ইতালি যাওয়ার স্বপ্নে দালালের খপ্পরে পড়ে প্রাণ হারালেন চায়ের দোকানি তছির ফকির; অভিযুক্ত দালাল ও তার পরিবার পলাতক।
মাদারীপুর | ১৪ মে ২০২৬
অবৈধপথে ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন কেড়ে নিল মাদারীপুরের আরও এক যুবকের প্রাণ। লিবিয়ার একটি বন্দিশালায় দালালের অমানুষিক নির্যাতনে তছির ফকির (৪০) নামে এক বাংলাদেশি অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যু হয়েছে। মঙ্গলবার (১২ মে) বাংলাদেশ সময় দুপুর ১টার দিকে লিবিয়ার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। নিহতের পরিবারের দাবি, দফায় দফায় ৪৮ লাখ টাকা মুক্তিপণ দেওয়ার পরও তাঁকে পিটিয়ে ও কষ্ট দিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
নিহত তছির ফকির মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার ঘোষালকান্দি গ্রামের কালু ফকিরের ছেলে। তাঁর মৃত্যুতে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে এবং ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী দালাল চক্রের কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
যেভাবে দালালের খপ্পরে পড়েন তছির
পেশায় চায়ের দোকানি তছির ফকির স্ত্রী ও তিন মেয়েকে নিয়ে সচ্ছলতার আশায় আট মাস আগে দালালের খপ্পরে পড়েন। পূর্ব স্বরমঙ্গল গ্রামের কুখ্যাত মানবপাচারকারী রফিকুল ইসলাম ওরফে বাঘা দালাল তাঁকে ইতালি পাঠানোর প্রলোভন দেখান।
- টাকা আদায়: শুরুতে ২৫ লাখ টাকা নিয়ে তছিরকে দুবাই হয়ে লিবিয়ায় পাঠানো হয়।
- বন্দিশালায় নির্যাতন: লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর তাঁকে একটি গোপন বন্দিশালায় আটকে রেখে অমানুষিক নির্যাতন শুরু করা হয়। মুক্তিপণ হিসেবে পরিবারের কাছ থেকে আরও ২০ লাখ টাকা আদায় করে লিবিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশি দালালরা।
- চিকিৎসার নামে প্রতারণা: নির্যাতনের ফলে তছির গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তির কথা বলে আরও ৩ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় চক্রটি। অবশেষে মঙ্গলবার তাঁর মৃত্যু সংবাদ বাড়িতে পৌঁছায়।
💬 স্বজনদের আহাজারি ও আর্তনাদ
“আমার তিনটা মেয়ে, এখন ওদের কে দেখবে? দালালরা আমাদের জমিজমা সব বিক্রি করিয়ে টাকাও নিল, আবার আমার স্বামীকেও মেরে ফেলল। ওরে অনেক কষ্ট দিয়ে মারা হয়েছে। আমি এর বিচার চাই।”
— এসমোতারা বেগম, নিহতের স্ত্রী।
“ভাইকে বিদেশে পাঠানোর জন্য সব শেষ করে নিঃস্ব হয়ে গেছি। না পারল ভাই বিদেশ যেতে, না পারছি টাকা ফিরে পেতে। দালাল রফিকের বিচার চাই।”
— শাহিন ফকির, নিহতের ভাই।
পলাতক দালাল চক্র
তছির ফকিরের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই অভিযুক্ত দালাল রফিকুল ইসলাম ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা বাড়ি ছেড়ে আত্মগোপন করেছেন। তাঁর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটিও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।
🔎 বিশ্লেষণ: মাদারীপুরে মানবপাচারের ভয়াবহতা
গত দুই মাসে মাদারীপুর জেলায় এটি চতুর্থ লিবিয়ায় মৃত্যুর ঘটনা। আগে সমুদ্রপথে নৌকাডুবিতে মৃত্যুর খবর বেশি আসলেও, বর্তমানে বন্দিশালায় আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায় ও পিটিয়ে হত্যার ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এই দালাল চক্রগুলো স্থানীয়ভাবে অত্যন্ত প্রভাবশালী হওয়ায় অনেক সময় ভুক্তভোগী পরিবার আইনি ব্যবস্থা নিতে সাহস পায় না।
📊 ঘটনা সংক্ষেপ
- নিহত: তছির ফকির (৪০), রাজৈর, মাদারীপুর।
- মোট মুক্তিপণ প্রদান: ৪৮ লাখ টাকা।
- মৃত্যুর স্থান: লিবিয়ার একটি হাসপাতাল (নির্যাতন পরবর্তী অসুস্থতায়)।
- অভিযুক্ত: রফিকুল ইসলাম ওরফে বাঘা দালাল।
- বর্তমান অবস্থা: অভিযুক্ত পলাতক, এলাকায় তীব্র উত্তেজনা।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
রাজৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহফুজুল হক জানিয়েছেন, পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত আবেদন পেলে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “নিহতের বাড়িতে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযুক্ত দালালদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
উপসংহার: অবৈধ অভিবাসনের এই মরণফাঁদ একের পর এক জীবন কেড়ে নিচ্ছে। তছির ফকিরের পরিবার এখন নিঃস্ব এবং বিচারপ্রার্থী। স্থানীয় দালাল চক্রের শিকড় উপড়ে না ফেললে এমন ট্র্যাজেডি থামানো অসম্ভব।
তথ্যসূত্র: প্রতিনিধি, মাদারীপুর ও স্থানীয় সূত্র।



