Homeটুডে নেশনবৃষ্টি নামলেই কেন ঢাকা-চট্টগ্রাম ডোবে: কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের পরও জলাবদ্ধতা কেন...

বৃষ্টি নামলেই কেন ঢাকা-চট্টগ্রাম ডোবে: কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের পরও জলাবদ্ধতা কেন কাটছে না?

রাজধানীতে ৮২ মিলিমিটার বৃষ্টিতে রাস্তাঘাট নদীতে রূপ নিয়েছে, চট্টগ্রামেও থেমে নেই জলাবদ্ধতা; খাল, ওয়েটল্যান্ড, পাম্পিং স্টেশন আর সমন্বয়হীনতার দুর্বল জালেই আটকে আছে নগর-নিষ্কাশন

ঢাকা | ১৩ জুলাই ২০২৬

ভোরের বৃষ্টি শুরু হতেই ঢাকার বহু সড়ক থেমে গেছে, মিরপুর, শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, কাওরান বাজার, পান্থপথ, ফার্মগেট, মতিঝিল, নিউ মার্কেট ও ধানমন্ডির মতো এলাকাগুলোতে পানিতে চলাচল কার্যত অচল হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে এক সকালে ৮২ মিলিমিটার বৃষ্টি নেমেছে, আর ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ৯৭ মিলিমিটারে পৌঁছেছে; একই সময়ে চট্টগ্রামেও ৯৮ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর আরও জানিয়েছে, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে অন্তত ছয় বিভাগে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা ছিল।

ঢাকার জলাবদ্ধতা নতুন কিছু নয়। তবে এ বারের দৃশ্যপটও দেখিয়ে দিল—বছরের পর বছর, এমনকি বিপুল ব্যয় সত্ত্বেও শহরের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এখনো দুর্বল। দ্য ডেইলি স্টারের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১৬ বছরে খাল উদ্ধার, ড্রেন সংস্কার, বক্স কালভার্ট, পাম্পিং স্টেশন ও স্লুইস গেটের পেছনে সরকার শত শত কোটি টাকা ব্যয় করেছে; শুধু সিটি করপোরেশনই ২০২৪ সাল পর্যন্ত চার বছরে ২৬২ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে ৩৩৪.১৯ কিলোমিটার নিষ্কাশন অবকাঠামো গড়েছে। তারপরও রাজধানীর বহু এলাকায় জলাবদ্ধতা নিয়মিত ফিরে আসে।

শহর ডোবার মূল কারণ: প্রকৃতি নয়, নগর পরিকল্পনার ব্যর্থতা

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার সমস্যা শুধু বৃষ্টির পরিমাণে নয়; সমস্যা হচ্ছে বৃষ্টির পানি ধরার ও সরানোর প্রাকৃতিক সক্ষমতাকে শহর নিজেই নষ্ট করে ফেলেছে। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে নগর–পরিকল্পনাবিদরা বলেছেন, অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ, খাল ও জলাভূমি সংকোচন, পর্যাপ্ত নিষ্কাশন ক্ষমতার অভাব এবং রক্ষণাবেক্ষণের দুর্বলতাই জলাবদ্ধতার মূল চালক। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দ্রুত নগরায়ণ বহু জমি কংক্রিটে ঢেকে ফেলায় মাটিতে পানি ঢোকার সুযোগ কমে গেছে, ফলে উপরিভাগে পানির চাপ বেড়েছে।

এখানেই ঢাকার সবচেয়ে বড় কাঠামোগত দুর্বলতা: শহরটি এমনভাবে বিস্তৃত হয়েছে, যেন বৃষ্টির পানি নামার আগেই তার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। খাল, জলাভূমি ও রিটেনশন এরিয়ার জায়গা দখল ও ভরাট হয়ে যাওয়ায় প্রাকৃতিক নিষ্কাশনব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। দ্য ডেইলি স্টারের উদ্ধৃত বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, অনেক ড্রেন কঠিন বর্জ্যে আটকে গিয়ে তাদের নকশাগত সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম কাজ করছে, আর দিনে শহরে উৎপন্ন প্রায় ৭ হাজার টন বর্জ্যের ১৫ শতাংশই প্লাস্টিক—যার বড় অংশ শেষ পর্যন্ত ড্রেন ও খালে পৌঁছে নিষ্কাশন পথ আটকে দেয়।

টাকা খরচ হয়েছে, কিন্তু সমাধান কেন আসেনি?

