ময়নাতদন্ত ও ডিএনএ রিপোর্টে মূল ঘাতক সোহেল রানার সম্পৃক্ততা নিশ্চিত; ইয়াবা সেবন করে ধর্ষণের পর গলা কেটে মরদেহ খণ্ডিত করার লোমহর্ষক জবানবন্দি; ঈদের পরপরই বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচার শুরু
ঢাকা | ২৪ মে
২০২৬ রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ৮ বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে নৃশংসভাবে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় রেকর্ড ৫ দিনের মাথায় আদালতে চূড়ান্ত চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেছে পুলিশ। আজ রোববার (২৪ ২৪ মে) বেলা ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) অহিদুজ্জামান ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের নারী ও শিশু জিআর শাখায় এই চাঞ্চল্যকর মামলার চার্জশিট জমা দেন।
ডিএমপির প্রসিকিউশন বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মিয়া মোহাম্মদ আশিস বিন হাছান এবং ডিএমপির মুখপাত্র এন এম নাসিরুদ্দিন চার্জশিট দাখিলের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এই মামলায় প্রধান ঘাতক সোহেল রানা এবং তার সহযোগী স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। সরকারের বিশেষ নির্দেশনায় ক্রাইম ডাটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (CDMS) সফটওয়্যারের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে এই কারিগরি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আজই আদালতে অভিযোগ গঠনের শুনানি শুরু করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
📊 রামিসা হত্যা মামলার ক্রাইম ফাইল ও আইনি অগ্রগতি
ডিজিটাল পাঠকদের জন্য দেশ কাঁপানো এই মামলার দ্রুততম আইনি পরিক্রমা নিচে তুলে ধরা হলো:
- ১৯ মে ২০২৬ (ঘটনার দিন): পল্লবীর একটি ভবনের ৩ তলার ফ্ল্যাট থেকে শিশু রামিসার খণ্ডিত ও ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার। পরদিন ২০ মে নারায়ণগঞ্জ থেকে মূল ঘাতক সোহেল রানা ও তার স্ত্রীকে গ্রেপ্তার।
- ২৩ মে ২০২৬: সিআইডির (CID) ফরেনসিক ইউনিট এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কর্তৃক তদন্ত কর্মকর্তার কাছে চূড়ান্ত ময়নাতদন্ত ও ডিএনএ প্রোফাইলিং রিপোর্ট হস্তান্তর।
- ২৪ মে ২০২৬ (আজ বিকেল ৩:৪০): বৈজ্ঞানিক তথ্য-প্রমাণ ও আসামির ১৬৪ ধারার জবানবন্দির ভিত্তিতে আদালতে আনুষ্ঠানিক চার্জশিট দাখিল।
- আসন্ন পদক্ষেপ: স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়ের বিশেষ প্রজ্ঞাপনে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষে মামলাটি লড়বেন বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলু।
ফরেনসিক প্রতিবেদনে গা শিউরে ওঠা তথ্য ও ঘাতকের স্বীকারোক্তি
গতকাল শনিবার সিআইডির ফরেনসিক ইউনিট ও সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের দেওয়া চূড়ান্ত ডিএনএ ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে রামিসাকে হত্যার আগে নির্মম ও পাশবিক নির্যাতনের প্রমাণ মিলেছে। বৈজ্ঞানিক এই ফলাফলের সঙ্গে গত বুধবার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনায়েদের খাসকামরায় দেওয়া ঘাতক সোহেল রানার ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির হুবহু মিল পাওয়া গেছে।
জবানবন্দিতে ঘাতক সোহেল রানা স্বীকার করে যে, ঘটনার পূর্বে সে তীব্র মাত্রার ইয়াবা সেবন করে বিকৃত মানসিকতা থেকে এই কাণ্ড ঘটায়। ঘটনার লোমহর্ষক বর্ণনায় সে জানায়:
“১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রামিসা ঘর থেকে বের হলে আমার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার তাকে ফুসলিয়ে আমাদের রুমে নিয়ে আসে। এরপর বাথরুমে নিয়ে আমি তাকে ধর্ষণ করলে শিশুটি জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। ওই সময় রামিসার মা বাইরে থেকে দরজায় কড়া নাড়তে থাকলে ধরা পড়ার ভয়ে আমি ধারালো ছুরি দিয়ে রামিসাকে গলা কেটে হত্যা করি। পরে মরদেহ গুম করার উদ্দেশ্যে মাথা কেটে সম্পূর্ণ আলাদা করে বাথরুমের বালতিতে লুকিয়ে রাখি এবং দুই হাত আংশিক বিচ্ছিন্ন করে শরীর খাটের নিচে ঢুকিয়ে জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যাই।”
জবানবন্দিতে সে আরও উল্লেখ করে, ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে তাদের পূর্ব কোনো শত্রুতা ছিল না; স্রেফ মাদক সেবনের পর বিকৃত যৌন লালসা চরিতার্থ করতেই সে এই পৈশাচিক অপরাধ সংঘটিত করে।
💬 সরকার ও আইন মন্ত্রণালয়ের কঠোর অবস্থান
দেশজুড়ে ক্ষোভের আগুন জ্বালানো এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া দ্রুততম সময়ে শেষ করতে স্বয়ং আইন মন্ত্রণালয় বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন ও প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। গতকাল এক অনুষ্ঠান শেষে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সাংবাদিকদের জানান:
“আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটি শেষ হওয়ার পরপরই বিশেষ ট্রাইব্যুনালে এই মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার কাজ (নথি শুনানি ও সাক্ষ্যগ্রহণ) শুরু হবে। কোনো ধরনের আইনি দীর্ঘসূত্রতা এখানে বরদাশত করা হবে না।”
উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার রাতে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিহত রামিসার পল্লবীর বাসায় যান এবং তার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লাসহ শোকসন্তপ্ত পরিবারকে সান্ত্বনা দেন। প্রধানমন্ত্রী ময়মনসিংহের এক জনসভাতেও পুনরায় স্পষ্ট করেছেন যে, বর্তমান সরকার শিশু বা নারী নির্যাতন কোনোভাবেই মেনে নেবে না এবং আগামী এক মাসের মধ্যে ফাস্ট ট্র্যাক কোর্টের মাধ্যমে এই খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি তথা মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করা হবে।
📌 তথ্যসূত্র:
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) প্রসিকিউশন বিভাগ ও পল্লবী থানা উইং
সিআইডি (CID) ফরেনসিক ল্যাব ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ময়নাতদন্ত বিভাগ
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, আইন ও বিচার বিভাগ (বিশেষ প্রজ্ঞাপন, মে ২০২৬)
ঢাকা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (CMM) আদালত রেকর্ড ফাইল



