হরমুজ প্রণালি, অবরুদ্ধ সম্পদ ও যুদ্ধবিরতি নিয়ে অগ্রগতি দাবি; তবে চূড়ান্ত সমাধান থেকে এখনও দূরে ওয়াশিংটন–তেহরান
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির ভূরাজনীতি আবারও নতুন মোড়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে কাতারের রাজধানী দোহায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে দুই দিনব্যাপী পরোক্ষ আলোচনা শেষ হয়েছে, অন্যদিকে প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় জানাজাকে সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে নতুন করে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে তেহরান।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা শেষ হওয়ার ঘোষণা দিলেও জানিয়েছে, এখনই কোনো চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানো যায়নি। তবে দুই পক্ষ অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রাখতে সম্মত হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, পরবর্তী বৈঠকের তারিখ এখনও নির্ধারিত হয়নি। তবে খামেনির দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর নতুন দফার আলোচনা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
জানাজার আগে সামরিক সতর্কবার্তা
রাষ্ট্রীয় জানাজাকে ঘিরে ইরানের সামরিক নেতৃত্বের বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে।
খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্সের কমান্ডার আলী আবদুল্লাহি এক বিবৃতিতে বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো আগ্রাসন বা হুমকির জবাবে দেশটির সশস্ত্র বাহিনী কঠোর প্রতিক্রিয়া জানাবে।
এই বক্তব্য সরাসরি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের উত্তেজনা এখনও পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিও একই ধরনের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের জনগণ কিংবা নেতৃত্বের বিরুদ্ধে যেকোনো হুমকি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়বে।
আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে হরমুজ ও অর্থনৈতিক ইস্যু
দোহায় অনুষ্ঠিত আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা, সামুদ্রিক চলাচল এবং ইরানের অবরুদ্ধ অর্থ ছাড়ের বিষয়।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোরগুলোর একটি। বৈশ্বিক তেল সরবরাহের বড় অংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই প্রণালিকে ঘিরে যেকোনো উত্তেজনা আন্তর্জাতিক বাজারেও সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
আলোচনায় অংশ নেওয়া কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, যুদ্ধবিরতির বাস্তবায়ন, নিরাপদ নৌ চলাচল এবং অর্থনৈতিক বিষয়গুলোকে তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তবে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে এই দফায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আলোচনার বিষয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে সাংবাদিকদের বলেছেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার বিষয়ে অগ্রগতি হচ্ছে এবং আলোচনা ইতিবাচক ছিল।
তবে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের দাবি, এবারের বৈঠকের মূল ফোকাস ছিল আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও উত্তেজনা কমানোর পদক্ষেপ।
রাষ্ট্রীয় শোক, কড়া নিরাপত্তা
ইরানের সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহজুড়ে তেহরান, কোম, মাশহাদসহ বিভিন্ন শহরে রাষ্ট্রীয় শোক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে। নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে সাময়িক আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণও আরোপ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই জানাজা শুধু একটি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি ইরানের জন্য রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনেরও একটি বড় উপলক্ষ।
নতুন সংঘাত, নাকি দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতা?
দোহা আলোচনা হয়তো এখনই বড় কোনো সমাধান আনতে পারেনি, কিন্তু এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে—উভয় পক্ষ এখনও যোগাযোগের পথ খোলা রাখতে চায়।
তবে প্রশ্ন রয়ে গেছে, এই আলোচনা কি দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতার দিকে এগোচ্ছে, নাকি এটি কেবল নতুন সংঘাতের আগে সাময়িক বিরতি?
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ইতিহাস বলছে, যুদ্ধবিরতি অনেক সময় শান্তির সমার্থক হয় না। বরং অনেক ক্ষেত্রে সেটি পরবর্তী সংঘাতের মধ্যবর্তী বিরতি হিসেবেও দেখা গেছে।
খামেনির রাষ্ট্রীয় জানাজা শেষ হওয়ার পরই সম্ভবত পরিষ্কার হবে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের কূটনৈতিক সম্পর্ক নতুন সমীকরণে প্রবেশ করছে, নাকি অঞ্চলটি আবারও আরেক দফা সংঘাতের দিকে এগোচ্ছে।