ঢাকা জলাবদ্ধতা প্রশ্নে সবচেয়ে বিব্রতকর উত্তর হলো—খরচ হয়েছে, কিন্তু খরচের ধরন ছিল খণ্ডিত। দায়িত্বও কয়েক দফা বদলানো হয়েছে। দ্য ডেইলি স্টার জানায়, ঢাকার নিষ্কাশনব্যবস্থার দায়িত্ব ওয়াসা থেকে দুই সিটি করপোরেশনের হাতে দেওয়া হয় সমন্বয় উন্নত করার জন্য, কিন্তু বাস্তবে একেক সংস্থা একেক জায়গায় কাজ করায় পূর্ণাঙ্গ শহর-ব্যাপী নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠেনি। ফলাফল, অবকাঠামো হয়েছে ঠিকই, কিন্তু শহরের জলধারণ ও জলনিষ্কাশনের সামগ্রিক সক্ষমতা যথেষ্ট বাড়েনি।

এখানে পাম্পিং ব্যবস্থার দুর্বলতাও স্পষ্ট। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ ঢাকায় অন্তত ১০টি পাম্পিং স্টেশন দরকার হলেও চালু আছে মাত্র ৩টি; হাটিরঝিলের একটি গুরুত্বপূর্ণ পাম্পিং স্টেশনও অকার্যকর। উত্তর সিটি করপোরেশন আবার ড্রেনেজের জন্য আলাদা পাম্প না রেখে ছয়টি উচ্চচাপ জেটিং গাড়ির ওপর নির্ভর করছে, যা বন্ধ পাইপের ভেতর জমে থাকা ময়লা ও প্লাস্টিক সরালেও বড় বৃষ্টির চাপ সামলানোর জন্য যথেষ্ট নয়।

ঢাকায় জলাবদ্ধতা কেন বারবার একই জায়গায়?

এপ্রিলেই দুই সিটি করপোরেশন ১৪১টি জলাবদ্ধতার হটস্পট চিহ্নিত করেছিল—এর মধ্যে ১০৮টি উত্তর সিটিতে, ৩৩টি দক্ষিণ সিটিতে। সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, কালশি, বাড্ডা, নিউ মার্কেট, ধানমন্ডি-২৭, আজিমপুর, নাজিরাবাজার ও বক্সীবাজার আবারও পানিতে ডুবে যায়। এ তালিকাই বলে দেয়, ঢাকা জলাবদ্ধতা বিচ্ছিন্ন কোনো দুর্ঘটনা নয়; এটি একই ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক জায়গায় বারবার ফিরে আসা একটি কাঠামোগত ব্যর্থতা।

অর্থাৎ ঢাকার অনেক এলাকায় পানি জমে, কারণ সেগুলোতে পানি যাওয়ার মতো পথই দুর্বল। কোথাও ড্রেন ভরাট, কোথাও খাল সংকুচিত, কোথাও পাম্প অকেজো, কোথাও আবার রাস্তাই এমনভাবে তৈরি যে পানি সরে যাওয়ার বদলে আটকে থাকে। নগর–পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যে, ঢাকার জন্য একটি সমন্বিত ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান নেই, আর জলপথ, খাল ও কৃত্রিম ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক আলাদা আলাদা প্রকল্পে এগোনো হচ্ছে—একীভূত ব্যবস্থাপনা ছাড়া।

চট্টগ্রামেও একই গল্প, তবে পাহাড়ি পানির চাপ আরও জটিল

চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতার সংকট ঢাকার চেয়েও ভিন্ন। এখানে নগর ড্রেনেজের দুর্বলতার সঙ্গে যুক্ত হয় পাহাড়ি ঢল, ক্ষয়িষ্ণু খাল, বিলম্বিত মেগা প্রকল্প এবং নগরের ভূপ্রকৃতি। দ্য ডেইলি স্টার জানায়, নগর পরিকল্পনাবিদেরা আগেই সতর্ক করেছিলেন যে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার চারটি বড় বন্যা-নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প এখনো অসম্পূর্ণ থাকায় এই বর্ষায় চট্টগ্রামে গুরুতর জলাবদ্ধতা দেখা দিতে পারে।

