকে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা এনে দেয়।
আর্জেন্টিনার প্রতিরোধ, মার্তিনেজের নায়কোচিত সেভ
স্পেন যতটা আক্রমণ করেছে, আর্জেন্টিনা ততটাই প্রতিরোধ গড়েছে। গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ বিশেষ করে ফাইনালে রেকর্ড সংখ্যক সেভ করেন—এই সংখ্যা ১২ এর বেশি, যা পুরুষদের বিশ্বকাপ ফাইনালে রেকর্ড। তবে ১০ জনে নেমে যাওয়া আর্জেন্টিনার পক্ষে অতিরিক্ত সময়ের চাপ সামলানো শেষ পর্যন্ত সম্ভব হয়নি। এনজো ফার্নান্দেজ দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়ার পর তাদের কাজ আরও কঠিন হয়ে যায়।
দে লা ফুয়েন্তের দল: শৃঙ্খলা, নিয়ন্ত্রণ আর অচল রক্ষাকবচ
লুইস দে লা ফুয়েন্তের স্পেন শুধু বল দখলেই শ্রেষ্ঠ ছিল না; তারা ছিল বিরতিহীন, সংগঠিত এবং ধৈর্যশীল। সমগ্র টুর্নামেন্টে তারা মাত্র একটি গোল হজম করেছে—এটি বিশ্বকাপ ইতিহাসে চ্যাম্পিয়নের জন্য নতুন মানদণ্ড। এ ছাড়া তাদের অপরাজিত ধারা গিয়ে ঠেকেছে ৩৮ ম্যাচে, যা স্প্যানিশ পুরুষ ফুটবলের সবচেয়ে দীর্ঘ unbeaten run।
একসঙ্গে নারী-পুরুষ বিশ্বকাপজয়ী একমাত্র দেশ এখন স্পেন
এই ট্রফি স্পেনকে ঐতিহাসিক এক অবস্থানে নিয়ে গেছে। স্পেন এখন একমাত্র দেশ, যারা একই সময়ে পুরুষ ও নারী—দুই দলের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। নারীদের ২০২৩ বিশ্বকাপ জয়ের পর পুরুষদের ২০২৬ শিরোপা দেশটিকে এক বিরল ক্লাবে বসিয়েছে।

দ্বিতীয় বিশ্বকাপ, প্রথম ২০১০-এর পর আবার শীর্ষে
২০১০ সালে নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে প্রথমবার বিশ্বকাপ জিতেছিল স্পেন। ২০২৬ সালে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে তারা দ্বিতীয়বার শিরোপা তুলল। দুই ফাইনালেই ফল এক—১-০, অতিরিক্ত সময়ে, আর প্রতিবারই স্পেনের ধৈর্য ছিল নির্ধারক। এটি দেখায়, ইউরো চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর বিশ্বমঞ্চেও তারা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখতে কতটা প্রস্তুত ছিল।
ফাইনালে মেসি, লামিনে, ইয়ামাল—আলো একাধিক মুখে, কিন্তু শিরোপা এক রঙে
বিশ্বকাপ ফাইনালের মঞ্চে আর্জেন্টিনার হয়ে লিওনেল মেসি ছিলেন একা এক অধ্যায়; স্পেনের পক্ষে লামিনে ইয়ামাল, রদ্রি, নিকো উইলিয়ামস ও ফেরান তোরেস একসঙ্গে লিখেছেন এক নতুন অধ্যায়। এপির বর্ণনায় মেসি এই ম্যাচে খুব বেশি প্রভাব ফেলতে পারেননি, আর স্পেনের মাঝমাঠে রদ্রির নিয়ন্ত্রণ পুরো ছন্দ নির্ধারণ করে। দে লা ফুয়েন্তে দলের খেলায় তত্ত্ব, শৃঙ্খলা আর তরুণদের সাহস—এই তিনটি জিনিস একসঙ্গে কাজ করেছে।
টুর্নামেন্টের শেষ কথা: স্পেন শুধু জেতেনি, মানদণ্ডও বদলে দিয়েছে
এই বিশ্বকাপে স্পেনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল ধারাবাহিকতা। তারা টুর্নামেন্ট জুড়ে চাপের নিচে ভাঙেনি, ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে, আর ফাইনালে পৌঁছে শেষ আঘাতটা করেছে অতিরিক্ত সময়ে। তাদের শিরোপা তাই কেবল একটি জয়ের গল্প নয়; এটি একটি ফুটবল-দর্শনের জয়—যেখানে সৌন্দর্য, নিয়ন্ত্রণ ও কঠোর শৃঙ্খলা একসঙ্গে ট্রফিতে পরিণত হয়।
রেকর্ডবক্স
- চ্যাম্পিয়ন: স্পেন
- ফাইনাল ফল: স্পেন ১-০ আর্জেন্টিনা (অতিরিক্ত সময়)
- গোলদাতা: ফেরান তোরেস, ১০৬ মিনিট
- বিশ্বকাপ শিরোপা: ২য়
- অপরাজিত ধারা: ৩৮ ম্যাচ
- টুর্নামেন্টে খাওয়া গোল: ১
- নারী-পুরুষ উভয় বিশ্বচ্যাম্পিয়ন: স্পেন প্রথম দেশ
শেষ কথা
বিশ্ব ফুটবল আবারও পেল নতুন এক চ্যাম্পিয়ন নয়—পেল এক পুরোনো শক্তির নতুন ব্যাখ্যা। ইউরো সেরার পর বিশ্বমঞ্চেও স্পেন প্রমাণ করল, তাদের ফুটবল কেবল নান্দনিক নয়; এটি কার্যকর, শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং শিরোপা জেতার জন্য নির্মিত। আর তাই ‘লা রোহা’ এখন শুধু ইউরোপের সেরা নয়—বিশ্বের সেরাও।



