মশা মারা শেখার সস্তা রসিকতা নাকি চট্টগ্রামে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তির কারখানা স্থাপনের সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ? রাজনৈতিক ভুল বার্তার আড়ালে চাপা পড়ে যাওয়া এক বৈজ্ঞানিক সত্যের ব্যবচ্ছেদ।
ঢাকা | ৩ জুন ২০২৬
সম্প্রতি গণমাধ্যমে ও রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি খবর বেশ চাঞ্চল্য তৈরি করেছে—‘‘মশা মারা শিখতে যুক্তরাষ্ট্র যেতে চান চট্টগ্রামের মেয়র, প্রধানমন্ত্রীর ‘না’।’’ এই সিদ্ধান্ত এবং এর পরবর্তী সময়ে দলীয় শীর্ষ নেতৃত্ব ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে যেভাবে সমালোচনা ও ট্রল করা হচ্ছে, তার নেপথ্যে রয়েছে একটি চরম ‘ব্রিফিং বিপর্যয়’। আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা, কীটতত্ত্ববিদদের তথ্য এবং আমন্ত্রণের মূল নথি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চট্টগ্রামের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের এই সফর কোনো রাষ্ট্রীয় প্রমোদভ্রমণ বা ‘মশা মারা শেখার’ প্রাথমিক কোর্স ছিল না; বরং এটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং পরিবেশবান্ধব এক প্রযুক্তির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সফর।
দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে দেওয়া ভুল বা উদ্দেশ্যমূলক ব্রিফিংয়ের কারণে কীভাবে একটি দূরদর্শী পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ রাজনৈতিক গোলকধাঁধায় হারিয়ে গেল, তার একটি বিশেষ অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন নিচে তুলে ধরা হলো।
ভ্যালেন্ট বায়োসায়েন্সেস (Valent BioSciences): আমন্ত্রণের নেপথ্যে কে?
ডা. শাহাদাত হোসেনকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয়ভিত্তিক বিশ্বখ্যাত পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ভ্যালেন্ট বায়োসায়েন্সেস তাদের নিজস্ব ল্যাব এবং ফ্লোরিডার উৎপাদন কারখানা পরিদর্শনের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সফরের সমস্ত খরচ (বিমান ভাড়া ও আবাসনসহ) ভ্যালেন্ট বায়োসায়েন্সেস নিজেই বহন করার প্রস্তাব দেয়, যা বাংলাদেশ সরকারের বা চসিকের কোষাগার থেকে এক টাকাও ব্যয়ের সুযোগ রাখেনি।

কেন এই কোম্পানিটি মশক নিধনে বিশ্বসেরা?
- জৈবিক লার্ভিসাইড (VectoBac): এদের মূল পণ্য হলো ‘ভেক্টোব্যাক’। এটি কোনো রাসায়নিক বিষ নয়, বরং একটি প্রাকৃতিক ব্যাকটেরিয়া—Bacillus thuringiensis israelensis (Bti) থেকে তৈরি জৈবিক উপাদান।
- ডব্লিউএএলএস (WALS) পদ্ধতি: তাদের রয়েছে নিজস্ব স্প্রে-পদ্ধতি ‘ওয়াইড এরিয়া লার্ভিসাইড স্প্রে’। এটি এমন এক মাইক্রো-ড্রপলেট প্রযুক্তি, যা এডিস মশার লুকানো ও ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রজনন ক্ষেত্রে (যেমন: গাছের কোটর, টায়ার বা ছাদে জমে থাকা অল্প পানি) নিখুঁতভাবে পৌঁছাতে পারে।
আমেরিকার জিকা জয়ের ইতিহাস: ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার মিয়ামি-ডেড এলাকায় যখন প্রথম স্থানীয়ভাবে ‘জিকা’ ভাইরাসের সংক্রমণ মহামারি রূপ নেয়, তখন এই ভেক্টোব্যাক ও ডব্লিউএএলএস (WALS) প্রযুক্তির মাধ্যমে মার্কিন প্রশাসন সফলভাবে মশার প্রজনন চক্র ভেঙে দেয়। এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্য ২০১৭ সালে কোম্পানিটি মর্যাদাপূর্ণ ‘শিকাগো ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করে।
ঐতিহ্যবাহী ‘ফগিং’ বনাম আধুনিক বায়ো-টেকনোলজি: বৈজ্ঞানিক পার্থক্য
আমাদের দেশে যুগের পর যুগ ধরে সন্ধ্যায় যে ‘ফগিং’ বা ধোঁয়া ছিটানো হয়, আধুনিক কীটতত্ত্বের চোখে তা অত্যন্ত অকার্যকর এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।
| বিষয়ের ধরণ | চিরাচরিত ফগিং পদ্ধতি | ভ্যালেন্ট বায়োসায়েন্সেসের (Bti) পদ্ধতি |
| টার্গেট | উড়ন্ত বা পূর্ণাঙ্গ মশা। | মশার লার্ভা বা ডিম্বাণু (উৎস ধ্বংস)। |
