Homeটুডে ওয়ার্ল্ডআইনস্টাইন কেন ফিরিয়ে দিয়েছিলেন ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট পদ?

আইনস্টাইন কেন ফিরিয়ে দিয়েছিলেন ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট পদ?

১৯৫২ সালে ইসরায়েলের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ গ্রহণের প্রস্তাব পেয়েও রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দক্ষতার অভাবের কথা উল্লেখ করে তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন বিশ্বখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন

ঢাকা | ৩১ মে ২০২৬

বিশ্বখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনকে ১৯৫২ সালে ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট পদ গ্রহণের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও প্রশাসনিক দক্ষতার অভাবের কথা উল্লেখ করে তিনি বিনয়ের সঙ্গে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। সম্প্রতি প্রকাশিত এক ঐতিহাসিক পর্যালোচনায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

ইসরায়েলের প্রথম প্রেসিডেন্ট ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞানী খাইম ভাইৎসম্যানের মৃত্যুর পর দেশটির নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রয়োজন দেখা দেয়। সে সময় প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন-গুরিয়নের সরকার বিশ্বব্যাপী সম্মানিত কোনো ইহুদি ব্যক্তিত্বকে রাষ্ট্রের প্রতীকী নেতৃত্বে আনার বিষয়টি বিবেচনা করে। সেই প্রেক্ষাপটেই আইনস্টাইনের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়।

আমন্ত্রণের পটভূমি

খাইম ভাইৎসম্যান ছিলেন একজন বিশিষ্ট বায়োকেমিস্ট এবং জায়নবাদী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা। ১৯৪৯ সালে তিনি ইসরায়েলের প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৫২ সালে তাঁর মৃত্যুর পর নতুন প্রেসিডেন্ট খোঁজার উদ্যোগ নেয় সরকার।

তৎকালীন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত আব্বা ইবন আইনস্টাইনের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠান। ওই সময় আইনস্টাইন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির প্রিন্সটনে বসবাস করতেন এবং ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

চিঠিতে বলা হয়েছিল, ইসরায়েল একটি ছোট রাষ্ট্র হলেও ইহুদি জনগণের প্রাচীন ও আধুনিক বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব করে এবং আইনস্টাইনের নেতৃত্ব দেশটির মর্যাদা আরও বৃদ্ধি করতে পারে।

কেন না বলেছিলেন আইনস্টাইন?

প্রস্তাব পাওয়ার পর আইনস্টাইন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেও দায়িত্ব গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান।

জেরুজালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘আইনস্টাইন আর্কাইভ’-এ সংরক্ষিত তাঁর জবাবি চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন:

“আমি সারা জীবন বস্তুনিষ্ঠ সমস্যা নিয়ে কাজ করেছি। মানুষের সঙ্গে যথাযথভাবে আচরণ করা কিংবা প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় স্বাভাবিক দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা আমার নেই।”

তিনি আরও বলেন:

“ইসরায়েল সরকারের এই প্রস্তাবে আমি গভীরভাবে অভিভূত। কিন্তু তা গ্রহণ করতে না পারায় আমি দুঃখিত ও লজ্জিত।”

ইতিহাসবিদদের মতে, আইনস্টাইন নিজেকে একজন বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ হিসেবে দেখতেন; পেশাদার রাজনীতিক হিসেবে নয়।

বেন-গুরিয়নের উদ্বেগ

আইনস্টাইনবিষয়ক গবেষক অ্যালিস ক্যালাপ্রিসের মতে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন-গুরিয়ন আইনস্টাইনের প্রত্যাখ্যানকে ব্যক্তিগতভাবে স্বস্তির সঙ্গে গ্রহণ করেছিলেন।

কারণ, আইনস্টাইন রাজনৈতিক বিষয়ে স্বাধীনচেতা ও স্পষ্টভাষী ছিলেন। তাঁর অবস্থান অনেক সময় সরকারের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারত বলে আশঙ্কা ছিল।

ক্যালাপ্রিসের উদ্ধৃতি অনুযায়ী, বেন-গুরিয়ন এক পর্যায়ে তাঁর সহযোগীদের বলেছিলেন, আইনস্টাইন যদি প্রস্তাব গ্রহণ করতেন তাহলে সরকার জটিল পরিস্থিতিতে পড়তে পারত।

ইসরায়েল সম্পর্কে আইনস্টাইনের অবস্থান

আইনস্টাইন জায়নবাদী আন্দোলনের সমর্থক ছিলেন। তবে তিনি জাতীয়তাবাদের উগ্র রূপের বিরোধিতা করতেন এবং আরব ও ইহুদিদের সমঅধিকারের ভিত্তিতে একটি দ্বি-জাতীয় রাষ্ট্রের ধারণাকে সমর্থন করতেন।

ইতিহাসবিদদের মতে, তিনি এমন একটি রাজনৈতিক কাঠামো কল্পনা করেছিলেন যেখানে ফিলিস্তিনি আরব ও ইহুদি জনগোষ্ঠী সমান নাগরিক অধিকার ভোগ করবে।

১৯৪৮ সালে তিনি এবং আরও কয়েকজন ইহুদি বুদ্ধিজীবী নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত একটি খোলা চিঠিতে ডানপন্থী ইসরায়েলি নেতা মেনাখেম বেগিনের রাজনৈতিক আন্দোলনের কঠোর সমালোচনা করেছিলেন।

ওই চিঠিতে হারুত পার্টির রাজনৈতিক আদর্শকে ইউরোপীয় ফ্যাসিবাদী ও নাৎসি রাজনৈতিক ধারার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছিল।

আন্তর্জাতিক বৈধতার প্রশ্ন

রিও ডি জেনিরোর ফেডারেল ইউনিভার্সিটির ইতিহাসবিদ এম গেরম্যানের মতে, আইনস্টাইনকে প্রেসিডেন্ট হওয়ার আমন্ত্রণ জানানোর পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও ছিল।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সদ্য প্রতিষ্ঠিত ইসরায়েল রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা ও বৈধতা আরও শক্তিশালী করতে চেয়েছিল। বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত বিজ্ঞানীদের একজনকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে পাওয়া সেই লক্ষ্য পূরণে সহায়ক হতে পারত।

এরপর কী হয়েছিল?

আইনস্টাইন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পর ইতিহাসবিদ আইজ্যাক বেন-জেভি ইসরায়েলের দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

অন্যদিকে, যাঁকে আইনস্টাইন ও তাঁর সহস্বাক্ষরকারীরা একসময় সমালোচনা করেছিলেন, সেই মেনাখেম বেগিন পরবর্তীতে ইসরায়েলের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হন। ১৯৭৭ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রী হন এবং তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার পরবর্তীতে লিকুদ পার্টির উত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বর্তমানে লিকুদ ইসরায়েলের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও এই রাজনৈতিক ধারার প্রতিনিধিত্ব করেন।


📦 এক নজরে

  • ১৯৫২ সালে আলবার্ট আইনস্টাইনকে ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
  • তিনি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দক্ষতার অভাবের কথা উল্লেখ করে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।
  • আইনস্টাইন জায়নবাদকে সমর্থন করলেও উগ্র জাতীয়তাবাদের সমালোচক ছিলেন।
  • তিনি আরব ও ইহুদিদের সমঅধিকারের ভিত্তিতে দ্বি-জাতীয় রাষ্ট্রের ধারণার পক্ষে ছিলেন।
  • তাঁর প্রত্যাখ্যানের পর আইজ্যাক বেন-জেভি ইসরায়েলের দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট হন।

🔍 ফ্যাক্ট চেক

✅ যা নিশ্চিত

  • ১৯৫২ সালে আইনস্টাইনকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
  • তিনি লিখিতভাবে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
  • তাঁর প্রত্যাখ্যানপত্র বর্তমানে সংরক্ষিত ঐতিহাসিক নথির অংশ।

⚠ যা ইতিহাসবিদদের মূল্যায়ন

  • ইসরায়েল আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ও বৈধতা জোরদার করার উদ্দেশ্যে আইনস্টাইনকে এই পদে দেখতে চেয়েছিল।
  • বেন-গুরিয়ন আইনস্টাইনের স্বাধীন রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন।

❓ যা নিশ্চিত নয়

  • আইনস্টাইন প্রেসিডেন্ট হলে ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথ কতটা ভিন্ন হতে পারত—এ বিষয়ে কোনো ঐতিহাসিক ঐকমত্য নেই।

📌 তথ্যসূত্র

  • BBC News Bangla / BBC Brasil
  • Einstein Archives, Hebrew University of Jerusalem
  • Einstein’s Notebooks — Ze’ev Rosenkranz
  • The Einstein Encyclopedia — Alice Calaprice
  • Einstein and Twentieth-Century Politics: A Salutary Influence — Richard Crockett
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular