Homeটুডে ওয়ার্ল্ডহরমুজের জলরাশি আবারো রক্তাক্ত: যুদ্ধবিরতির ৮ দিনের মাথায় ইরানে মার্কিন হামলা, কে...

হরমুজের জলরাশি আবারো রক্তাক্ত: যুদ্ধবিরতির ৮ দিনের মাথায় ইরানে মার্কিন হামলা, কে লঙ্ঘন করলো চুক্তি?

ওয়াশিংটন/তেহরান | ২৭ জুন ২০২৬
১৭ জুন ১৪ দফা ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। কিন্তু মাত্র ৮ দিন পরেই সেই চুক্তি রক্তাক্ত হলো। হরমুজ প্রণালিতে একটি কার্গো জাহাজে ড্রোন হামলার অভিযোগে ইরানের সামরিক স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রশ্নটি এখন একটাই—কে প্রথমে চুক্তি ভাঙল? আর এই পাল্টাপাল্টি হামলা কি আবারো পুরো অঞ্চলকে যুদ্ধের আগুনে পুড়িয়ে দেবে?

📜 যা ঘটেছে: ঘণ্টায় ঘণ্টায় যুদ্ধের টাইমলাইন
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন), হরমুজ প্রণালি দিয়ে ওমানের উপকূল ধরে যাত্রা করছিল সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী কার্গো জাহাজ ‘এভার লাভলি’। হঠাৎ করেই জাহাজটির ওপর ড্রোন হামলা চালায় ইরান। ট্রাম্পের দাবি, ইরান মোট চারটি ড্রোন ছুড়েছিল, যার মধ্যে একটি জাহাজের উপরের ডেকে আঘাত হানে। যদিও জাহাজটির কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি, তবে এটি আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) ১১ হাজারের বেশি নাবিককে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা স্থগিত করতে বাধ্য করে।
শুক্রবার (২৬ জুন), ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে ইরানকে যুদ্ধবিরতির ‘বোকামিপূর্ণ লঙ্ঘন’ (foolish violation) বলে অভিহিত করেন। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সংরক্ষণাগার এবং উপকূলীয় রাডার অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালায়। সেন্টকম একে জাহাজে হামলার ‘শক্তিশালী জবাব’ হিসেবে বর্ণনা করে।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানায়, তারা মার্কিন হামলার পাল্টা জবাব দিয়েছে। তবে এর বিস্তারিত জানায়নি তারা।

🤝 চুক্তির ৮ দিন: ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকের গল্প
১৭ জুন স্বাক্ষরিত এই চুক্তির মূল বক্তব্য ছিল:
· সব ফ্রন্টে তাত্ক্ষণিক যুদ্ধবিরতি
· iran ৬০ দিনের জন্য হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করবে, কোনো ফি নেবে না
· যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জব্দকৃত তহবিল থেকে ১২ বিলিয়ন ডলার ছাড় করবে
· ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না——এনপিটি প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত
চুক্তি স্বাক্ষরের পর হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলা হয়। কিন্তু মাত্র ৮ দিনের মাথায় সেই পথ আবারো বন্ধের পথে।

🗣️ উভয় পক্ষের বক্তব্য: কে লঙ্ঘন করলো?
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি:
· ট্রাম্প বলেছেন, iran যুদ্ধবিরতির বোকামিপূর্ণ লঙ্ঘন করেছে। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, ‘তারা গতকাল গুলি চালিয়েছে, এটা আমার ভালো লাগেনি’।
· ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, ‘সহিংসতার জবাব সহিংসতা দিয়েই দেওয়া হবে’।
· সেন্টকম বলেছে, ‘বাণিজ্যিক জাহাজের বিরুদ্ধে ইরানি বাহিনীর অযৌক্তিক আগ্রাসন স্পষ্টভাবে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে’।
ইরানের দাবি:
· আইআরজিসি বলেছে, জাহাজটি ‘অনুমোদনহীন পথে’ চলাচল করছিল।
· ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির প্রধান ইব্রাহিম আজিজি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘আবারও আলোচনার মাঝখানে হামলা চালিয়েছে’ ।
· তিনি আরও বলেন, ‘যুদ্ধবিরতির এই বেপরোয়া লঙ্ঘন সবসময়কার মতোই তাদের পশ্চাদপসরণ ও অনুতাপে নিয়ে যাবে’।