| কার্যকারিতা | এডিস মশা দিনের বেলা সক্রিয় থাকে, অথচ ফগিং করা হয় সন্ধ্যায়। ফলে এডিস মশা আড়ালেই থেকে যায়। | দিনে বা রাতে যেকোনো সময় লার্ভা থাকা অবস্থায় সুনির্দিষ্টভাবে ধ্বংস করে। |
| পরিবেশগত প্রভাব | ফগিংয়ের বিষাক্ত ধোঁয়ায় উপকারী মৌমাছি, প্রজাপতি ও পরাগায়নকারী কীট-পতঙ্গ মারা যায়। | এটি সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব এবং নির্দিষ্ট জিনগত বৈশিষ্ট্যের কারণে কেবল মশার লার্ভাই মরে, অন্য কোনো প্রাণীর ক্ষতি হয় না। |
চট্টগ্রাম প্রেক্ষাপট: ডা. শাহাদাতের পরিকল্পনা ও দূরদর্শিতা
একজন চিকিৎসক হিসেবে ডা. শাহাদাত হোসেন মশক নিধনের এই চিকিৎসাবিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত দিকটি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন পরীক্ষামূলকভাবে এই ‘বিটিআই’ (Bti) লার্ভিসাইড ব্যবহার শুরু করে। যেহেতু এই জৈবিক পদ্ধতিটি মশার বংশবৃদ্ধি ক্রমান্বয়ে রোধ করে, তাই এর পূর্ণাঙ্গ ফলাফল পেতে কয়েক মাস বা এক বছর সময় লাগা স্বাভাবিক।
ফ্লোরিডা সফরের আসল উদ্দেশ্য কী ছিল?
মেয়রের লক্ষ্য কেবল ওষুধ আমদানি করা ছিল না। তিনি চেয়েছিলেন ভ্যালেন্ট বায়োসায়েন্সেস যেন বাংলাদেশে (বিশেষ করে চট্টগ্রামে) তাদের একটি উৎপাদন কারখানা বা ফ্যাক্টরি স্থাপন করে।
- প্রস্তাবের লাভ: বাংলাদেশে ফ্যাক্টরি হলে অত্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্যে এই বিশ্বমানের প্রযুক্তি পাওয়া যেত।
- কর্মসংস্থান: স্থানীয় পর্যায়ে শত শত যুবকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতো।
- রপ্তানি সম্ভাবনা: দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশেও এই ওষুধ রপ্তানি করার পথ সুগম হতো।
এই ফ্যাক্টরি স্থাপনের প্রাথমিক সাম্ভব্যতা যাচাই (Feasibility Study), ল্যাব টেস্টের কার্যকারিতা সরাসরি পর্যবেক্ষণ এবং তাদের বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করতেই ভ্যালেন্ট বায়োসায়েন্সেস নিজ খরচে এই প্রতিনিধি দলকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল।
‘ব্রিফিং বিপর্যয়’: রাজনৈতিক কুরবানি ও প্রশাসনিক অনাস্থা
বাস্তবতা যখন এতখানি সুদূরপ্রসারী, তখন দলীয় শীর্ষ নেতৃত্ব ও নীতিনির্ধারকদের কাছে বিষয়টিকে উপস্থাপন করা হলো অত্যন্ত সস্তা ও হাস্যকরভাবে—যেন মেয়রেরা ‘মশা কীভাবে মারতে হয়’ তা শিখতে ফ্লোরিডার সমুদ্রসৈকতে যাচ্ছেন!
প্রশাসনিক ক্ষতি বিশ্লেষণ:
রাজনৈতিকভাবে বাহবা পাওয়ার জন্য বা ‘জনগণের টাকা বাঁচানোর’ একটি সস্তা ন্যারেটিভ তৈরি করতে গিয়ে দল তার নিজের একজন যোগ্য ও দূরদর্শী জনপ্রতিনিধির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করল। এর ফলে আন্তর্জাতিক একটি বড় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান (Valent BioSciences) বাংলাদেশ সম্পর্কে একটি নেতিবাচক বার্তা পেল, যা ভবিষ্যতে দেশের পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আসার পথকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
📌 সংক্ষেপে ও পর্যালোচনায়
- ভুল তথ্য: মেয়রেরা জনগণের টাকায় মশা মারা শিখতে ফ্লোরিডা যাচ্ছিলেন।
- সঠিক তথ্য: বহুজাতিক কোম্পানির নিজস্ব অর্থায়নে, চট্টগ্রামে মশার ওষুধের আন্তর্জাতিক ফ্যাক্টরি স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য ল্যাব ও কারখানা পরিদর্শনে যাচ্ছিলেন।
- পরাজয় কার?: সাময়িকভাবে এটিকে মেয়রের ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ মনে হলেও, দীর্ঘমেয়াদে এটি চট্টগ্রামের মশক নিধন আন্দোলন এবং দেশের প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের জন্য একটি বড় ধাক্কা বা বিপর্যয়।
নেতৃত্বকে ভুল ব্রিফিং দিয়ে নিজেদের দলের লোকদেরই এভাবে জনসমক্ষে হাস্যরসের পাত্র বানানোর এই প্রবণতা প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতার জন্য অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।



