সাত দিনের রাষ্ট্রীয় বিদায়ে কোটি মানুষের সমাগম, কোরআনের আয়াত থেকে আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদল—তেহরান কি শোককে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দিচ্ছে?
তেহরান | ৫ জুলাই ২০২৬
কালো কাপড়ে মোড়া একটি কফিন ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে তেহরানের রাজপথ ধরে। গ্রীষ্মের তীব্র গরমের মধ্যেও লাখো মানুষের ঢল। চারপাশে কালো পোশাক, শোকের প্রতীক কালো পতাকা, আর মাঝেমধ্যে উঁচিয়ে ধরা লাল মুষ্টিবদ্ধ হাত। সেই হাত শুধু শোকের প্রতীক নয়—এটি প্রতিরোধেরও ভাষা।
টানা প্রায় সাড়ে তিন দশক ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় শেষযাত্রা এখন শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি দ্রুতই রূপ নিচ্ছে আন্তর্জাতিক কূটনীতি, আদর্শিক অবস্থান এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ রাজনীতির এক প্রতীকী মঞ্চে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ বিমান হামলায় নিহত হন খামেনি। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দীর্ঘ সময় তার দাফন বিলম্বিত হয়। যুদ্ধবিরতির কয়েক মাস পর শুরু হওয়া সাত দিনের এই রাষ্ট্রীয় আয়োজনকে ইরান এখন তাদের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অবস্থান তুলে ধরার একটি বড় সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছে।
কোটি মানুষের শোক, না রাষ্ট্রীয় শক্তির প্রদর্শন?
ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি, তেহরান থেকে কোম, পরে ইরাকের নাজাফ ও কারবালা হয়ে মাশহাদ পর্যন্ত চলা এই শেষযাত্রায় দেড় থেকে দুই কোটির বেশি মানুষ অংশ নিতে পারেন।
ইতোমধ্যে শতাধিক দেশের প্রতিনিধি তেহরানে পৌঁছেছেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী, তাজিকিস্তানের প্রেসিডেন্ট, আর্মেনিয়া, জর্জিয়া, তুরস্ক, কাতার ও কয়েকটি আরব দেশের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি আন্তর্জাতিকভাবে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এত বড় আন্তর্জাতিক উপস্থিতি এমন একটি বার্তা বহন করছে যে, ইরানকে কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে রাখার পশ্চিমা প্রচেষ্টা অন্তত পুরোপুরি সফল হয়নি।
শোকের মঞ্চে কোরআনের বিশেষ বার্তা
এই শেষযাত্রার আরেকটি আলোচিত দিক হয়ে উঠেছে কোরআনের নির্দিষ্ট আয়াত তেলাওয়াতের বিষয়টি।
তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় বিদেশি প্রতিনিধিদল যখন খামেনির কফিনের সামনে শ্রদ্ধা জানাতে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন আয়াত তেলাওয়াত করা হচ্ছিল বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
বিশেষ করে সৌদি প্রতিনিধিদল সামনে আসার সময় সূরা আলে-ইমরানের ১৩ নম্বর আয়াত তেলাওয়াত করা হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
আয়াতে বলা হয়েছে—
“নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য একটি নিদর্শন ছিল দুটি দলের মধ্যে, যারা মুখোমুখি হয়েছিল—একদল আল্লাহর পথে যুদ্ধ করছিল এবং অন্যদল ছিল অবিশ্বাসী…”
এই আয়াতের প্রেক্ষাপট ইসলামের ইতিহাসের বদর যুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এটি ছিল একটি প্রতীকী বার্তা—যেখানে তেহরান তাদের তথাকথিত “প্রতিরোধ অক্ষ” (Axis of Resistance)-এর অবস্থান পুনরায় তুলে ধরতে চেয়েছে।
তবে এই ব্যাখ্যাকে এখনো ইরানের কোনো সরকারি সূত্র আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি।
পশ্চিমা বিশ্ব বনাম গ্লোবাল সাউথ: দুই ধরনের ব্যাখ্যা
পশ্চিমা গণমাধ্যমের একাংশ এই বিশাল আয়োজনকে রাষ্ট্রীয় প্রচারণা এবং শাসনব্যবস্থার বৈধতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছে।
অন্যদিকে গ্লোবাল সাউথের বহু পর্যবেক্ষকের কাছে এই দৃশ্যের অর্থ ভিন্ন।
তাদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের সামরিক হস্তক্ষেপ, ১৯৫৩ সালের ইরান অভ্যুত্থান, ইরাক যুদ্ধ, লিবিয়া ও সিরিয়ার ঘটনাগুলোর আলোকে অনেক দেশ পশ্চিমা শক্তির ভূমিকাকে অন্যভাবে মূল্যায়ন করে।
সেই দৃষ্টিকোণ থেকে খামেনির শেষযাত্রাকে কেউ কেউ “প্রতিরোধ রাজনীতির ধারাবাহিকতা” হিসেবেও দেখছেন।
শেষযাত্রার পথেও রয়েছে প্রতীকী বার্তা
খামেনির কফিন তেহরান থেকে কোম হয়ে ইরাকের নাজাফ ও কারবালা নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তকেও অনেকে কেবল ধর্মীয় বিষয় হিসেবে দেখছেন না।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি শিয়া ধর্মীয় কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক ও আদর্শিক সংযোগেরও প্রতীক।
বার্তাটি হতে পারে—নেতৃত্ব ব্যক্তিনির্ভর নয়; একজন নেতা চলে গেলেও ধারণা বা আন্দোলন শেষ হয় না।
নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত?
বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে অনেক বিশ্লেষক দীর্ঘদিন “একক মেরু বিশ্বব্যবস্থা” হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
কিন্তু তেহরানের এই শেষযাত্রাকে কেন্দ্র করে নতুন আলোচনা উঠেছে—বিশ্ব কি এখন ধীরে ধীরে বহুমেরু কাঠামোর দিকে যাচ্ছে?
খামেনির রাষ্ট্রীয় বিদায়ের ভেতরে হয়তো সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সেটিই—
এটি কি কেবল একজন নেতার শেষযাত্রা, নাকি একটি নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনার প্রতীক?
সূত্র: উইয়ন নিউজ, আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদন ও বিশ্লেষণভিত্তিক তথ্য



