Homeনাগরিক দর্পণইরানের ‘স্ট্র্যাটেজিক’ ফাঁদে ট্রাম্প: ইসলামাবাদ মিশন বাতিল, এখন কি পরাজয় স্বীকারই শেষ...

ইরানের ‘স্ট্র্যাটেজিক’ ফাঁদে ট্রাম্প: ইসলামাবাদ মিশন বাতিল, এখন কি পরাজয় স্বীকারই শেষ পথ?

ওয়াশিংটন-তেহরান: মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে দৃশ্যপট নাটকীয়ভাবে বদলে যাচ্ছে। একদিকে মার্কিন হুঙ্কার, অন্যদিকে ইরানের শীতল ও কৌশলী রণকৌশল—সব মিলিয়ে এক গোলকধাঁধায় পড়েছেন নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গতকাল পর্যন্ত যে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন তার বিশেষ দূতরা (কুশনার ও উইটকফ) ইরানের সাথে সমঝোতা করতে পাকিস্তানের পথে রয়েছেন, আজ তিনিই হঠাৎ করে সেই সফর বাতিলের ঘোষণা দিলেন।

ইসলামাবাদে কী ঘটেছিল?

​সিএনএন-এর প্রখ্যাত কলামিস্ট নিক রবার্টসন, যিনি বর্তমানে পাকিস্তানে অবস্থান করছেন, তার বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এক বিস্ফোরক তথ্য। গত রাতে ইসলামাবাদে পৌঁছানোর পর থেকেই ইরানের প্রতিনিধি দল পাকিস্তান সরকারের সাথে ম্যারাথন বৈঠক করে, যা চলে আজ ভোর পর্যন্ত। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান পাকিস্তানকে যে প্রস্তাব বা শর্তসমূহ হস্তান্তর করেছে, তার ওপর ভিত্তি করেই ট্রাম্প তার প্রতিনিধিদের সফর বাতিলের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন।

​অর্থাৎ, যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি বা ‘টার্মস’ এখন আর ওয়াশিংটন নির্ধারণ করছে না, বরং তা নির্ধারিত হচ্ছে তেহরানের টেবিল থেকে।

ফোন কলের আকুতি নাকি সম্মানজনক প্রস্থান?

​ট্রাম্প তার সর্বশেষ সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে লিখেছেন, “If they want to talk, all they have to do is call.” (তারা কথা বলতে চাইলে শুধু একটা ফোন করলেই হবে।)

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা ট্রাম্পের এই আহ্বানকে দেখছেন অনেকটা ‘চুক্তি ভিক্ষা’ করার মতো। ইরানের প্রতিরক্ষা দপ্তর থেকে সরাসরি জানানো হয়েছে, তাদের সামরিক শক্তি এখন এক প্রভাবশালী অবস্থানে রয়েছে এবং শত্রু (যুক্তরাষ্ট্র) এখন যুদ্ধের এই চোরাবালি থেকে কেবল একটি ‘সম্মানজনক প্রস্থান’ বা Exit Route খুঁজছে।

হরমুজ প্রণালী ও বিশ্ব অর্থনীতির নাভিশ্বাস

​অর্থনীতিবিদ জেফ্রি সাক্স এবং সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের এই অবরোধ বা যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী করা আর সম্ভব নয়।

  • এনার্জি ক্রাইসিস: হরমুজ প্রণালী আর এক সপ্তাহ বন্ধ থাকলে দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকায় জ্বালানি সংকট ভয়াবহ রূপ নেবে।
  • এভিয়েশন বিপর্যয়: তিন সপ্তাহ বন্ধ থাকলে ইউরোপের এয়ারলাইন্সগুলো মুখ থুবড়ে পড়বে। ইতিমাজেই জার্মানির লুফথানসা তাদের অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট বাতিল করা শুরু করেছে।
  • সৈন্যদের ক্লান্তি (Fatigue): সামরিক বিশেষজ্ঞ শন বেল-এর মতে, মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েনকৃত মার্কিন সৈন্যরা দীর্ঘ মেয়াদে সেখানে থাকতে পারবে না, তাদের মধ্যে ক্লান্তি বা ক্লান্তিজনিত অবসাদ চলে আসবে।

ইসরায়েলি প্ররোচনা বনাম ডেমোক্র্যাটদের সমালোচনা

​ইসরায়েলি সংবাদ মাধ্যমগুলো দাবি করছে, তারা রবিবার ইরানে হামলার সব প্রস্তুতি সেরে রেখেছে এবং ট্রাম্পের ‘গ্রিন সিগনাল’-এর অপেক্ষায় আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ট্রাম্প কি পরাজয়ের গ্লানি ঢাকতে আবারও যুদ্ধের ঝুঁকি নেবেন? ইরানের ১০ দফা প্রস্তাব অনুযায়ী তারা হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ছাড়বে না এবং পারমাণবিক প্রকল্পও সচল রাখবে। এই শর্তে যদি ট্রাম্প কোনো চুক্তি করেন, তবে তা হবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চরম অবমাননাকর। ডেমোক্র্যাটরা ইতিমধ্যেই বলতে শুরু করেছে—ওবামার করা JCPOA চুক্তির চেয়ে এটি অনেক বেশি দুর্বল এবং এটি ট্রাম্পের এক বড় পরাজয় হিসেবে চিহ্নিত হবে।

মার্কিন আধিপত্যের সূর্যাস্ত?

​মার্কিন কর্নেল ডেভিস স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই ইরানে হেরে গেছে। ট্রাম্প যদি এটি মেনে না নেন, তবে বিশ্বজুড়ে আমেরিকার যে অবশিষ্ট প্রভাব (Hegemony) আছে, তাও ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।

শেষ কথা: ইরান কেবল অস্ত্র দিয়ে নয়, বরং ‘স্ট্র্যাটেজিক বিদ্যা’ কাজে লাগিয়ে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে এক কঠিন ফাঁদে ফেলেছে। এখন ট্রাম্পের সামনে কেবল দুটি পথ—হয় ইরানের শর্ত মেনে ফোন করা, না হয় বিশ্বজুড়ে আমেরিকার প্রভাব চিরতরে বিলুপ্ত হতে দেখা।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments