দোহা আলোচনা, জমে থাকা অর্থ, হরমুজের নিয়ন্ত্রণ আর মার্কিন অর্থনৈতিক চাপ—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির সমীকরণ বদলে যাচ্ছে কি?
ঢাকা | ২ জুলাই ২০২৬
আমি আজকের ইরান-যুক্তরাষ্ট্র কূটনীতি দেখে একটি বিষয় খুব স্পষ্টভাবে অনুভব করছি: যুদ্ধের ভাষা যতই তীব্র হোক, শেষ পর্যন্ত কাঁটা ঘোরে অর্থনীতি, চোকপয়েন্ট আর দর কষাকষির টেবিলেই। Reuters জানিয়েছে, দোহায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পরোক্ষ আলোচনায় মূলত হরমুজ প্রণালী দিয়ে নৌচলাচল এবং ইরানের জন্য আর্থিক প্রণোদনা—এই দুই ইস্যুই আলোচনার কেন্দ্রে ছিল; পারমাণবিক কর্মসূচি তখনও বড় আলোচ্য হয়নি। একই দিনে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, দুই দেশ “getting along very well,” আর AP জানায়, উভয় পক্ষ কাতারে পৃথক বৈঠক করেছে এবং আলোচনা চালিয়ে যেতে রাজি হয়েছে।
আমার কাছে এটি কেবল কূটনৈতিক সৌজন্য নয়; এটি চাপের রাজনীতি। কারণ Reuters আরও বলছে, ইরান হরমুজের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চায়, আগস্ট থেকে toll আরোপের ইঙ্গিতও দিয়েছে। এমনকি সাময়িক চুক্তিতে ৬০ দিন toll-free passage থাকলেও, তেহরান এখনো জলপথটির ওপর নিজের কর্তৃত্ব আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেতে চাইছে।
ফলে এই আলোচনার আরেক কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে জমে থাকা ইরানি অর্থ। Al Jazeera জানিয়েছে, কাতারে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার পাশাপাশি অন্তত ৬ বিলিয়ন ডলার ফ্রোজেন অ্যাসেট ছাড় করার বিষয়েও যোগাযোগ চলেছে; একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই অর্থের একটি অংশ ইরান প্রয়োজনীয় পণ্য কেনায় ব্যবহার করতে চাইছে। আমি তাই বলছি—এখানে লড়াইটা কেবল গোলা-বারুদের নয়, অর্থ ছাড়ের শর্ত, নৌপথের নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক শ্বাসরুদ্ধতার বিরুদ্ধে কূটনৈতিক পাল্টাপাল্টির।
ট্রাম্পের ভাষার ভেতরেও আমি সেই চাপ স্পষ্ট দেখি। Reuters জানিয়েছে, তিনি Herbert Hoover-এর মতো “অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের” প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্মরণীয় হতে চান না—হুভারকে সাধারণত মহামন্দার যুগের ব্যর্থতার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। একইসঙ্গে Reuters বলছে, হরমুজ নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও সাম্প্রতিক আলোচনার ফলে তেলবাজারে চাপ কিছুটা কমেছে এবং তেলের দাম চার মাসের নিম্নস্তরে নেমেছে। অর্থাৎ, ট্রাম্পের সামনে কূটনৈতিক জেদ আছে, কিন্তু বাজারের ভয়ও আছে।
এখানেই আমার ব্যক্তিগত বিশ্লেষণ: ইরান এখন কেবল টিকে থাকার অবস্থানে নেই; তারা leverage-এর অবস্থানে চলে এসেছে। Reuters-ই লিখেছে, Tehran মনে করছে সাম্প্রতিক সংঘাত থেকে বেঁচে যাওয়া তাদের হরমুজ নিয়ে আরও কঠোর দাবি তোলার strategic opportunity দিয়েছে। আমার পাঠে এটি জয়ের ঘোষণা নয়, বরং ভূগোলের সুবিধাকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দেওয়ার চেষ্টা। হরমুজের মতো একটি জলপথ যখন বিশ্ব জ্বালানির স্নায়ুকেন্দ্র, তখন সেই পথে চাপ প্রয়োগ করা মানে শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতিকে মনে করিয়ে দেওয়া—কীভাবে একটি রাষ্ট্রের ভূ-অবস্থানই দর কষাকষির ভাষা বদলে দিতে পারে।
তবে বিপরীত মতও আছে। কেউ বলতেই পারেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কূটনৈতিক সক্ষমতা এখনো বিপুল; তাই ইরানের দাবি যতই কঠোর হোক, সেটি শেষ কথা নয়। AP জানিয়েছে, সংলাপ চলছে, কাতারে আলাদা আলাদা বৈঠক হয়েছে, আর কোন বড় peace deal এখনও হয়নি। একইসঙ্গে AP-এর খবরে দেখা যায়, সাম্প্রতিক সংঘাতে ইরান বहरাইন ও কুয়েতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে, যা বোঝায়—উত্তেজনা যে কোনো মুহূর্তে আবার বিস্ফোরিত হতে পারে। অর্থাৎ, কূটনীতি চলছে ঠিকই, কিন্তু ভরসা করার মতো স্থিতি এখনো আসেনি।
নাগরিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হলো—যখন হরমুজ উত্তপ্ত হয়, তখন তেলের দাম, পণ্য পরিবহন, বিমা, নৌপথ নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক বাজার একসঙ্গে কেঁপে ওঠে। Reuters জানিয়েছে, হরমুজ নিয়ে অনিশ্চয়তা বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে চাপের মধ্যে রেখেছিল, আর সাম্প্রতিক আলোচনায় সামান্য স্বস্তি এলেও নৌপথ পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। তাই আমি মনে করি, আজকের আসল প্রশ্ন “ইরান কি জিতল?” নয়; প্রশ্ন হলো, এই সংঘাতে কে কত দিন চাপ সহ্য করতে পারবে।
বর্তমান বাস্তবতা বলছে, ট্রাম্পের ভাষা নরম হয়েছে, কিন্তু দাবি থেকে সরে আসেনি; ইরানও নিজের অবস্থান শক্ত করছে, কিন্তু সম্পূর্ণ নিরাপদে চলে গেছে—এ কথাও বলা যাচ্ছে না। নিকট ভবিষ্যতে হরমুজ, জমে থাকা অর্থ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা এই তিনটি ইস্যুই আলোচনার গতিপথ ঠিক করবে। আর দীর্ঘমেয়াদে এ সংঘাত আমাদের শিখিয়ে দিচ্ছে—যে রাষ্ট্রের হাতে chokepoint, তার কণ্ঠস্বরও অনেক বড় হয়ে যায়।
🔎 তথ্য বনাম মতামত
তথ্য: দোহায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পরোক্ষ আলোচনা হয়েছে; আলোচনা হরমুজ ও আর্থিক প্রণোদনা ঘিরে ছিল; ইরান হরমুজে নিয়ন্ত্রণ ও toll আরোপের দাবি তুলছে; ফ্রোজেন অ্যাসেট নিয়ে আলোচনা চলছে; ট্রাম্প আলোচনাকে “getting along very well” বলেছেন।
মতামত: ট্রাম্পের সুর বদল ও ইরানের leverage বাড়া—এগুলো থেকে আমি যে রাজনৈতিক পাঠ নিচ্ছি, তা হলো এই মুহূর্তে ইরান কূটনীতির টেবিলে তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে আছে।
📌 তথ্যসূত্র: Reuters, AP, Al Jazeera।
[অধ্যাপক ড. আমিনুল ইসলামের বিশ্লেষণ]



