অজান্তেই গুপ্তচরবৃত্তির চক্রান্তে জড়াচ্ছেন ফটোগ্রাফার ও শিক্ষার্থীরা; তিব্বত সীমান্তে আটক দুই বাংলাদেশীর মৃত্যুদণ্ডের শঙ্কা
বিশেষ অনুসন্ধান | ১৯ জুন ২০২৬
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে উচ্চশিক্ষা ও ফ্রিল্যান্সিং পেশায় যুক্ত তরুণ বাংলাদেশীদের টার্গেট করে এক ভয়ঙ্কর ভূ-রাজনৈতিক চাল চালছে পার্শ্ববর্তী একটি দেশের গোয়েন্দা সংস্থা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সহজলভ্য ট্রাভেল প্রোফাইল এবং ড্রোন অপারেটরদের অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে সুকৌশলে বেইজিং, ইসলামাবাদ কিংবা সংবেদনশীল সীমান্ত এলাকার সামরিক তথ্য পাচারের ফাঁদ পাতা হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা পরিভাষায় যাকে ‘সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’ বা ‘হানিপট ট্র্যাপ’ বলা হয়, সেই পদ্ধতিতে অজান্তেই বাংলাদেশী যুবকদের ব্যবহার করা হচ্ছে প্রক্সি স্পাই বা ‘ছায়া গুপ্তচর’ হিসেবে। এই ফাঁদে পা দিয়ে ইতিমধ্যেই চীনের তিব্বত সীমান্তে আটক হয়েছেন দুই বাংলাদেশী শিক্ষার্থী, যাদের ওপর ঝুলছে চীনা আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি বা মৃত্যুদণ্ডের তলোয়ার।
🕵️ প্রথম ধাপ: যেভাবে খোঁজা হয় ‘টার্গেট’
অনুসন্ধানী সূত্রে জানা গেছে, গোয়েন্দা চক্রটি মূলত চীন, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও নেপালে অধ্যয়নরত বাংলাদেশী শিক্ষার্থী অথবা বাংলাদেশ থেকে নিয়মিত ওই সব দেশে যাতায়াতকারী ড্রোন অপারেটর ও ট্রাভেল গাইডদের টার্গেট করে।
১. ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট ট্র্যাকিং: ফেসবুকের বিভিন্ন ট্রাভেল গ্রুপ, ইনস্টাগ্রাম বা ইউটিউবে যারা নিয়মিত এই দেশগুলোর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ছবি, ভিডিও বা ল্যান্ডস্কেপ ড্রোন ফুটেজ শেয়ার করেন, তাদের একটি তালিকা তৈরি করে হ্যাকার ও সাইবার এজেন্টরা।
২. নকল পরিচয়ে যোগাযোগ: এরপর চক্রের সদস্যরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুয়া প্রোফাইল তৈরি করে। নিজেদের তারা সংশ্লিষ্ট দেশের (যেমন: থাইল্যান্ড বা নেপালের) কোনো প্রতিষ্ঠিত ট্যুর অপারেটর, ট্রাভেল এজেন্সি বা ল্যান্ডস্কেপ ম্যাগাজিনের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দেয়।
৩. আস্থার সম্পর্ক ও অগ্রিম পেমেন্ট: ইনবক্সে যোগাযোগ করে তারা টার্গেটের কাজের ভূয়সী প্রশংসা করে এবং কিছু সাধারণ পর্যটন এলাকার ছবি বা ড্রোন ফুটেজ কেনার প্রস্তাব দেয়। এখানে মূল চালটি হলো—বাজারমূল্যের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি টাকা অফার করা হয় এবং কাজ জমা দেওয়ার আগেই প্রায় অর্ধেক টাকা অগ্রিম (Advance) পাঠিয়ে টার্গেটের মনে শতভাগ বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করা হয়।

🛑 দ্বিতীয় ধাপ: মূল ফাঁদ ও ‘স্পর্শকাতর’ অ্যাসাইনমেন্ট
একবার আর্থিক লেনদেন এবং বিশ্বাস নিশ্চিত হয়ে গেলে, এজেন্টরা তাদের আসল রূপ ধারণ করে। তখন তারা সাধারণ পর্যটন এলাকা বাদ দিয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু ‘সংরক্ষিত’ বা ‘রেড জোন’ এলাকার ফুটেজ দাবি করতে শুরু করে।
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, তাদের প্রধান লক্ষ্যবস্তুগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- চীন: বেইজিং শহরের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক এলাকা এবং সংবেদনশীল চীন-তিব্বত সীমান্ত।
- পাকিস্তান: রাজধানী ইসলামাবাদের অতি-সুরক্ষিত ‘রেড জোন’ এলাকা।
- থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম: থাইল্যান্ড-মিয়ানমার সীমান্ত এলাকা, সংবেদনশীল সামরিক ঘাঁটির চারপাশ, নির্মাণাধীন গভীর সমুদ্রবন্দর এবং আন্তর্জাতিক ট্রেন স্টেশন।
একজন সাধারণ শিক্ষার্থী বা ফটোগ্রাফার একে কেবলই “অধিক মূল্যের একটি অ্যাসাইনমেন্ট” মনে করে ড্রোন উড়িয়ে বা ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলতে যান। কিন্তু তারা বুঝতেও পারেন না যে, তারা সরাসরি রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা আইন বা এসপিওনাজ (Espionage) আইন লঙ্ঘন করছেন।
⚖️ নেপথ্যের পরিণতি: চীনা জেলে ৪ মাস নিখোঁজ ও মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকি
এই ভয়ঙ্কর চক্রান্তের শিকার হয়ে ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকজন বাংলাদেশী নাগরিক বিদেশের মাটিতে আটক হয়েছেন। জানা গেছে, সম্প্রতি চীনে ২ জন বাংলাদেশী ছাত্র এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আরও দুটি দেশে অন্তত একজন করে বাংলাদেশী নাগরিককে স্পর্শকাতর স্থাপনার ছবি তোলার সময় দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী হাতেনাতে গ্রেপ্তার করেছে।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক ঘটনাটি ঘটেছে নেপাল-তিব্বত সীমান্তে। সেখানে ছবি এবং ড্রোন ফুটেজ ধারণের সময় আটক হওয়া দুই বাংলাদেশী ছাত্রের খোঁজ পরিবার কিংবা দূতাবাস প্রায় চার মাস ধরে পায়নি। পরবর্তীতে জানা যায়, গত ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে তারা চীনের একটি বিশেষ কারাগারে আটক রয়েছেন।
আইনি বিশ্লেষণ: চীনের জাতীয় নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা রক্ষা আইন অত্যন্ত কঠোর। দেশটির দণ্ডবিধি অনুযায়ী, বিদেশী রাষ্ট্রের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি বা জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার অপরাধ প্রমাণিত হলে অপরাধীর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড থেকে শুরু করে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। আইনি জটিলতার কারণে এই তরুণদের কনস্যুলার সহায়তা দেওয়াও প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
🌍 ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ: কেন বাংলাদেশীদের ব্যবহার করা হচ্ছে?
আল জাজিরার প্রখ্যাত অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়েরের বিশ্লেষণ এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রক্সি-স্পাইংয়ের পেছনে রয়েছে গভীর কূটনৈতিক দুরভিসন্ধি।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের ইউনান প্রদেশসহ বিভিন্ন অঞ্চলে পর্যটন, চিকিৎসা, উচ্চশিক্ষা এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বাড়াতে বাংলাদেশীদের জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধা ও ভিসা সহজ করা হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের সাথেও বাংলাদেশের সম্পর্ক এখন বেশ সুসংহত।
পার্শ্ববর্তী দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বাংলাদেশী নাগরিকদের এই সহজ যাতায়াত ও গ্রহণযোগ্যতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো—চীন, পাকিস্তান বা থাইল্যান্ডের নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে বাংলাদেশীদের ‘নিরাপত্তা হুমকি’ (Security Threat) হিসেবে উপস্থাপন করা। এর ফলে দেশগুলোর মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি ঘটবে, ভিসা নীতি কঠোর হবে এবং বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বন্ধুহীন হয়ে পুনরায় নির্দিষ্ট একটি অক্ষের ওপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য হবে।
📋 কাউন্টার টেররিজম ও সাইবার বিশেষজ্ঞদের জরুরি পরামর্শ
বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশী শিক্ষার্থী, পেশাদার ফটোগ্রাফার এবং পর্যটকদের জন্য এই মুহূর্তে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা বাধ্যতামূলক। বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন:
| ক্ষেত্র | করণীয় | নিষিদ্ধ |
|---|---|---|
| ক্লায়েন্ট ভেরিফিকেশন | ইনবক্সে কাজ দেওয়ার পর প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স, পোর্টফোলিও এবং ফিজিক্যাল অ্যাড্রেস যাচাই করুন। | কেবল অগ্রিম টাকা দেখেই অপরিচিত কারও অ্যাসাইনমেন্ট নেওয়া যাবে না। |
| ড্রোন অপারেশন | যেকোনো দেশে ড্রোন ওড়ানোর আগে স্থানীয় সিভিল এভিয়েশনের লিখিত অনুমতি নিন। | বিমানবন্দর, সীমান্ত, সামরিক এলাকা ও সরকারি ভবনের পাশে ড্রোন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। |
| তথ্য শেয়ারিং | নিজের ট্রাভেল রুট এবং লাইভ লোকেশন গ্রুপগুলোতে শেয়ার করার ক্ষেত্রে গোপনীয়তা রাখুন। | “আমার কাজের জন্য মোটা অঙ্কের অফার পেয়েছি”—এমন তথ্য বা পেমেন্ট স্ক্রিনশট পাবলিকলি শেয়ার করা যাবে না। |
অর্থের লোভ বা না বুঝে করা একটি ভুল পদক্ষেপ কেবল আপনার নিজের জীবন ও সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ারই ধ্বংস করবে না, বরং বিদেশের মাটিতে লাল-সবুজের পাসপোর্টের মর্যাদা এবং সামগ্রিক জাতীয় নিরাপত্তাকে বড় ধরণের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেবে। সত্যতা যাচাই না করে কোনো বিদেশি এজেন্টের কাজ করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকুন।
তথ্যসূত্র ও মূল প্রতিবেদন তৈরিতে:
জুলকারনাইন সায়ের, অনুসন্ধানী সাংবাদিক, আল জাজিরা।