🌊 ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব: কেবল একটি জাহাজ নয়, পুরো অঞ্চল ঝুঁকিতে
এই হামলার প্রভাব শুধু একটি জাহাজ বা দুটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়:
১. বৈশ্বিক তেলবাজারে প্রভাব: ফেব্রুয়ারিতে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তেলের দাম বেড়ে গিয়েছিল। এখন আবারো সেই শঙ্কা ফিরে এসেছে।
২. আটকে পড়া নাবিকদের ভাগ্য: ১১ হাজারের বেশি নাবিককে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা স্থগিত। তাদের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত।
৩. আন্তর্জাতিক বাণিজ্য: হরমুজ প্রণালি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলোর একটি। এখানে অস্থিরতা মানে সার, খাদ্যশস্য ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়া।
৪. মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা: চুক্তি স্বাক্ষরের পর যে আশার আলো দেখেছিল অঞ্চল, তা আবারো ম্লান হতে শুরু করেছে।

🔮 বিশ্লেষণ: যুদ্ধবিরতি কি টিকে থাকবে?
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ঘটনা যুদ্ধবিরতির জন্য প্রথম বড় পরীক্ষা ছিল। কিন্তু উভয় পক্ষই তাদের অবস্থান থেকে সরে আসেনি। iran বলছে, ‘এই আগ্রাসন পুনরাবৃত্তি হলে আমাদের প্রতিক্রিয়া এর চেয়েও বিস্তৃত হবে’ । অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র বলছে, ‘আমরা চুক্তি মেনে চলেছি, কিন্তু সহিংসতার জবাব সহিংসতা দিয়েই দেওয়া হবে’।
প্রশ্ন হলো—কে প্রথমে পিছু হটবে? ট্রাম্প প্রশাসন ইতিমধ্যে ইরানের সামরিক সক্ষমতা ৮২% ড্রোন, ৮০% ক্ষেপণাস্ত্র কমিয়ে দেওয়ার দাবি করেছে। কিন্তু iran এখনো প্রতিরোধের সক্ষমতা রাখে।
মূল দ্বন্দ্ব: iran বলছে, ‘আমরা প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করি’; যুক্তরাষ্ট্র বলছে, ‘আমরা নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করি’। এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে সংঘাত যতক্ষণ চলবে, যুদ্ধবিরতি ততক্ষণ ভঙ্গুর থাকবে।

🧭 শেষ কথা
হরমুজ প্রণালির পানি যেমন অশান্ত, তেমনি অশান্ত এখন রাজনৈতিক সমীকরণ। ১৪ দফা চুক্তি স্বাক্ষরের সময় যে আশা তৈরি হয়েছিল, তা মাত্র ৮ দিনে ধুলিস্মাৎ হওয়ার পথে।
ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ যেমন বলেছেন——‘হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ আর কখনোই যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরে যাবে না’ ।
didn’t ট্রাম্প বলেছেন——‘তারা একটু ভিন্ন ধাঁচের’ ।
এই ‘ভিন্ন ধাঁচের’ সংঘাতের জেরে আবারো কি পুরো অঞ্চল যুদ্ধের দিকে ধাবিত হবে? নাকি কূটনীতি জয়ী হবে? উত্তর হয়তো আগামী কয়েক দিনের মধ্যে পাওয়া যাবে। কিন্তু যতক্ষণ না উভয় পক্ষ ‘ফোন তুলে’ কথা বলতে রাজি হচ্ছে, ততক্ষণ না হরমুজের জলরাশি শান্ত হবে না।

তথ্যসূত্র:
বিবিসি আল জাজিরা অবলম্বনে

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments