Homeটুডে ওয়ার্ল্ডহরমুজ থেকে তেহরান: কেন ইরানকে দ্রুত পরাজিত করতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোট?

হরমুজ থেকে তেহরান: কেন ইরানকে দ্রুত পরাজিত করতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোট?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ২১ জুন ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক সংঘাত শুধু একটি যুদ্ধের ফলাফল নয়; বরং এটি আন্তর্জাতিক ক্ষমতার রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ধারণা ছিল—সামরিক শক্তিতে এগিয়ে থাকা মানেই রাজনৈতিক বিজয় নিশ্চিত করা। তবে ইরানকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সামরিক অভিযানের পর সেই ধারণা নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক জোটগুলোর একটি হয়েও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের ঘোষিত কৌশলগত লক্ষ্য পূরণে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। বরং এই সংঘাত দেখিয়েছে, আধুনিক যুদ্ধের ফলাফল আগের তুলনায় অনেক বেশি জটিল এবং অনিশ্চিত।

শক্তির অসম লড়াই, কিন্তু ফলাফল অপ্রত্যাশিত

সামরিক সক্ষমতার দিক থেকে ইরান যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইসরায়েলের সমপর্যায়ের নয়। তবুও সংঘাতের শুরুতে বড় আঘাত পাওয়ার পরও দেশটি দ্রুত পুনর্গঠিত হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান প্রচলিত যুদ্ধ কৌশলের বদলে কয়েকটি ভিন্নধর্মী কৌশল ব্যবহার করেছে—

• কৌশলগত চাপের অস্ত্র হিসেবে হরমুজ প্রণালিকে ব্যবহার
• আঞ্চলিক মিত্র ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে সমীকরণে আনা
• তুলনামূলক কম প্রযুক্তির অস্ত্রভান্ডারকে কার্যকরভাবে ব্যবহার
• দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয়ক্ষতি সহ্য করার সক্ষমতা প্রদর্শন

এসব উপাদান প্রচলিত সামরিক ভারসাম্যকে আংশিকভাবে বদলে দিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

হরমুজ প্রণালি: যুদ্ধের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক অস্ত্র

বিশ্বের মোট দৈনিক তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। ফলে এই নৌপথে অস্থিতিশীলতা শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও সরাসরি প্রভাব ফেলে।

সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখতে তারা বিশেষ নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। অন্যদিকে ইরান জানিয়েছে, চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন হলে তারা আবারও নৌপথ সীমিত করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

এই পরস্পরবিরোধী অবস্থান প্রমাণ করছে, যুদ্ধবিরতির পরও উত্তেজনা পুরোপুরি কমেনি।

ট্রাম্পের নতুন সতর্কবার্তা: “টোল” ইস্যুতে নতুন বিতর্ক

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত সমঝোতা না হলে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা সেবার খরচের অংশ হিসেবে টোল আরোপের বিষয় বিবেচনা করতে পারে।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিম এশিয়ার নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে এবং সেই ব্যয়ের প্রশ্ন ভবিষ্যতে উঠতে পারে।

তবে সমালোচকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক জলপথে একতরফাভাবে টোল আরোপের বিষয়টি নতুন কূটনৈতিক বিরোধ সৃষ্টি করতে পারে।

রাজনৈতিক লক্ষ্য কি অর্জিত হয়েছে?

বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের অন্যতম লক্ষ্য ছিল ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব কমানো এবং নতুন মধ্যপ্রাচ্য কৌশলকে শক্তিশালী করা।

কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে—

• ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো অক্ষত রয়েছে
• আঞ্চলিক মিত্র নেটওয়ার্ক পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি
• পারমাণবিক প্রশ্ন এখনো আলোচনার পর্যায়ে
• হরমুজ সংকট পুনরায় ফিরে আসার আশঙ্কা রয়েছে

ফলে সামরিক অভিযান হলেও দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধান এখনো স্পষ্ট নয়।

নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত

মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, আধুনিক যুগে যুদ্ধের ফলাফল শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে নির্ধারিত হচ্ছে না। অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, কূটনীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি সহনশীলতাও বড় ভূমিকা পালন করছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি বিষয় স্পষ্ট—সংঘাত হয়তো সাময়িকভাবে থামতে পারে, কিন্তু এর পেছনের ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখনো শেষ হয়নি। আগামী ৬০ দিনের আলোচনা মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ শক্তির ভারসাম্যে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments