বিশেষ প্রতিবেদন | ৩০এপ্রিল, ২০২৬
কলকাতা/ঢাকা: দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের মহাযজ্ঞ বুধবার (২৯ এপ্রিল) শেষ হয়েছে। দুই দফায় অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনের দ্বিতীয় পর্বে ১৪২টি আসনে ভোটগ্রহণের মধ্য দিয়ে নির্ধারিত হয়ে গেল রাজ্যের পরবর্তী পাঁচ বছরের ভাগ্য। একদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হ্যাটট্রিক পরবর্তী ক্ষমতা ধরে রাখার লড়াই, অন্যদিকে বিজেপির সর্বশক্তি দিয়ে বঙ্গ জয়ের লক্ষ্য—সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচন ভারতের সংসদীয় ইতিহাসের অন্যতম হাই-ভোল্টেজ লড়াই হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
১. ভোটের হার: বিশ্বমঞ্চে বাংলার নতুন রেকর্ড
এবারের নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গবাসী যে পরিমাণ স্বতঃস্ফূর্ততা দেখিয়েছে, তা এক কথায় নজিরবিহীন। ভারতের নির্বাচন কমিশন (ECI) প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী:
- সর্বকালীন রেকর্ড: ২০১১ সালের ‘পরিবর্তনের’ নির্বাচনে ৮৪.৪৬% ভোটের রেকর্ড ভেঙে এ বছর দুই দফা মিলিয়ে সার্বিক ভোট পড়েছে ৯২.৪৭%।
- লিঙ্গভিত্তিক ভোট: দ্বিতীয় দফায় মহিলাদের ভোটদানের হার (৯২.২৮%) পুরুষদের (৯১.০৭%) তুলনায় সামান্য বেশি, যা রাজ্যের নারী ভোটারদের রাজনৈতিক সচেতনতার প্রতিফলন।
- শান্তিপূর্ণ নির্বাচন: ৫৭ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম কোনো রক্তপাতহীন এবং ‘জিরো ভায়োলেন্স’ নির্বাচন দেখল পশ্চিমবঙ্গ। কমিশনের কড়া নজরদারি ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর সক্রিয়তায় কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি।
২. বুথফেরত সমীক্ষা (Exit Poll): হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত
ভোট শেষ হওয়ার পরপরই বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা তাদের বুথফেরত সমীক্ষা প্রকাশ করেছে। অধিকাংশ সমীক্ষায় বিজেপিকে এগিয়ে রাখা হলেও, লড়াই যে এক চুল ছাড় দেওয়ার মতো নয়, তা স্পষ্ট:
৩. হাই-প্রোফাইল লড়াই: ভবানীপুরে মমতা বনাম শুভেন্দু
| সমীক্ষা সংস্থা | বিজেপি (BJP) | তৃণমূল (TMC) | বাম-কংগ্রেস/অন্যান্য |
|---|---|---|---|
| ম্যাট্রিজ (Matriz) | ১৪৬ – ১৬১ | ১২৫ – ১৪০ | ০৬ – ১০ |
| চাণক্য স্ট্র্যাটেজি | ১৫০ – ১৬০ | ১৩০ – ১৪০ | ০৬ – ১০ |
| পি-মার্ক (P-MARQ) | ১৫০ – ১৭৫ | ১১৮ – ১৩৮ | ০ – ০ |
| পিপলস পালস | ৯৫ – ১১০ | ১৭৮ – ১৮৯ | ০১ – ০৩ |
| জনমত পোলস | ৮০ – ৯০ | ১৯৫ – ২০৫ | ০৩ – ০৫ |
| সমীক্ষা সংস্থা | বিজেপি (BJP) | তৃণমূল (TMC) | বাম-কংগ্রেস/অন্যান্য |
|---|---|---|---|
| ম্যাট্রিজ (Matriz) | ১৪৬ – ১৬১ | ১২৫ – ১৪০ | ০৬ – ১০ |
| চাণক্য স্ট্র্যাটেজি | ১৫০ – ১৬০ | ১৩০ – ১৪০ | ০৬ – ১০ |
| পি-মার্ক (P-MARQ) | ১৫০ – ১৭৫ | ১১৮ – ১৩৮ | ০ – ০ |
| পিপলস পালস | ৯৫ – ১১০ | ১৭৮ – ১৮৯ | ০১ – ০৩ |
| জনমত পোলস | ৮০ – ৯০ | ১৯৫ – ২০৫ | ০৩ – ০৫ |
বিশ্লেষণ: ২৯৪ আসনের বিধানসভায় ম্যাজিক ফিগার ১৪৮। প্রজা পোল এবং পোল ডায়েরির মতো সংস্থাগুলো বিজেপিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিলেও, পিপলস পালস এবং জনমত পোলস মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিপুল প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সারা ভারতের নজর ছিল কলকাতার ভবানীপুর কেন্দ্রের দিকে। সেখানে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর সম্মুখ সমরে আজ দিনভর উত্তেজনা ছিল তুঙ্গে। শুভেন্দু অধিকারী সংখ্যালঘু ভোট কমে যাওয়ার দাবি করে নিজের জয়ের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। অন্যদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আঙুলে ‘ভি’ (বিজয়) চিহ্ন দেখিয়ে নবান্নে ফেরার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেছেন।
৪. নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো এবারের নির্বাচনে ভারতের নির্বাচন কমিশনের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির প্রশংসা করেছে। কমিশনার মনোজ অগ্রবাল এবং সুব্রত গুপ্তের নেতৃত্বে যেভাবে কয়েকশ পুলিশ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে বদলি করে একটি ভয়হীন পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে, তাকে ‘বেঙ্গল মডেল অব পিসফুল ইলেকশন’ হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী পশ্চিমবঙ্গের এই উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ ভোটদানকে গণতন্ত্রের জয় হিসেবে আখ্যা দিয়ে টুইট করেছেন।
৫. শেষ কথা: সরকার গড়বে কে?
আগামী ৪ মে, ২০২৬ নির্ধারিত হবে চূড়ান্ত ফলাফল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে:
- যদি রেকর্ড ব্রেকিং এই ৯২% ভোট ‘অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি’ বা সরকার বিরোধী হয়, তবে নবান্নে বিজেপির পতাকা ওড়া সময়ের ব্যাপার।
- আর যদি এই বিপুল ভোট ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ বা তৃণমূলের জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের পক্ষে নীরব বিপ্লব হয়, তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনকাল আরও দীর্ঘায়িত হবে।
উপসংহার: ভারতের রাজনীতিতে পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচন কেবল একটি ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং এটি ভবিষ্যৎ জাতীয় রাজনীতির দিকনির্দেশক। ৪ মে’র চূড়ান্ত গণনার দিকেই এখন তাকিয়ে সারা বিশ্ব।
(তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার অনলাইন, এবিপি আনন্দ, টাইমস অব ইন্ডিয়া এবং নির্বাচন কমিশন ভারত)



