মালয়েশীয় পর্যটকের অভিযোগে তদন্ত; অভিযুক্তের দাবি ‘ভুল বোঝাবুঝি’, এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি অভিযোগ
কাঠমান্ডু/পোখারা | ১০ জুন ২০২৬
নেপালে এক মালয়েশীয় নারী পর্যটকের ব্যক্তিগত মুহূর্ত গোপনে ধারণের অভিযোগে বাংলাদেশি পর্বতারোহী ও ট্রেকিং সংগঠক তৌফিক আহমেদ তমালকে আটক করেছে নেপাল পুলিশ। অভিযোগের ভিত্তিতে তার মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে এবং কাস্কি জেলা পুলিশের তত্ত্বাবধানে তদন্ত চলছে।
তবে অভিযোগগুলো এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি। নেপালের তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত তমালকে আইনগতভাবে অভিযুক্ত ব্যক্তি হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
ট্রেকিং রুটের একটি হোটেলে ঘটনার অভিযোগ
অভিযোগকারী মালয়েশিয়ার নাগরিক নুরধিয়া ইজিয়ান বিনতি মোহদ রাদজা। তার দায়ের করা অভিযোগে বলা হয়েছে, নেপালের কাস্কি জেলার মচ্ছাপুচ্ছ্রে গ্রামীণ পৌরসভা এলাকার একটি হোটেলে অবস্থানকালে গোসলের সময় তার অনুমতি ছাড়া গোপনে ছবি ও ভিডিও ধারণ করা হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, গত ৩ জুন স্থানীয় সময় সন্ধ্যা সাড়ে ৫টার দিকে ঘটনাটি ঘটে। বিষয়টি টের পাওয়ার পর তিনি অভিযুক্তকে চ্যালেঞ্জ করেন এবং পরবর্তীতে পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করেন।
অভিযোগকারী দাবি করেছেন, অভিযুক্তের মোবাইল ফোনে তার ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও দেখতে পেয়েছিলেন। এছাড়া এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে অভিযুক্ত তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং আক্রমণাত্মক আচরণ করেন বলেও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
নেপালের আইনে মামলা
নেপালের ‘ন্যাশনাল পেনাল কোড অ্যাক্ট ২০১৭’-এর গোপনীয়তা ও ব্যক্তিগত মর্যাদা সংক্রান্ত ধারার আওতায় অভিযোগটি দায়ের করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে তদন্তের স্বার্থে হেফাজতে রাখা এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, অভিযোগকারীর অনুরোধে অভিযুক্তের মোবাইল ফোনে থাকা সম্ভাব্য ভিডিও ও ছবি আলামত হিসেবে পরীক্ষা করা হচ্ছে।
পুলিশ কী বলছে
পোখারার কাস্কি জেলা পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা নিশ্চিত করে যে একজন বাংলাদেশি নাগরিক তাদের হেফাজতে রয়েছেন।
তবে পুলিশ সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, তদন্ত এখনো চলমান এবং অভিযোগের পক্ষে চূড়ান্ত বা অকাট্য প্রমাণ পাওয়া গেছে—এমন কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনো দেওয়া হয়নি।
পুলিশের দাবি, ডিজিটাল আলামত, সাক্ষ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী, ঘটনার সময় সেখানে আরও কয়েকজন বাংলাদেশি ট্রেকার ও ভ্রমণকারী উপস্থিত ছিলেন।
কিছু প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি, ছবি বা ভিডিও ধারণের বিষয়টি নিয়ে ঘটনাস্থলেই তর্কাতর্কি হয়েছিল। পরে বিষয়টি সাময়িকভাবে মিটে গেছে বলে ধারণা করা হলেও পোখারায় ফিরে অভিযোগকারী আনুষ্ঠানিকভাবে থানায় মামলা করেন।
তবে এসব বর্ণনার সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অভিযুক্তের পরিচয়
তৌফিক আহমেদ তমাল বাংলাদেশের কুমিল্লার বাসিন্দা বলে জানা গেছে। তিনি ‘অলটিটিউড হান্টার বিডি মাউন্টেনিয়ারিং ক্লাব’ নামে একটি ট্রেকিং ও অ্যাডভেঞ্চারভিত্তিক ভ্রমণ প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত।
পাবলিক তথ্য অনুযায়ী, তিনি কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ থেকে হিসাববিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন এবং দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ট্রেকিং ও পর্বতারোহণ কার্যক্রমে অংশ নিয়ে আসছেন।
অভিযুক্তের বক্তব্য
গ্রেপ্তারের পর তমালের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন সহকর্মী ও নেপালি গাইডের মাধ্যমে তার অবস্থান সম্পর্কে কিছু তথ্য সামনে এসেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা দাবি করেন, তমালের ভাষ্য অনুযায়ী ঘটনাটি ‘ভুল বোঝাবুঝি’।
তাদের দাবি, তিনি হোটেল ও আশপাশের পরিবেশের ভিডিও ধারণ করছিলেন এবং অভিযোগকারী দলের সঙ্গে পূর্ববর্তী কিছু তর্ক-বিতর্কের জেরে তাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
তবে এই দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশ হাইকমিশনের অবস্থান
নেপালে বাংলাদেশের দূতাবাস সূত্র জানিয়েছে, তারা ঘটনাটি সম্পর্কে অনানুষ্ঠানিকভাবে অবগত হয়েছেন।
বাংলাদেশ হাইকমিশনের কাউন্সিলর (পলিটিক্যাল) মো. শোয়েব আবদুল্লাহ গণমাধ্যমকে বলেন, আনুষ্ঠানিকভাবে নেপাল সরকারের পক্ষ থেকে কোনো নথি বা অবহিতকরণ না পাওয়ায় এখন পর্যন্ত কূটনৈতিকভাবে হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি হয়নি।
সামাজিক মাধ্যমে অতীত অভিযোগ
ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকজন বাংলাদেশি নারী ট্রেকার অতীত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তমালের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ তুলেছেন।
তবে এসব অভিযোগের কোনোটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি এবং বর্তমানে চলমান মামলার সঙ্গে সেগুলোর প্রত্যক্ষ সম্পর্কও প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
পর্যটন নিরাপত্তা নিয়ে নতুন আলোচনা
ঘটনাটি নেপালের পর্যটন ও ট্রেকিং মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যটকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, ট্রেকিং গ্রুপে আচরণবিধি এবং ডিজিটাল গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়গুলো আবারও সামনে এসেছে।
তবে পর্যটন সংশ্লিষ্ট কোনো সরকারি সংস্থা এখন পর্যন্ত বাংলাদেশি পর্যটকদের বিরুদ্ধে কোনো নিষেধাজ্ঞা বা বিশেষ বিধিনিষেধ আরোপের ঘোষণা দেয়নি।
তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়
বর্তমানে মামলাটি তদন্তাধীন। অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত উভয় পক্ষের বক্তব্য, ডিজিটাল আলামত এবং পুলিশের তদন্তের ভিত্তিতেই পরবর্তী আইনি সিদ্ধান্ত নির্ধারিত হবে।
ফলে অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার এখতিয়ার নেপালের সংশ্লিষ্ট আদালতের।
তথ্যসূত্র: অভিযোগপত্র, নেপাল পুলিশ সূত্র, বাংলাদেশ হাইকমিশনের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট পক্ষের সাক্ষাৎকার এবং প্রকাশিত প্রতিবেদন। :::




