Homeটুডে স্পোর্টস৬৪ দলের বিশ্বকাপ কি এবার সত্যিই ‘বিশ্বের’ হবে? নাকি হারাবে নিজের আত্মা?

৬৪ দলের বিশ্বকাপ কি এবার সত্যিই ‘বিশ্বের’ হবে? নাকি হারাবে নিজের আত্মা?

৪৮ দলের পর এবার ৬৪ দলের পরিকল্পনা; শতবর্ষী বিশ্বকাপকে ঘিরে ফিফার নতুন ভাবনা, কিন্তু বিতর্কও তুঙ্গে

কাভার স্টোরি | স্পোর্টস ডেস্ক

ফুটবল বিশ্বকাপ শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়; এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ক্রীড়া উৎসব। চার বছর পরপর কয়েক সপ্তাহের জন্য থমকে যায় পৃথিবী, এক ছাদের নিচে এসে দাঁড়ায় ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন মহাদেশ। কিন্তু সেই বিশ্বকাপই কি এখন এক নতুন মোড়ে দাঁড়িয়ে?

১৯৩০ সালে মাত্র ১৩ দল নিয়ে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, এক শতাব্দী পূর্তির দ্বারপ্রান্তে এসে সেটিকে ৬৪ দলের মহাযজ্ঞে রূপ দিতে চায় বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। ২০২৬ সালে প্রথমবারের মতো ৪৮ দলের বিশ্বকাপ আয়োজনের পরই ২০৩০ সালের শতবর্ষী আসরকে আরও বড় করার পরিকল্পনার কথা প্রকাশ্যে এনেছেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো

তাঁর বক্তব্য পরিষ্কার—বিশ্বকাপ কেবল ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার সম্পত্তি নয়; এটি পুরো বিশ্বের। তাই আরও বেশি দেশকে সুযোগ দিতে হবে, আরও বেশি মানুষের স্বপ্নকে বিশ্বমঞ্চে তুলে আনতে হবে।

কিন্তু প্রশ্নও কম নয়। বিশ্বকাপ কি সত্যিই আরও বৈশ্বিক হবে, নাকি অতিরিক্ত বিস্তারের চাপে হারাবে নিজের প্রতিযোগিতামূলক মর্যাদা?


৪৮ থেকে ৬৪—কেন আবার পরিবর্তন?

মাত্র কয়েক বছর আগেও ৩২ দলের বিশ্বকাপকেই আদর্শ ধরা হতো। ১৯৯৮ থেকে ২০২২—টানা সাতটি বিশ্বকাপ সেই কাঠামোতেই হয়েছে।

এরপর ২০২৬ সালে প্রথমবারের মতো অংশ নিচ্ছে ৪৮টি দেশ।

অনেকের ধারণা ছিল, এত দল বাড়ালে বিশ্বকাপের মান কমে যাবে। কিন্তু ফিফার দাবি, বাস্তবতা ভিন্ন।

ইনফান্তিনোর মতে, ছোট দেশগুলো এবার প্রমাণ করেছে যে ফুটবলের মান আর কেবল কয়েকটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আফ্রিকা, এশিয়া, উত্তর আমেরিকা কিংবা ওশেনিয়ার দলগুলো এখন বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে সমানতালে লড়তে পারছে। তাঁর যুক্তি, এই পরিবর্তনই প্রমাণ করে যে বিশ্বকাপ আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হওয়া উচিত।


ছোট দেশগুলোর জন্য নতুন দরজা

বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া অনেক দেশের জন্য শুধু একটি টুর্নামেন্টে খেলা নয়, এটি পুরো দেশের ফুটবল ব্যবস্থাকে বদলে দেয়।

বিশ্বকাপে ওঠা মানেই—

  • নতুন স্টেডিয়াম নির্মাণ
  • সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি
  • তরুণদের ফুটবলে আগ্রহ
  • স্পন্সর ও সম্প্রচার আয়ের বৃদ্ধি
  • আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

ইনফান্তিনোর বক্তব্য, যে দেশ কখনো বিশ্বকাপে ওঠার স্বপ্নই দেখে না, তারা নিজেদের ফুটবল উন্নয়নের জন্যও একই রকম বিনিয়োগ করবে না।

অর্থাৎ তাঁর দৃষ্টিতে ৬৪ দলের বিশ্বকাপ কেবল একটি টুর্নামেন্ট নয়; এটি বিশ্ব ফুটবলের উন্নয়নের কৌশল।


কেপ ভার্দে থেকে শুরু করে নতুন বিস্ময়

এবারের বিশ্বকাপে তুলনামূলক ছোট কয়েকটি দেশ যেভাবে নিজেদের সামর্থ্য দেখিয়েছে, সেটিকেই সামনে আনছেন ইনফান্তিনো।

কেপ ভার্দের মতো দল প্রমাণ করেছে, আন্তর্জাতিক ফুটবলের ব্যবধান আগের মতো নেই।

এশিয়া ও আফ্রিকার কয়েকটি দলও শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ফুটবল খেলেছে।

ফিফার মতে, এটিই ৬৪ দলের পক্ষে সবচেয়ে বড় যুক্তি।


কিন্তু সমালোচকদের প্রশ্ন আরও বড়

সবাই অবশ্য এই পরিকল্পনায় উচ্ছ্বসিত নন।

ইউরোপীয় ফুটবল মহলে ইতোমধ্যেই তীব্র আপত্তি উঠেছে।

উয়েফা সভাপতি আলেকজান্ডার সেফেরিন প্রকাশ্যেই এই ধারণাকে “খারাপ পরিকল্পনা” বলে উল্লেখ করেছেন।

সমালোচকদের কয়েকটি বড় উদ্বেগ হলো—

  • বিশ্বকাপের মান কমে যেতে পারে।
  • দুর্বল দল বেড়ে গেলে অনেক ম্যাচ প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন হতে পারে।
  • বাছাইপর্বের গুরুত্ব কমে যাবে।
  • খেলোয়াড়দের ওপর শারীরিক চাপ বাড়বে।
  • ক্লাব ফুটবলের সূচি আরও সংকুচিত হবে।

বিশ্বের শীর্ষ ক্লাবগুলো আগেই অভিযোগ করে আসছে যে আন্তর্জাতিক সূচি অত্যধিক ব্যস্ত হয়ে উঠছে। ৬৪ দলের বিশ্বকাপ সেই চাপকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।


২০৩০—ইতিহাসের সবচেয়ে জটিল বিশ্বকাপ?

২০৩০ সালের বিশ্বকাপ এমনিতেই ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী আয়োজন হতে যাচ্ছে।

ছয়টি দেশে অনুষ্ঠিত হবে এই টুর্নামেন্ট—

  • উরুগুয়ে
  • আর্জেন্টিনা
  • প্যারাগুয়ে
  • মরক্কো
  • পর্তুগাল
  • স্পেন

অর্থাৎ তিনটি মহাদেশে ছড়িয়ে থাকবে বিশ্বকাপ।

এই বিশাল ভৌগোলিক বিস্তৃতির মধ্যেই যদি ৬৪টি দল যুক্ত হয়, তাহলে—

  • ম্যাচ সংখ্যা বাড়বে।
  • ভ্রমণ আরও দীর্ঘ হবে।
  • লজিস্টিক ব্যয় বাড়বে।
  • সম্প্রচার সূচি আরও জটিল হবে।
  • খেলোয়াড়দের পুনরুদ্ধারের সময় কমে যেতে পারে।

ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু একটি ক্রীড়া ইভেন্ট নয়; এটি হবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া ব্যবস্থাপনা পরীক্ষা।


কী হতে পারে নতুন ফরম্যাট?

যদিও ফিফা এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক কাঠামো প্রকাশ করেনি, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে সম্ভাব্য একটি মডেলের কথা উঠে এসেছে।

সে অনুযায়ী—

  • ১৬টি গ্রুপ
  • প্রতিটি গ্রুপে ৪টি দল
  • সেরা দুই দল রাউন্ড অব ৩২-এ

এই ফরম্যাটে মোট ম্যাচ হতে পারে প্রায় ১২৮টি

তবে ফিফা এখনো এই কাঠামো অনুমোদন করেনি।


বিশ্বকাপ—খেলা, নাকি বৈশ্বিক ব্যবসা?

৬৪ দলের পরিকল্পনা সামনে আসতেই আরেকটি বিতর্ক নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

বিশ্বকাপ কি সত্যিই ফুটবলের উন্নয়নের জন্য বড় হচ্ছে?

নাকি আরও বেশি ম্যাচ মানেই—

  • আরও বেশি সম্প্রচার স্বত্ব
  • আরও বেশি বিজ্ঞাপন
  • আরও বেশি স্পন্সর
  • আরও বেশি টিকিট বিক্রি
  • আরও বেশি আয়

সমালোচকদের একাংশ মনে করেন, বিশ্বকাপ ধীরে ধীরে ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পাশাপাশি একটি বিশাল বৈশ্বিক বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হচ্ছে।

অন্যদিকে ফিফার যুক্তি, এই অতিরিক্ত আয়ই বিশ্বের ছোট দেশগুলোর ফুটবল উন্নয়নে বিনিয়োগ করা হয়।


বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ কী?

৬৪ দলের বিশ্বকাপ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের মতো দেশের জন্যও সম্ভাবনার জানালা আরও বড় হতে পারে।

এশিয়ার কোটার সংখ্যা বাড়লে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল ফুটবল দেশগুলোর জন্য বিশ্বকাপ বাছাইয়ে প্রতিযোগিতা সহজ হতে পারে।

যদিও বাস্তবতা হলো, শুধু কোটার সংখ্যা বাড়লেই হবে না; দেশের ফুটবল অবকাঠামো, বয়সভিত্তিক উন্নয়ন, কোচিং, পেশাদার লিগ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় বড় পরিবর্তন আনতে হবে।


চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ৬৪ দলের বিশ্বকাপ এখনো অনুমোদিত হয়নি।

ইনফান্তিনো নিশ্চিত করেছেন, ২০২৬ বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর বিষয়টি ফিফার সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলোতে আলোচনা হবে।

অর্থাৎ এটি এখনো একটি প্রস্তাব, কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়।


TODAY TV BD বিশ্লেষণ

বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রতিটি সম্প্রসারণ প্রথমে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।

১৬ থেকে ২৪…

২৪ থেকে ৩২…

৩২ থেকে ৪৮…

এবার ৪৮ থেকে ৬৪।

প্রতিবারই বলা হয়েছিল বিশ্বকাপের মান নষ্ট হবে। আবার প্রতিবারই নতুন নতুন দেশের উত্থান বিশ্ব ফুটবলকে নতুন গল্প উপহার দিয়েছে।

তবে ৬৪ দলের পরিকল্পনা আগের যেকোনো সম্প্রসারণের চেয়ে অনেক বড়।

এটি শুধু দলের সংখ্যা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নয়; এটি বিশ্বকাপের দর্শন বদলে দেওয়ার প্রশ্ন।

আগামী কয়েক মাসে ফিফা যে সিদ্ধান্তই নিক, একটি বিষয় নিশ্চিত—২০৩০ সালের শতবর্ষী বিশ্বকাপ শুধু একটি টুর্নামেন্ট হবে না; এটি নির্ধারণ করবে আগামী কয়েক দশকে বিশ্ব ফুটবল কোন পথে এগোবে।

তথ্যসূত্র: Reuters, FIFA, Bluewin, আন্তর্জাতিক ফুটবল বিশ্লেষণ।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments