গাজা-ইরান ইস্যুর প্রতিক্রিয়া নাকি কূটনৈতিক ব্যর্থতা? ভোটের ফল ঘিরে শুরু বিতর্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | Today TV BD
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য নির্বাচনে এক বিরল কূটনৈতিক ধাক্কার মুখে পড়েছে জার্মানি। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো দেশটি নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্যপদের নির্বাচনে পরাজিত হয়েছে।
৩ জুন নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত ভোটে পশ্চিম ইউরোপ ও অন্যান্য রাষ্ট্র (WEOG) গ্রুপের দুটি আসনের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জার্মানি, পর্তুগাল ও অস্ট্রিয়া। ভোটে পর্তুগাল পায় ১৩৪ ভোট, অস্ট্রিয়া ১৩১ ভোট এবং জার্মানি পায় ১০৪ ভোট। ফলে নির্বাচিত হয় পর্তুগাল ও অস্ট্রিয়া। জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী নির্বাচিত হতে দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন হয়। জার্মানি সেই সীমা স্পর্শ করতে পারেনি।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে মোট সদস্য ১৫টি। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন স্থায়ী সদস্য এবং ভেটো ক্ষমতার অধিকারী। বাকি ১০টি সদস্য রাষ্ট্র দুই বছরের জন্য নির্বাচিত হয়।
নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা। কারণ জার্মানি শুধু ইউরোপের বৃহত্তম অর্থনীতি নয়, বরং জাতিসংঘের অন্যতম বড় আর্থিক অবদানকারী দেশ হিসেবেও পরিচিত।
কেন হারল জার্মানি?
জার্মানির পরাজয়ের পেছনে বিভিন্ন ব্যাখ্যা সামনে আসছে।
কিছু বিশ্লেষকের মতে, গাজা যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে জার্মানির দৃঢ় ইসরায়েল-সমর্থক অবস্থান অনেক উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
মার্কিন-ইরানি বংশোদ্ভূত ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ত্রিতা পারসি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন, গাজা সংকটে ইসরায়েলের প্রতি জার্মানির অবস্থান অনেক দেশের ভোটকে প্রভাবিত করে থাকতে পারে।
তবে এটিই একমাত্র কারণ নয় বলে মনে করছেন অনেক পর্যবেক্ষক।
জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োহান ওয়াডেফুলের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে বার্লিনের কঠোর অবস্থান এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে সমর্থনও অনেক দেশের বিরূপ মনোভাব সৃষ্টি করেছে। তিনি অভিযোগ করেন, রাশিয়া পর্দার আড়ালে জার্মানির বিরুদ্ধে লবিং করেছে।
অন্যদিকে ইউরোপীয় কূটনৈতিক মহলের কিছু বিশ্লেষক বলছেন, অস্ট্রিয়ার নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি এবং পর্তুগালের আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক ভোটে সুবিধা এনে দিয়েছে।
গাজা যুদ্ধের প্রভাব কি সত্যিই ছিল?
২০২৩ সালে গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই জার্মানি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের অন্যতম দৃঢ় সমর্থক হিসেবে পরিচিত।
সমালোচকদের অভিযোগ, মানবিক বিপর্যয় ও বেসামরিক হতাহতের ঘটনায় আরও কঠোর অবস্থান না নেওয়ায় জার্মানির ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ভোট-পরিসংখ্যান বা জাতিসংঘের নথি প্রকাশিত হয়নি যা নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে যে গাজা ইস্যুই জার্মানির পরাজয়ের প্রধান কারণ।
ফলে বিষয়টি এখনো রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও কূটনৈতিক মূল্যায়নের পর্যায়েই রয়েছে।
জার্মানির জন্য কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?
জার্মানি দীর্ঘদিন ধরে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদের দাবিদার।
দেশটি মনে করে, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী কাঠামো পরিবর্তন করে নতুন শক্তিগুলোকেও প্রতিনিধিত্ব দেওয়া উচিত।
কিন্তু সর্বশেষ নির্বাচনে পরাজয় জার্মানির সেই কূটনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্য একটি প্রতীকী ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জার্মান সংবাদমাধ্যম ও বিরোধী দলগুলোও ফলাফলকে ‘কূটনৈতিক ব্যর্থতা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
নির্বাচনে যারা জিতেছে
২০২৭-২০২৮ মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হয়েছে—
- অস্ট্রিয়া
- পর্তুগাল
- কিরগিজস্তান
- ত্রিনিদাদ ও টোবাগো
- জিম্বাবুয়ে
এর মধ্যে কিরগিজস্তান প্রথমবারের মতো নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নির্বাচন শুধু একটি আসন হারানোর ঘটনা নয়; বরং এটি বিশ্ব রাজনীতিতে পরিবর্তিত শক্তির ভারসাম্যেরও একটি ইঙ্গিত।
আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার বহু দেশ এখন নিজেদের স্বার্থ ও অবস্থানকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরছে। ফলে পশ্চিমা শক্তিগুলোর ঐতিহ্যগত প্রভাব আগের মতো অপ্রতিদ্বন্দ্বী থাকছে না।
তবে জার্মানির পরাজয়কে এককভাবে গাজা, ইরান বা কোনো একটি ইস্যুর ফল হিসেবে দেখার আগে আরও সতর্ক বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে।
সংক্ষেপে
- জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য নির্বাচনে প্রথমবার পরাজিত হয়েছে জার্মানি।
- পর্তুগাল ও অস্ট্রিয়া ইউরোপীয় দুই আসনে নির্বাচিত হয়েছে।
- গাজা ইস্যুতে জার্মানির অবস্থানকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন কিছু বিশ্লেষক।
- ইউক্রেন যুদ্ধ, রাশিয়ার বিরোধিতা এবং কূটনৈতিক প্রচারণাও আলোচনায় রয়েছে।
- জার্মানির পরাজয়কে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তথ্য সূত্র : এস্তোনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ডক্টর আমিনুল ইসলামের ফেসবুক কলাম অবলম্বনে



