খুলনা শিপইয়ার্ড সড়ক প্রকল্প ফেরত; অস্বাভাবিক ব্যয় সংকোচন ও অভিন্ন রেট সিডিউল প্রণয়নের তাগিদ
অর্থনৈতিক প্রতিবেদক, ঢাকা: ০৯ জুন ২০২৬
উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বারবার মেয়াদ বৃদ্ধি এবং অহেতুক ব্যয় বাড়ানোর সংস্কৃতিতে তীব্র ক্ষোভ ও বিরক্তি প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী এবং একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমান। যেসব কর্মকর্তার অবহেলা বা গাফিলতির কারণে প্রকল্পের গতি মন্থর হচ্ছে এবং জনগণের করের টাকার অপচয় হচ্ছে, তাদের সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে দ্রুত শাস্তির আওতায় আনার কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার (৯ জুন) বাংলাদেশ সচিবালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) চতুর্থ সভায় তিনি এই সুশাসন ও জবাবদিহিতার নতুন বার্তা দেন। সভায় মোট ৩,৮৯০ কোটি ৯৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ১০টি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প অনুমোদন করা হলেও ধোঁয়াশা ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে একটি বড় প্রকল্প সরাসরি ফেরত দেওয়া হয়েছে।
📊 এক নজরে একনেক (০৯ জুন ২০২৬)
| সূচক ও বিবরণ | আর্থিক খতিয়ান |
| অনুমোদিত মোট প্রকল্প | ১০টি (এবং অবগতির জন্য ৬টি ছোট প্রকল্প) |
| মোট প্রাক্কলিত ব্যয় | ৳৩,৮৯০ কোটি ৯৭ লাখ টাকা |
| সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন (GoB) | ৳৩,৮১০ কোটি ৬২ লাখ টাকা |
| সংস্থার নিজস্ব তহবিল | ৳৮০ কোটি ৩৫ লাখ টাকা |
| প্রত্যাখ্যাত/ফেরতকৃত প্রকল্প | ১টি (খুলনা শিপইয়ার্ড সড়ক প্রকল্প, ৩য় সংশোধন) |
⚡ দ্রুত পরিপ্রেক্ষিত
- 🟢 বৃহত্তম অনুমোদন: আনোয়ারা-বাঁশখালী-চকরিয়া (ঈদমনি) আঞ্চলিক মহাসড়ক উন্নয়ন।
- 🔴 কঠোরতম সিদ্ধান্ত: খুলনা শিপইয়ার্ড সড়ক প্রকল্প ফিরিয়ে দিয়ে দায়ীদের বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ।
- 🔵 নীতিগত সংস্কার: এলজিইডি ও পিডব্লিউডিসহ সব বিভাগের জন্য অভিন্ন ‘রেট সিডিউল’ তৈরির নির্দেশ।
- 🟣 সামাজিক সুরক্ষায় বড় পদক্ষেপ: দেশের সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১০১ শয্যায় উন্নীতকরণ।
📌 নীতিগত সিদ্ধান্ত ও কৌশলগত রূপরেখা
১. প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা
উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর মেয়াদ শেষের আগেই দফায় দফায় সংশোধনী এনে ব্যয় বাড়ানোর পুরোনো প্রবণতা বন্ধে প্রধানমন্ত্রী শতভাগ আপসহীন অবস্থান নিয়েছেন। একনেক সভায় তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন:
“কার কারণে বা কোন কর্মকর্তাদের গাফিলতিতে প্রজেক্টের মেয়াদ বারবার বাড়ছে, তাদের খুঁজে বের করুন। দায়ীদের চিহ্নিত করে দ্রুত শাস্তির আওতায় আনতে হবে। উন্নয়ন প্রকল্প কোনো দীর্ঘস্থায়ী অজুহাতের ক্ষেত্র হতে পারে না।”
২. দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ: খুলনা শিপইয়ার্ড প্রকল্পের প্রত্যাখ্যান
জবাবদিহিতা নিশ্চিতের প্রথম বড় দৃষ্টান্ত হিসেবে ‘খুলনা শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্প’-এর তৃতীয় সংশোধনী প্রস্তাবটি আজ একনেক সভা থেকে সরাসরি খারিজ ও ফেরত দেওয়া হয়। বারবার সময় ও অর্থ বাড়িয়েও কাজ শেষ না করায় প্রধানমন্ত্রী তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের প্রকল্প পরিচালকদের (PD) কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা পাঠানো হলো—যেকোনো প্রকল্প এখন থেকে বিনা প্রশ্নে আর ছাড় পাবে না।
৩. অভিন্ন রেট সিডিউল: অনিয়ম রোধের হাতিয়ার
বর্তমানে এলজিইডি (LGED), পিডব্লিউডি (PWD) সহ সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন বিভাগের কাজের মূল্য তালিকা বা ‘রেট সিডিউল’ ভিন্ন ভিন্ন। একই ধরণের কাজের জন্য বিভাগের ভিন্নতার কারণে ব্যয়ের যে তারতম্য হয়, তা অনিয়মের সুযোগ তৈরি করে। এই প্রশাসনিক জটিলতা দূর করতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সব বিভাগের জন্য একটি একীভূত ও অভিন্ন রেট সিডিউল প্রণয়নের তাগিদ দিয়েছেন একনেক চেয়ারপারসন। এর ফলে প্রকল্প ব্যয়ে স্বচ্ছতা আসবে এবং কঠোর অডিটের মাধ্যমে ‘অস্বাভাবিক ব্যয়’ কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
🌳 পরিবেশ ও উন্নয়ন: গাছ লাগানোর নতুন নীতিমালা
অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দূরদর্শী নির্দেশনা এসেছে এবারের সভা থেকে। প্রধানমন্ত্রী মহাসড়কের সৌন্দর্য ও সুরক্ষার কথা স্মরণ করে বলেন, একসময় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে প্রচুর দৃষ্টিনন্দন গাছ ছিল। অথচ বর্তমানের সড়কগুলো প্রায় বৃক্ষশূন্য।
তিনি কঠোরভাবে নির্দেশ দেন যে, দেশের কোনো সড়কের পাশে যেন আর কোনোভাবেই ইউক্যালিপটাস কিংবা ইপিল-ইপিল-এর মতো মাটির গুণাগুণ নষ্টকারী ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর গাছ লাগানো না হয়। এর পরিবর্তে দেশীয় ও পরিবেশবান্ধব বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে টেকসই সবুজায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
🏥 সামাজিক অবকাঠামো: প্রান্তিক স্বাস্থ্যসেবায় মহাপরিকল্পনা
দেশের গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় আধুনিক চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে একনেক সভায় একটি যুগান্তকারী নীতিগত ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সরকার দেশের সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বর্তমানে বেশির ভাগ উপজেলায় শয্যা সংখ্যা ৫০ থেকে ১০০-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ। এই শয্যা সম্প্রসারণের ফলে:
- গ্রামীণ মানুষ নিজস্ব এলাকাতেই জরুরি চিকিৎসাসেবা পাবেন।
- জেলা সদর হাসপাতালগুলোর ওপর রোগীর অতিরিক্ত চাপ হ্রাস পাবে।
- চিকিৎসাসেবায় শহর ও গ্রামের মধ্যকার বৈষম্য অনেকটাই কমে আসবে।
📋 অনুমোদিত ১০টি প্রকল্পের খাতভিত্তিক খতিয়ান
আজকের সভায় চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া ১০টি বড় প্রকল্পের বিস্তারিত তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
- আঞ্চলিক যোগাযোগ: আনোয়ারা-বাঁশখালী-টইটং-পেকুয়া-বদরখালী-চকরিয়া (ঈদমনি) আঞ্চলিক মহাসড়ক যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ প্রকল্প (এটিই আজকের সভার বৃহত্তম প্রকল্প)।
- কৃষি ও সেচ: বরিশাল সেচ প্রকল্পের রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসন (প্রথম পর্যায়)।
- ভূমি ব্যবস্থাপনা: দেশের উপজেলাগুলোতে ‘সমন্বিত উপজেলা ভূমি কমপ্লেক্স নির্মাণ’ প্রকল্প।
- নগর উন্নয়ন: ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের নতুন ‘নগর ভবন’ নির্মাণ প্রকল্প।
- প্রশাসনিক আধুনিকায়ন: দেশের ৩৩টি জেলার সার্কিট হাউস এবং ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আধুনিক লিফট সংযোজন প্রকল্প।
- বিশেষায়িত চিকিৎসা: বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট সম্প্রসারণ প্রকল্প-২।
- প্রতিরক্ষা ও স্বাস্থ্য: ঢাকা সিএমএইচে (CMH) আধুনিক ক্যানসার সেন্টার নির্মাণ (দ্বিতীয় পর্যায়, সংশোধিত)।
- ডিজিটাল শিক্ষা: ১. মাদ্রাসা এডুকেশন ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম (MEMIS) সাপোর্ট প্রকল্প (৩য় সংশোধন)।২. দেশের ৬৫৩টি মাদ্রাসায় মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন প্রকল্প (৩য় সংশোধন)।
- জ্বালানি অবকাঠামো: বিদ্যমান গ্রিড উপকেন্দ্র ও সঞ্চালন লাইনের ক্ষমতাবর্ধন প্রকল্প (প্রথম সংশোধন)।
স্মার্ট নোট: এছাড়া ৫০ কোটি টাকার কম ব্যয়ের আরও ৬টি প্রকল্প (পৌরসভার পানি সরবরাহ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কর্মসূচি ইত্যাদি) একনেক কমিটিকে অবগতির জন্য সভায় উপস্থাপন করা হয়।
📅 একনেক সভার টাইমলাইন ও ঘটনাক্রম
সকাল ১০:০০ ── সচিবালয়ে একনেক সভা শুরু
সকাল ১০:১৫ ── খুলনা শিপইয়ার্ড সড়ক প্রকল্পের সংশোধনী উপস্থাপন
সকাল ১০:২০ ── প্রধানমন্ত্রীর ক্ষোভ প্রকাশ ও প্রকল্প সরাসরি বাতিল/ফেরত
সকাল ১০:৩০ ── পৃথক রেট সিডিউল নিয়ে অসন্তোষ; একীভূতকরণের নির্দেশ
সকাল ১১:০০ ── প্রকল্প বিলম্বের জন্য দায়ীদের খুঁজে বের করে শাস্তির নির্দেশ
সকাল ১১:৩০ ── ১০টি মেগা প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন
দুপুর ১২:৩০ ── দেশের সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ১০১ শয্যায় উন্নীতকরণের ঘোষণা
দুপুর ১২:৪৫ ── একনেক সভার সমাপ্তি ও ব্রিফিং
🔍 TODAY TV BD বিশ্লেষণ: সাফল্য বনাম চ্যালেঞ্জ
🎯 বড় অর্জনসমূহ
- জবাবদিহিতার সংস্কৃতি: প্রকল্প পরিচালকদের কেবল লক্ষ্যমাত্রা নয়, বরং সময়সীমা বেঁধে দিয়ে শাস্তির হুঁশিয়ারি আমলাতান্ত্রিক ঢিলেমি দূর করতে সাহায্য করবে।
- ব্যয় নিয়ন্ত্রণ: অভিন্ন রেট সিডিউল এবং অস্বাভাবিক ব্যয় ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অপচয় কমাবে।
- তৃণমূলমুখী উন্নয়ন: উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শয্যা বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক সড়ক উন্নয়ন সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়াবে।
⚠️ মাঠপর্যায়ের চ্যালেঞ্জ
- আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধ: দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা পৃথক রেট সিডিউল ব্যবস্থা রাতারাতি একীভূত করতে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় একটি বড় পরীক্ষা।
- নিরপেক্ষ তদন্ত: খুলনা শিপইয়ার্ডের মতো প্রকল্পে জড়িত প্রভাবশালী ব্যক্তি বা কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা কঠিন হবে।
- বাস্তবায়নের গতি: উপজেলা পর্যায়ে ১০১ শয্যার হাসপাতালগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় ডাক্তার, নার্স ও লজিস্টিকস নিশ্চিত করা আগামী বাজেটের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
⚖️ চূড়ান্ত মূল্যায়ন: ‘টার্নিং পয়েন্ট’-এর অপেক্ষায় বাংলাদেশ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে একনেকের এই সভাটি বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় একটি কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। জনগণ দীর্ঘদিন ধরে যে জবাবদিহিতা দেখতে চেয়েছিল, তার একটি শক্তিশালী সূচনা আজ দেখা গেল।
তবে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে যেকোনো সরকার বা ব্যবস্থার প্রকৃত মূল্যায়ন হয় তার ‘ঘোষণা’য় নয়, বরং ‘বাস্তবায়ন’-এ। আগামী ৬ মাসের মধ্যে যদি দোষী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং রেট সিডিউল একীকরণের কাজ সম্পন্ন হয়, তবেই এই একনেক সভা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সুশাসনের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হিসেবে গণ্য হবে।
TODAY TV BD SPECIAL REPORT আজকের চোখে আগামীর বাংলাদেশ www.todaytvbd.com