বাস্তবেও তাই হয়েছে। সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ, হালিশহর, বাকলিয়া, চান্দগাঁও, চকবাজার, কাটালগঞ্জ ও পতেঙ্গাসহ বহু এলাকায় পানি ঢুকে পড়ে, ঘরবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে জল ওঠে। আবার একই সময়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো পরীক্ষা ও ক্লাস স্থগিত করতে বাধ্য হয়। দ্য ডেইলি স্টার ও টিবিএসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন বৃষ্টি নামতেই কয়েকটি এলাকায় হাঁটুপানি থেকে কোমরসমান জল জমে যায়।

চট্টগ্রামের পানি-সমস্যা আরও বড় হয়ে ওঠে পাহাড়ি এলাকার রানঅফের কারণে। টিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রাম অঞ্চলে ক্ষয়ক্ষতি, কৃষিজমি ও মৎস্যখাতে বড় আঘাত এসেছে; মাত্র ২৪ ঘণ্টায় শহরে ১৩৬.৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে বলেও সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে একই অঞ্চলে শিক্ষা কার্যক্রম স্থগিত, সড়ক ডুবে যাওয়া এবং নিম্নাঞ্চলে বন্যার শঙ্কা দেখা দেয়।

দেশে বৃষ্টি শুধু শহরকে নয়, পুরো ব্যবস্থাকেই চাপে ফেলেছে

ঢাকা ও চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা একই সময়ে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির সঙ্গেও জড়িয়ে গেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টানা বৃষ্টি ও ভূমিধসে দেশের সাত জেলায় অন্তত ৪৪ জন নিহত হয়েছেন এবং ১০ লাখের বেশি মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন; ২ লাখ ৬৭ হাজারেরও বেশি পরিবার পানিবন্দি হয়েছে। সেনা ও নৌবাহিনী নৌপথে ত্রাণ পৌঁছে দিচ্ছে, কারণ সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র ও আবহাওয়া অধিদপ্তরের সতর্কবার্তাও বলছে, পরিস্থিতি সহজে স্বাভাবিক হবে না। ঢাকাসহ ছয় বিভাগে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস ছিল, আর সাঙ্গু, কুশিয়ারা ও সোমেশ্বরীসহ কয়েকটি নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এর অর্থ, নগর জলাবদ্ধতা আর পাহাড়ি বন্যা এখন আলাদা দুটো সমস্যা নয়; একই মৌসুমি চাপের ভিন্ন দুই রূপ।

তাহলে সমাধান কোথায়?

বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, প্রকৃত সমাধান কেবল আরও একটি পাম্প বসানো বা আরেক দফা নালা খননের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ঢাকায় দরকার সমন্বিত জলব্যবস্থাপনা—খাল, জলাভূমি, রিটেনশন এরিয়া, সড়ক ডিজাইন, স্যুয়ারেজ ও স্টর্মওয়াটার নেটওয়ার্ককে এক ছাতার নিচে আনা। দ্য ডেইলি স্টার উদ্ধৃত বিশেষজ্ঞদের মতে, জলাভূমি পুনরুদ্ধার, খাল দখলমুক্ত করা, সড়কের নকশা ঠিক করা এবং ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

চট্টগ্রামের ক্ষেত্রেও বার্তা একটাই—যে প্রকল্পগুলো ১৪ হাজার কোটি টাকা খরচের পরও অসম্পূর্ণ, সেগুলোকে কাগজে নয়, বাস্তব কাজে শেষ করতে হবে। নইলে প্রতিটি বর্ষা নতুন করে মানুষকে হাঁটুসমান পানিতে দাঁড় করাবে, আর প্রশাসন আবারও “সাময়িক জলাবদ্ধতা”র একই ব্যাখ্যা দেবে। কিন্তু শহরের মানুষের কাছে এটি সাময়িক নয়—এটি প্রতি বর্ষার পুনরাবৃত্ত বিপর্যয়।

পরিশেষে বলা যায়, ঢাকা ও চট্টগ্রাম ডুবছে শুধু বৃষ্টিতে নয়; ডুবছে পরিকল্পনার ঘাটতি, খাল-জলাভূমি হারানো, পাম্পিং সক্ষমতার দুর্বলতা, বর্জ্য ব্যবস্থার ব্যর্থতা এবং একে-অপরের সঙ্গে না মেলা সরকারি সিদ্ধান্তের নিচে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments