জবানবন্দিতে ইয়াবা সেবনের পর পাশবিক নির্যাতন ও শরীর টুকরো করার লোমহর্ষক স্বীকারোক্তি ঘাতক সোহেল রানার; সহযোগী স্ত্রী স্বপ্নাও কারাগারে
ঢাকা | ২৩ মে ২০২৬
রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে ৮ বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর গলা কেটে ও দেহ ক্ষতবিক্ষত করে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করেছে পুলিশ। আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড (DNA) টেস্টের কাজ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। ল্যাবরেটরি রিপোর্টটি আজ হাতে পেলে আগামীকাল ২৪ মে (রোববার)-এর মধ্যেই আদালতে এই মামলার চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন বা চার্জশিট (Charge Sheet) দাখিল করা হবে।
আজ শনিবার (২৩ মে) দুপুরে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) অহিদুজ্জামান গণমাধ্যমকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, প্রযুক্তির সহায়তায় ডিএনএ টেস্টের কাজ দ্রুত শেষ করা হয়েছে এবং রোববারের মধ্যেই আদালতে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন।
আদালতে ঘাতক সোহেল রানার লোমহর্ষক স্বীকারোক্তি
এর আগে গত বুধবার (২০ মে) মামলার প্রধান আসামি মো. সোহেল রানা (৩০) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদের আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় নিজের অপরাধ স্বীকার করে অত্যন্ত লোমহর্ষক ও বিকৃত জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দি রেকর্ড শেষে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
আসামির জবানবন্দি ও পুলিশি তদন্তে উঠে আসা ঘটনার বিবরণ:
- ইয়াবা সেবন ও অপহরণ: গত ১৯ মে (মঙ্গলবার) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসা ঘর থেকে বের হলে সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার (আরেক আসামি) তাকে কৌশলে নিজেদের ফ্ল্যাটের ভেতরে ডেকে নেয়। ঘটনার আগে ঘাতক সোহেল তীব্র মাত্রার ইয়াবা সেবন করেছিল।
- ধর্ষণ ও হত্যা: ঘরের ভেতর নেওয়ার পর সোহেল শিশুটিকে বাথরুমে আটকে রেখে পাশবিকভাবে ধর্ষণ করে। নির্যাতনের তীব্রতায় শিশুটি জ্ঞান হারিয়ে ফেললে, ঠিক সেই মুহূর্তে রামিসার মা বাইরে থেকে দরজায় কড়া নাড়তে থাকেন। ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে সোহেল ধারালো ছুরি দিয়ে রামিসাকে গলা কেটে হত্যা করে।
- লাশ গুমের বীভৎস চেষ্টা: মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর মরদেহ গুম করার উদ্দেশ্যে সোহেল রানা ধারালো ছুরি দিয়ে রামিসার মাথা কেটে ধড় থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে শয়নকক্ষের একটি বালতিতে লুকিয়ে রাখে। এরপর তার দুই হাত কাঁধ থেকে আংশিক বিচ্ছিন্ন করে এবং ছুরি দিয়ে যৌনাঙ্গ ক্ষতবিক্ষত করে লাশটি খাটের নিচে ঠেলে দেয়। অপরাধ সংঘটনের পুরো সময় তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার একই রুমে উপস্থিত ছিলেন। পরবর্তীতে জানালার গ্রিল কেটে সোহেল রানা পালিয়ে যায়।
যেভাবে উদঘাটিত হলো হত্যাকাণ্ড
১৯ মে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য তার মা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে ভবনের অন্য একটি ফ্ল্যাটের (আসামির রুম) সামনে শিশুটির জুতা জোড়া দেখতে পান তিনি। অনেক ডাকাডাকির পরও ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে রামিসার বাবা-মা এবং ভবনের অন্যান্য প্রতিবেশীরা মিলে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন।
কক্ষে প্রবেশ করতেই মেঝেতে রামিসার মস্তকবিহীন রক্তাপ্লুত দেহ এবং ঘরের ভেতরের একটি বড় বালতিতে তার বিচ্ছিন্ন মাথা দেখতে পান তারা। এ সময় ঘরের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে তারা আটকে রাখেন এবং জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল দেন। পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে এসে স্বপ্নাকে হেফাজতে নেয় এবং তথ্যপ্রযুক্তির ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে ওই দিনই নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুল্লা থানার সামনে থেকে মূল ঘাতক সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।
📊 মামলার ডায়েরি ও কুইক ফ্যাক্টস
- ভিকটিম: রামিসা আক্তার (০৮), দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী, পপুলার মডেল হাই স্কুল।
- ঘটনার তারিখ ও স্থান: ১৯ মে ২০২৬; ফ্ল্যাট বাসা, পল্লবী, মিরপুর, ঢাকা।
- গ্রেপ্তারকৃত আসামি: মো. সোহেল রানা (৩০) ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার।
- মামলা দায়ের: ২০ মে ২০২৬ তারিখে ভিকটিমের বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় মামলা করেন।
- বর্তমান অগ্রগতি (২৩ মে ২০২৬): ডিএনএ টেস্ট সম্পন্ন; ২৪ মে (রোববার) আদালতে চার্জশিট দাখিলের চূড়ান্ত সম্ভাবনা।
নেশায় বুঁদ হয়ে বিকৃত কাম লালসা চরিতার্থ করতে গিয়ে এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটানোর কথা স্বীকার করে আসামি জানায়, ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে তাদের পূর্ব শত্রুতা ছিল না। পল্লবী থানা পুলিশ জানিয়েছে, কোনো ধরনের আইনি ফাঁকফোকর ছাড়াই যাতে ঘাতক দম্পতির সর্বোচ্চ শাস্তি (মৃত্যুদণ্ড) নিশ্চিত করা যায়, সেভাবেই অকাট্য ডিএনএ প্রমাণ ও স্বীকারোক্তিসহ চার্জশিটটি সাজানো হয়েছে।
📌 তথ্যসূত্র:- ঢাকা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (CMM) আদালত রেকর্ড (মে ২০২৬)
- ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) ও পল্লবী থানা মামলার ডায়েরি
- জাতীয় জরুরি সেবা (৯৯৯) কন্ট্রোল রুম স্টেটমেন্ট



