Homeটুডে নেশনবিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব: সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ও ভর্তুকির পাহাড়

বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব: সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ও ভর্তুকির পাহাড়

পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়ানোর আবেদন বিইআরসিতে; ১৭ থেকে ২১ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব পিডিবির।

ঢাকা | বুধবার, ৬ মে ২০২৬

ইরানযুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং দেশের অভ্যন্তরে ক্রমবর্ধমান ভর্তুকির চাপ সামাল দিতে এবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। গতকাল সোমবার পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) পাঠিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। আজ বুধবার বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ নিশ্চিত করেছেন যে, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) পাইকারি বিদ্যুতের দাম কমপক্ষে ১৭ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ২১ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির আবেদন করেছে।

ভর্তুকির বোঝা ও দাম বৃদ্ধির অঙ্ক

জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় বৃদ্ধি এবং উৎপাদন খরচের তুলনায় বিক্রয়মূল্য কম হওয়ায় সরকার বর্তমানে তীব্র আর্থিক সংকটে রয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্যমতে, প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে বর্তমানে গ্রাহক পর্যায়ে নেওয়া দামের চেয়ে ৫ টাকা ৫০ পয়সা বেশি খরচ হচ্ছে, যা সরকার ভর্তুকি হিসেবে দিচ্ছে।

  • পিডিবির প্রস্তাব: পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিটের দাম ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৪৮ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে।
  • খুচরা পর্যায়ে প্রভাব: খুচরা পর্যায়ে ইউনিটপ্রতি সর্বোচ্চ ১ টাকা ৩৮ পয়সা পর্যন্ত দাম বাড়তে পারে।
  • ভর্তুকি হ্রাসের লক্ষ্য: পাইকারি ট্যারিফ ১ টাকা ২০ পয়সা বাড়ালে সরকারের ভর্তুকি প্রায় ১২ হাজার ৫৮৬ কোটি ৯৯ লাখ টাকা কমতে পারে।
  • বর্তমান ঘাটতি: চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পিডিবির সম্ভাব্য ভর্তুকি ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় ৫৬ হাজার ৪৭৫ কোটি টাকা।

বিগত সরকারের লুটপাট ও বর্তমান সংকট

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিগত সরকারের আমলে কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের নামে ব্যাপক অনিয়ম ও লুটপাট হয়েছে। প্রায় ৩২টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার এবং ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ ২৯ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে, যার খেসারত এখন বর্তমান সরকারকে দিতে হচ্ছে। বর্তমানে দেশে দৈনিক গড়ে দুই হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং হচ্ছে এবং গ্রামাঞ্চলে ১০ থেকে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না।


🔎 বিশ্লেষণ: বকেয়া আদায়ের বিকল্প পথ

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুতের দাম না বাড়িয়ে বকেয়া পাওনা আদায় করলে এই সংকট সামাল দেওয়া সম্ভব। বিদ্যুৎ খাতে বর্তমানে প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার কাছেই পাওনা অন্তত ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এই বিপুল পরিমাণ বকেয়া আদায়ে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করলে ভর্তুকির চাপ যেমন কমত, তেমনি সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি দামের বোঝাও চাপাতে হতো না।

📊 তথ্যচিত্র: একনজরে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি

  • সর্বশেষ দাম বৃদ্ধি: ফেব্রুয়ারি ২০২৪ (খুচরা ৮.৫% ও পাইকারি ৫%)।
  • বর্তমান উৎপাদন ঘাটতি: প্রতি ইউনিটে ৫ টাকা ৫০ পয়সা।
  • প্রস্তাবিত বৃদ্ধি: ১৭% থেকে ২১%।
  • বকেয়া পাওনা: ৭৬ হাজার কোটি টাকা।

💬 মন্তব্য

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর এখন বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে তা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম আরও বাড়িয়ে দেবে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এটি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে অসহনীয় করে তুলবে এবং সরকারের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, ‘লাইফ লাইন’ বা স্বল্প বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী গ্রাহকদের এই দাম বৃদ্ধির চাপের বাইরে রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

উপসংহার

সরকার চরম আর্থিক সংকটের মধ্যে থেকে বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের যে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে, তা জনমনে অসন্তোষ তৈরি করতে পারে। বকেয়া বিদ্যুৎ বিল আদায়ে কঠোর না হয়ে বারবার দাম বাড়ানোকে ‘বোঝার ওপর শাকের আঁটি’ হিসেবে দেখছেন সাধারণ মানুষ। শেষ পর্যন্ত বিইআরসির কারিগরি কমিটি পিডিবির এই প্রস্তাব পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular