‘গণতন্ত্রের জন্য প্রাণ দিতে রাজি’—দাবি ভারত প্রবাসী আওয়ামী লীগ নেতার; তবে একে রাজনৈতিক চাল ও কর্মীদের চাঙ্গা করার কৌশল হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা
ঢাকা | ২৩ মে ২০২৬
গণ-অভ্যুত্থানের মুখে দেশত্যাগে বাধ্য হওয়া বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এবার মৃত্যুদণ্ডের রায় মাথায় নিয়েই দেশে ফিরতে চান। ভারতে অবস্থানরত এই নেত্রী দেশের মাটিতে ফিরে সরাসরি আদালতের মুখোমুখি হতে ইচ্ছুক বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে খবর চাঙ্গা হয়েছে।
‘টাইমস অব বাংলাদেশ’-এর বরাতে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘জি ২৪ ঘণ্টা’ জানিয়েছে, সম্প্রতি শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন এমন একজন শীর্ষ আওয়ামী লীগ নেতা এই চাঞ্চল্যকর দাবি করেছেন।
তাঁর এই প্রত্যাবর্তনের আকস্মিক ইচ্ছা প্রকাশের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা ও চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে। তবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও আইনজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, ছন্নছাড়া কর্মীদের চাঙ্গা রাখতেই এটি আওয়ামী লীগের একটি রাজনৈতিক কৌশল মাত্র।
‘গণতন্ত্রের জন্য প্রাণ দিতেও রাজি’: ট্রাভেল পাসের আবেদন সংকেত
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, শেখ হাসিনা তাঁর বর্তমান বয়স ও শারীরিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে জীবনের শেষ দিনগুলো দেশের মাটিতেই কাটাতে চান। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই আওয়ামী লীগ নেতা সংবাদমাধ্যমকে জানান, শেখ হাসিনা বলেছেন—তিনি খুব বেশি দিন হয়তো আর বাঁচবেন না, তাই দেশে ফিরে বিচারের মুখোমুখি হতে তাঁর কোনো আপত্তি নেই এবং প্রয়োজনে গণতন্ত্রের জন্য প্রাণ দিতেও তিনি রাজি।
এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে খুব শিগগিরই তিনি নয়াদিল্লিতে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনের কাছে দেশে ফেরার জন্য বিশেষ ‘ট্রাভেল পাস’ (Travel Pass) আবেদন করতে পারেন বলে জানা গেছে। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং পরবর্তীতে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার শেখ হাসিনাসহ সাবেক এমপি-মন্ত্রীদের সব ‘ডিপ্লোম্যাটিক পাসপোর্ট’ (কূটনৈতিক পাসপোর্ট) বাতিল ঘোষণা করেছিল।
⚖ শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আইনি পরিস্থিতি ও ট্রাইব্যুনাল রেকর্ড
বিগত দুই বছরে বর্তমান সরকারের আমলে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে হওয়া মামলার আইনি চিত্র নিচে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
- প্রধান রায়: আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT) কর্তৃক ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-আন্দোলনে গণহত্যা, গুলি ও হত্যার নির্দেশ এবং উসকানি দেওয়ার অপরাধে শেখ হাসিনাকে ইতিমধ্যেই মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে।
- অন্যান্য মামলা: গণহত্যা ছাড়াও বিগত ১৫ বছরের শাসনকালের গুম-খুন, ব্যাপক আর্থিক দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অবৈধ জমি কেলেঙ্কারির শত শত মামলা দেশের বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন।
- দলের বর্তমান অবস্থান: বর্তমান সরকার ইতিমধ্যেই এক নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছে। দলের অধিকাংশ শীর্ষ নেতা ও কর্মী-সমর্থক বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন অথবা দেশ ছেড়ে আত্মগোপনে আছেন।
আইনি বাধ্যবাধকতা ও সুপ্রিম কোর্টের এক্তিয়ার
শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তিনি তাঁর মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার আইনি সুযোগ পাবেন কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে:
১. প্রথম শর্ত আত্মসমর্পণ: দেশে ফেরা মাত্রই শেখ হাসিনাকে সবার আগে আদালতের কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করতে হবে। আইন অনুযায়ী তাঁকে সরাসরি কারাগারে পাঠানো হবে।
২. আপিলের সময়সীমা: ট্রাইব্যুনালের নিয়ম অনুযায়ী রায়ের পর আপিল করার সুনির্দিষ্ট সময়সীমা ইতিমধ্যেই পার হয়ে গেছে। তবে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে এই বিষয়ে চূড়ান্ত ও বিশেষ সিদ্ধান্ত নেওয়ার এক্তিয়ার থাকবে একমাত্র সুপ্রিম কোর্টের (Supreme Court)।
💬 সরকার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিভঙ্গি
গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশের নবনিযুক্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এক প্রেস ব্রিফিংয়ে সরকারের কঠোর অবস্থান স্পষ্ট করে বলেন,
“আমরা শেখ হাসিনাকে কোনো অনানুষ্ঠানিক উপায়ে নয়, বরং দ্বিপাক্ষিক আইনি প্রক্রিয়ার (Extradition Treaty) মাধ্যমেই ভারত থেকে ফেরত চাই। আমরা চাই তিনি দেশে ফিরে এ দেশের স্বাধীন আদালতের মুখোমুখি হোন এবং নিজের অপরাধের বিচার দেখুন।”
অন্যদিকে, বাংলাদেশের প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী শেখ হাসিনার এই দেশে ফেরার দাবিকে পুরোপুরি নাকচ করে দিয়ে একে ‘মুখের জোর’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন:
“ক্ষমতার শেষ ১৫ বছর শেখ হাসিনা মূলত মুখের জোরেই টিকে ছিলেন। এখনও ভারতে বসে মুখের জোরেই দেশছাড়া ও ছন্নছাড়া কর্মীদের চাঙ্গা করতে এই ধরনের গালগল্প ছড়াচ্ছেন। উনি যে স্বেচ্ছায় দেশে ফিরবেন—তার নির্ভরযোগ্য কোনো উপাদান বা রাজনৈতিক পরিবেশ আমি দেখছি না।
শেখ হাসিনা নিজে ফিরবেন কি ফিরবেন না, তা বড় কথা নয়; বরং অপরাধের চাদর ভেদ করে তাকে বন্দিবিনিময় চুক্তির আওতায় ফিরিয়ে এনে দ্রুত বিচার কার্যকর করাই হবে এই সরকারের প্রধান কাজ।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১ জুন থেকে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নতুন নীতি কার্যকর হওয়া এবং ঢাকার মাঠপর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টার মাঝেই শেখ হাসিনার এই ‘প্রত্যাবর্তন কার্ড’ দেশের রাজনীতিকে পুনরায় উত্তপ্ত বা মেরুকরণ করার একটি দূরবর্তী চাল হতে পারে।
📌 তথ্যসূত্র:
- Zee 24 Ghanta, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT) ঢাকা, আইন আর্কাইভ, বাংলাদেশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সুপ্রিম কোর্ট আইনি অনুচ্ছেদ (মে ২০২৬)



