Homeটুডে ওয়ার্ল্ডআনোয়ার সাদাত: যুদ্ধক্ষেত্রের সৈনিক থেকে শান্তির নোবেলজয়ী রাষ্ট্রনায়ক

আনোয়ার সাদাত: যুদ্ধক্ষেত্রের সৈনিক থেকে শান্তির নোবেলজয়ী রাষ্ট্রনায়ক

মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে কিছু নেতা আছেন, যাঁদের নাম উচ্চারণ করলেই সঙ্গে সঙ্গে উঠে আসে যুদ্ধ, বিপ্লব, সাহস এবং বিতর্কের দীর্ঘ ইতিহাস। আনোয়ার সাদাত ছিলেন সেই বিরল নেতাদের একজন। তিনি ছিলেন সৈনিক, বিপ্লবী, রাষ্ট্রনায়ক, কূটনীতিক এবং একই সঙ্গে এমন এক ব্যক্তি, যিনি নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাসের জন্য জীবন পর্যন্ত হারিয়েছিলেন। মিশরের ইতিহাসে গামাল আবদেল নাসেরের পর যে নেতা দেশটির গতিপথ আমূল বদলে দেন, তিনি ছিলেন আনোয়ার সাদাত।

জন্ম ও শৈশব: সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা এক স্বপ্নদ্রষ্টা

মোহাম্মদ আনোয়ার আল-সাদাত জন্মগ্রহণ করেন ১৯১৮ সালের ২৫ ডিসেম্বর, মিশরের নীল নদের তীরবর্তী ছোট গ্রাম মিত আবুল কুমে। তাঁর বাবা ছিলেন সরকারি স্বাস্থ্য বিভাগের একজন কর্মচারী এবং মা ছিলেন সুদানি বংশোদ্ভূত।

১৩ সদস্যের বড় পরিবারে বেড়ে ওঠা সাদাতের শৈশব ছিল সীমিত সুযোগ-সুবিধার। ছোটবেলা থেকেই তিনি সমাজে বৈষম্য, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আধিপত্য এবং মিশরের রাজনৈতিক দুর্বলতা খুব কাছ থেকে দেখেছেন।

কৈশোরে তাঁর ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল কয়েকটি বিষয়—

প্রথমত, ব্রিটিশবিরোধী জাতীয়তাবাদ।

দ্বিতীয়ত, ইসলামি মূল্যবোধ।

তৃতীয়ত, সামরিক নেতৃত্বের প্রতি আকর্ষণ।

তিনি পরবর্তীতে লিখেছিলেন—

“আমি ছোটবেলাতেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, সাধারণ জীবন আমার জন্য নয়।”

শিক্ষা ও সামরিক জীবনের সূচনা

সাদাতের পরিবার ধনী না হলেও তাঁর মধ্যে শিক্ষার প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল। তিনি কায়রোর রয়্যাল মিলিটারি একাডেমিতে ভর্তি হন।

এই সামরিক একাডেমিতেই তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় ঘটে—গামাল আবদেল নাসেরের সঙ্গে।

পরবর্তী সময়ে এই বন্ধুত্বই মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির ইতিহাস বদলে দেয়।

১৯৩৮ সালে তিনি সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন।

তবে তাঁর সামরিক জীবন শুরু থেকেই ছিল অস্বাভাবিক। তিনি কেবল একজন সৈনিক ছিলেন না; তিনি ছিলেন রাজনৈতিকভাবে সচেতন একজন তরুণ অফিসার।

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন এবং কারাজীবন

তৎকালীন মিশর কার্যত ব্রিটিশ প্রভাবাধীন ছিল। তরুণ সাদাত মনে করতেন, দেশের স্বাধীনতা ছাড়া প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি ব্রিটিশবিরোধী বিভিন্ন গোপন কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন।

এই অভিযোগে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং কয়েক বছর কারাভোগ করতে হয়।

জেলজীবন তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও কঠোর করে তোলে।

কারাগারে তিনি বিপ্লব, জাতীয়তাবাদ এবং রাজনৈতিক সংগ্রাম নিয়ে গভীরভাবে পড়াশোনা করেন।

বিপ্লবের স্থপতি: রাজতন্ত্রের পতন

১৯৫২ সালে মিশরের ইতিহাসে ঘটে এক বিশাল পরিবর্তন।

“ফ্রি অফিসার্স মুভমেন্ট” নামে পরিচিত সামরিক কর্মকর্তাদের একটি গোপন সংগঠন রাজা ফারুককে ক্ষমতাচ্যুত করে।

এই বিপ্লবের অন্যতম প্রধান সদস্য ছিলেন আনোয়ার সাদাত।

যদিও নেতৃত্বে ছিলেন গামাল আবদেল নাসের, সাদাত ছিলেন তাঁর অন্যতম বিশ্বস্ত সহযোগী।

এই বিপ্লবের মাধ্যমে মিশরে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে এবং প্রজাতান্ত্রিক যুগ শুরু হয়।

নাসেরের ছায়া থেকে ক্ষমতার কেন্দ্রে

গামাল আবদেল নাসের দীর্ঘদিন মিশরের সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা ছিলেন।

