Homeটুডে নেশন৪০ বছর পর আবার বাংলাদেশের হাতে বিশ্বমঞ্চের হাতুড়ি

৪০ বছর পর আবার বাংলাদেশের হাতে বিশ্বমঞ্চের হাতুড়ি

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত খলিলুর রহমান: বাংলাদেশের কূটনীতির নতুন উচ্চতা নাকি নতুন চ্যালেঞ্জের সূচনা?

বিশেষ প্রতিবেদন

চার দশক পর আবারও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের (UNGA) সভাপতির আসনে বসতে যাচ্ছে বাংলাদেশের একজন প্রতিনিধি। ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশের কূটনীতিক ও রাজনীতিবিদ হুমায়ুন রশিদ চৌধুরীর পর এবার সেই মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্ব পেলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।

নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সাইপ্রাসের প্রার্থী আন্দ্রেয়াস এস. কাকোরিসকে ৯৯-৯১ ভোটে পরাজিত করে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। ভোটের ব্যবধান মাত্র আট হলেও এর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক তাৎপর্য অনেক বড়।

প্রশ্ন হচ্ছে—এই জয় কি শুধু একজন কূটনীতিকের ব্যক্তিগত অর্জন, নাকি এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের নতুন অবস্থানের প্রতিফলন?

কেন গুরুত্বপূর্ণ এই নির্বাচন?

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদটি মূলত বিশ্বের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বহুপক্ষীয় প্ল্যাটফর্ম পরিচালনার দায়িত্ব।

যদিও এই পদে সরাসরি নির্বাহী ক্ষমতা নেই, তবে বৈশ্বিক আলোচনার এজেন্ডা নির্ধারণ, আন্তর্জাতিক সংকট নিয়ে আলোচনার নেতৃত্ব এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে সভাপতির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ব বর্তমানে একাধিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে—

  • ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
  • মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা
  • জলবায়ু পরিবর্তন
  • বৈশ্বিক ঋণ সংকট
  • খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা
  • শরণার্থী ও অভিবাসন সমস্যা

এই বাস্তবতায় জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের নেতৃত্বে একজন বাংলাদেশির উপস্থিতি দেশের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক সুযোগ।

খলিলুর রহমান কে?

খলিলুর রহমানের পরিচয় কেবল একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়।

তিনি দীর্ঘদিন জাতিসংঘ ব্যবস্থার ভেতরে কাজ করেছেন। জেনেভা ও নিউইয়র্কে প্রায় ২৫ বছর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় দায়িত্ব পালন করেছেন।

জাতিসংঘের নীতিনির্ধারণ, উন্নয়ন অর্থনীতি, বহুপাক্ষিক কূটনীতি এবং আন্তর্জাতিক প্রশাসনিক কাঠামো সম্পর্কে তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রয়েছে।

অনেক বিশ্লেষকের মতে, এ অভিজ্ঞতাই নির্বাচনে তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে কাজ করেছে।

৯৯ বনাম ৯১: কী বলছে ভোটের অঙ্ক?

ভোটের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিজয়টি ছিল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ।

বাংলাদেশ পেয়েছে ৯৯ ভোট, আর সাইপ্রাস পেয়েছে ৯১ ভোট।

অর্থাৎ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রায় অর্ধেক বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নিলেও উল্লেখযোগ্য একটি অংশ প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে সমর্থন করেছে।

এ থেকে বোঝা যায়, বাংলাদেশের কূটনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়লেও এখনও আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিভিন্ন বলয়ে সমর্থন বিস্তারে কাজ করার সুযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য কী সুযোগ তৈরি হলো?

১. রোহিঙ্গা সংকটকে নতুনভাবে সামনে আনার সুযোগ

বাংলাদেশ প্রায় এক দশক ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে।

সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব বাংলাদেশের হাতে থাকায় বিষয়টি নতুন করে আন্তর্জাতিক আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে।

২. জলবায়ু কূটনীতিতে নেতৃত্ব

জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ।

এই অবস্থান থেকে জলবায়ু অর্থায়ন, ক্ষতিপূরণ তহবিল এবং অভিযোজন সহায়তার বিষয়ে বাংলাদেশের কণ্ঠ আরও জোরালো হতে পারে।

৩. গ্লোবাল সাউথের প্রতিনিধিত্ব

এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থ তুলে ধরার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নতুন ভূমিকা রাখতে পারে।

সামনে কী চ্যালেঞ্জ?

এই অর্জনের পাশাপাশি কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জও রয়েছে।

প্রথমত, সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদটি নিরপেক্ষতা দাবি করে। ফলে খলিলুর রহমানকে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ এবং বৈশ্বিক নেতৃত্বের মধ্যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।

দ্বিতীয়ত, ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক মেরুকরণের সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, রাশিয়া এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখা সহজ হবে না।

তৃতীয়ত, এই অর্জনকে কেবল প্রতীকী সাফল্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব কূটনৈতিক সুবিধায় রূপান্তর করা বাংলাদেশের জন্য বড় পরীক্ষা হবে।

৪০ বছরের ব্যবধান: কী বার্তা দিচ্ছে?

১৯৮৬ সালে হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী যখন সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন, তখন বাংলাদেশ ছিল একটি নবীন উন্নয়নশীল রাষ্ট্র।

২০২৬ সালের বাংলাদেশ অর্থনীতি, জনসংখ্যা, শান্তিরক্ষা কার্যক্রম, জলবায়ু কূটনীতি এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

খলিলুর রহমানের বিজয় সেই পরিবর্তিত বাস্তবতার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবেও দেখা যেতে পারে।

উপসংহার

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়া নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক মাইলফলক।

তবে ইতিহাস বলে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পদ বা মর্যাদা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ সেই অবস্থানকে কাজে লাগানোর সক্ষমতা।

খলিলুর রহমানের সামনে এখন সেই পরীক্ষাই অপেক্ষা করছে।

বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের পতাকা আরও উঁচুতে ওড়ানোর সুযোগ যেমন তৈরি হয়েছে, তেমনি বেড়েছে প্রত্যাশা ও দায়িত্বও।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular