“আমি চাই না কেউ স্বাধীন হয়ে যাক”— ফক্স নিউজে ট্রাম্পের এমন মন্তব্যের পর তাইপে জানাল, তারা আগে থেকেই সার্বভৌম; নতুন করে ঘোষণার কিছু নেই।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ১৭ মে ২০২৬ বেইজিংয়ের ‘গ্রেট হল অব দ্য পিপল’-এ চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সাথে দুই দিনের হাই-স্টেক দ্বিপাক্ষিক সম্মেলন শেষ করেই তাইওয়ান ইস্যুতে এক বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফক্স নিউজের ‘স্পেশাল রিপোর্ট উইথ ব্রেট বেইয়ার’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প তাইওয়ানকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা না করার বিষয়ে সরাসরি সতর্কবার্তা দিয়েছেন। ট্রাম্পের এই মন্তব্যের কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তাইওয়ান। এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে তাইপের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জোর দিয়ে বলেছে যে, তাইওয়ান একটি ‘সারভৌম ও স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ এবং এটি কোনোভাবেই গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের অধীনস্থ নয়।
“যুদ্ধ করতে সাড়ে ৯ হাজার মাইল পাড়ি দিতে চাই না”
সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক জড়তি কমানোর ইঙ্গিত দিয়ে বলেন:
“আমি চাই না কেউ স্বাধীন হয়ে যাক। আর আপনারা তো জানেনই, একটি যুদ্ধ করার জন্য আমাদের সাড়ে ৯ হাজার মাইল (১৫,২৮৯ কিমি) পথ পাড়ি দিতে হবে। আমি এমনটা চাই না। আমি চাই তারা শান্ত হোক। আমি চাই চীনও শান্ত থাকুক। আমরা যুদ্ধ চাই না। এখন যে অবস্থা (Status Quo) আছে, সেটা সেভাবেই রেখে দিলে আমার মনে হয় চীনেরও কোনো আপত্তি থাকবে না।”
ট্রাম্প আরও যোগ করেন, তাইওয়ানের উস্কানিতে যুক্তরাষ্ট্র চীনের সাথে কোনো সংঘাতে জড়াতে প্রস্তুত নয়। তবে ট্রাম্প এ কথাও পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে, তাইওয়ানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নীতিতে কোনো আনুষ্ঠানিক পরিবর্তন আসেনি। ওয়াশিংটন ‘ওয়ান চায়না’ (One China) নীতি মেনেই বেইজিংকে স্বীকৃতি দেয়, তবে তাইওয়ানের আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখবে।
তাইওয়ানের প্রতিক্রিয়া: ‘আমরা আগে থেকেই স্বাধীন’
ট্রাম্পের এই পরোক্ষ হুঁশিয়ারির পর তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টের কার্যালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দ্রুত ওয়াশিংটনের অবস্থান স্পষ্ট করার চেষ্টা করে। তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে পূর্বের অবস্থান স্মরণ করিয়ে দিয়ে জানান, তাঁর দ্বীপরাষ্ট্রটি আগে থেকেই একটি স্বাধীন সত্ত্বা হিসেবে কাজ করছে, তাই নতুন করে স্বাধীনতা ঘোষণার কোনো প্রয়োজন নেই।
বিবৃতিতে মুখপাত্র কারেন কুও বলেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওসহ যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ মহল থেকে একাধিকবার আশ্বস্ত করা হয়েছে যে তাইওয়ানের প্রতি মার্কিন নীতি অপরিবর্তিত রয়েছে। তাইওয়ান ‘তাইওয়ান রিলেশনস অ্যাক্ট’ (Taiwan Relations Act)-এর দৃঢ় প্রতিশ্রুতির অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অংশীদারিত্ব বজায় রাখবে।” তারা আরও উল্লেখ করে, এই অঞ্চলে চীনের সামরিক আগ্রাসনই একমাত্র আসল নিরাপত্তাহীনতা।
অস্ত্র বিক্রি এখন ট্রাম্পের ‘দর-কষাকষির হাতিয়ার’
এই সফরের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে তাইওয়ানের কাছে মার্কিন অস্ত্র বিক্রির ইস্যুটিকে কেন্দ্র করে। সম্প্রতি তাইওয়ানের পার্লামেন্ট ২ হাজার ৫০০ কোটি (২৫ বিলিয়ন) ডলারের একটি বিশাল প্রতিরক্ষা বাজেট অনুমোদন করেছে, যার একটি বড় অংশ মার্কিন অস্ত্র কেনায় ব্যবহৃত হওয়ার কথা।
এর আগে ওয়াশিংটনের অবস্থান ছিল—তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রির বিষয়ে বেইজিংয়ের সাথে কোনো আলোচনা করা হবে না। কিন্তু ট্রাম্প প্রথা ভেঙে জানান, তিনি সি চিন পিংয়ের সঙ্গে এই অস্ত্র বিক্রির প্যাকেজ নিয়ে ‘বিস্তারিত’ কথা বলেছেন এবং এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি ‘দারুণ দর-কষাকষির হাতিয়ার’ (Bargaining Chip)। ওয়াশিংটনে ফেরার পথে বিমানে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, “আমি খুব শিগগিরই এই অস্ত্র প্যাকেজের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব। আমি এখনো এটি অনুমোদন করিনি।”
বিশ্লেষকদের চোখে ট্রাম্প-সি বৈঠক
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গবেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই অবস্থান তাইপেকে চরম অস্বস্তিতে ফেলেছে।
- অধ্যাপক লেভ ন্যাচম্যান (ন্যাশনাল তাইওয়ান ইউনিভার্সিটি): “অস্ত্রকে প্রকাশ্যে দর-কষাকষির হাতিয়ার বলে ট্রাম্প ঠিক সেই কথাটিই বলেছেন, যা তাইওয়ান কখনোই শুনতে চায়নি। এর মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চাইলেন যে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক ‘ছয়টি প্রতিশ্রুতির’ একটির এখন আর কোনো গুরুত্ব নেই।”
- জেং ওয়েই-ফেং (চেংচি ইউনিভার্সিটি): “বেইজিংয়ের সঙ্গে বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সম্পর্ক আরও মসৃণ করতে ট্রাম্প প্রশাসন তাইওয়ান ইস্যুতে অনেকটাই চীনের অবস্থানের দিকে ঝুঁকছে। সদিচ্ছা দেখাতে মার্কিন প্রশাসন অস্ত্র বিক্রির প্যাকেজে কাটছাঁটও করতে পারে।”
📊 এক নজরে ওয়াশিংটন-বেইজিং-তাইপে ত্রিভুজ সংকট (২০২৬)
| পক্ষ | বর্তমান অবস্থান ও কৌশল | মূল লক্ষ্য |
|---|---|---|
| যুক্তরাষ্ট্র (ডোনাল্ড ট্রাম্প) | তাইওয়ানকে স্বাধীনতা ঘোষণা না করার সতর্কবার্তা; অস্ত্র বিক্রিকে দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার। | চীনের সাথে যুদ্ধ এড়ানো ও বাণিজ্য সুবিধা আদায়। |
| চীন (সি চিন পিং) | তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ড দাবি; ট্রাম্পকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ভুল পদক্ষেপে ‘সংঘাত’ বাধবে। | তাইওয়ানের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও মার্কিন অস্ত্র রোধ। |
| তাইওয়ান (লাই চিং-তে) | নিজেদের সার্বভৌম দাবি করলেও ‘স্ট্যাটাস কো’ বা বর্তমান অবস্থা বজায় রাখার পক্ষে সওয়াল। | মার্কিন নিরাপত্তা গ্যারান্টি ও ২৫ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র নিশ্চিত করা। |
উপসংহার: সি চিন পিং ট্রাম্পকে স্পষ্ট করে বলেছেন, “তাইওয়ান ইস্যুটি চীন-মার্কিন সম্পর্কের সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়। এটি ভুলভাবে সামলানো হলে দুই দেশ বড় ধরনের সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে।” ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির কারণে তাইওয়ানকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের ‘কৌশলগত অস্পষ্টতা’ (Strategic Ambiguity) এখন এক নতুন সমীকরণের মুখোমুখি, যা দক্ষিণ চীন সাগরের ভূ-রাজনীতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলছে।
তথ্যসূত্র: এএফপি, বিবিসি নিউজ, আল জাজিরা ইংরেজি এবং তাইওয়ানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অফিশিয়াল বিবৃতি (মে ২০২৬)।