তাঁর আমলে সাদাত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেন—

সংসদের স্পিকার,

উপ-রাষ্ট্রপতি,

দলীয় গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা।

১৯৭০ সালে নাসের হঠাৎ মারা গেলে অনেকেই ভেবেছিলেন সাদাত কেবল একটি অস্থায়ী ও দুর্বল নেতৃত্ব হবেন।

কিন্তু খুব দ্রুত তিনি সবাইকে ভুল প্রমাণ করেন।

রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়ে তিনি ধীরে ধীরে নিজের ক্ষমতা শক্তিশালী করেন এবং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের সরিয়ে দেন।

১৯৭৩ সালের যুদ্ধ: সম্মান পুনরুদ্ধারের লড়াই

সাদাতের জীবনের সবচেয়ে নাটকীয় অধ্যায় আসে ১৯৭৩ সালে।

১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে মিশর সিনাই উপদ্বীপ হারিয়েছিল।

এটি আরব বিশ্বে গভীর অপমানের প্রতীক হয়ে উঠেছিল।

সাদাত সিরিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন।

ইয়োম কিপুর যুদ্ধ নামে পরিচিত এই সংঘাতের শুরুতে মিশরীয় বাহিনী উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে।

যদিও যুদ্ধের চূড়ান্ত সামরিক ফলাফল জটিল ছিল, তবুও আরব বিশ্বে সাদাত জাতীয় বীর হয়ে ওঠেন।

কারণ তিনি প্রমাণ করেছিলেন, ইসরায়েল অজেয় নয়।

শান্তির পথে এক সাহসী সিদ্ধান্ত

যুদ্ধের কয়েক বছরের মধ্যেই সাদাত এমন এক সিদ্ধান্ত নেন যা পুরো বিশ্বকে বিস্মিত করে।

১৯৭৭ সালে তিনি সরাসরি ইসরায়েল সফরে যান।

এটি ছিল ইতিহাসে প্রথম কোনো আরব নেতার ইসরায়েল সফর।

অনেকেই এটিকে রাজনৈতিক আত্মহত্যা বলেছিলেন।

কিন্তু সাদাত বিশ্বাস করতেন—

“যুদ্ধের সাহস যেমন প্রয়োজন, শান্তির সাহস তার চেয়েও বেশি।”

১৯৭৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের মধ্যস্থতায় সাদাত এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী মেনাহেম বেগিন “ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি” স্বাক্ষর করেন।

এই চুক্তির মাধ্যমে মিশর সিনাই ফেরত পায়।

১৯৭৮ সালে সাদাত এবং বেগিন যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন।

বিতর্ক ও রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা

শান্তিচুক্তি বিশ্বজুড়ে প্রশংসা পেলেও আরব বিশ্বে সাদাত কঠোর সমালোচনার মুখে পড়েন।

অনেক আরব দেশ তাঁকে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে আখ্যা দেয়।

মিশরকে আরব লীগ থেকেও সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়।

দেশের ভেতরেও ইসলামপন্থী গোষ্ঠী এবং বিরোধী দলগুলোর অসন্তোষ বাড়তে থাকে।

পরিবার ও ব্যক্তিগত জীবন

সাদাতের স্ত্রী জেহান সাদাত মিশরের নারী অধিকার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।

তাঁদের তিন কন্যা এবং তিন পুত্র ছিল।

ব্যক্তিগত জীবনে সাদাত ছিলেন মার্জিত, সুসজ্জিত এবং আত্মবিশ্বাসী।

পশ্চিমা পোশাক, পাইপ ধূমপান এবং আধুনিক জীবনধারার কারণে তিনি অন্য অনেক আরব নেতার থেকে আলাদা পরিচিতি পেয়েছিলেন।

হত্যাকাণ্ড: নিজের সৈন্যদের হাতেই মৃত্যু

১৯৮১ সালের ৬ অক্টোবর।

কায়রোতে সামরিক কুচকাওয়াজ চলছিল।

হঠাৎ সেনাবাহিনীর একটি অংশ আনোয়ার সাদাতের মঞ্চের দিকে গুলি চালায়।

ইসলামপন্থী উগ্রপন্থী সেনাসদস্যরা তাঁকে হত্যা করে।

মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতার জীবন শেষ হয়ে যায়।

তাঁর মৃত্যুর পর ভাইস প্রেসিডেন্ট হোসনি মুবারক ক্ষমতায় আসেন।

উত্তরাধিকার: নায়ক নাকি বিতর্কিত নেতা?

আজও আনোয়ার সাদাতকে নিয়ে মতভেদ রয়েছে।

কেউ তাঁকে যুদ্ধের নায়ক বলেন।

কেউ বলেন শান্তির দূত।

আবার কেউ মনে করেন, তিনি আরব ঐক্য ভেঙেছিলেন।

কিন্তু একটি বিষয়ে খুব কমই দ্বিমত আছে—

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকে তিনি স্থায়ীভাবে বদলে দিয়েছিলেন।

তিনি দেখিয়েছিলেন, একজন সৈনিক কেবল যুদ্ধ জিততে পারে না; কখনো কখনো শান্তির জন্যও ইতিহাসে অমর হয়ে থাকতে পারে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments