বিষয়টি ‘মানবতার স্বার্থে’ শেষ করার আহ্বান ভারতের; মস্কো বলছে, তারা যুদ্ধ অবসানের পথে এগোচ্ছে, তবে শর্তের প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত
বিশকেক, কিরগিজস্তান | ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে ইউক্রেন যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার আহ্বান জানিয়েছেন। সোমবার কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (SCO) সম্মেলনের ফাঁকে বৈঠকে মোদি বলেন, যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, মানবতার জন্য তত বেশি ক্ষতি হবে এবং শান্তির দিকে এগিয়ে যাওয়াই এখন প্রয়োজন।
বৈঠকের শুরুতেই মোদি পুতিনকে ‘আমার বন্ধু’ বলে সম্বোধন করেন এবং ভারত-রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্কের কথা তুলে ধরেন। একইসঙ্গে তিনি বলেন, ভারত ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে সব ধরনের শান্তি প্রচেষ্টাকে সমর্থন করবে।
ভারতের অবস্থান: যুদ্ধ থেকে শান্তির পথে যেতে হবে
ভারত শুরু থেকেই ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষেত্রে পশ্চিমা দেশগুলোর কঠোর অবস্থান থেকে কিছুটা আলাদা পথ অনুসরণ করেছে। দিল্লি রাশিয়ার সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি একাধিকবার যুদ্ধ বন্ধ ও কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে।
মোদির সর্বশেষ বক্তব্যে এই অবস্থানই আবার সামনে এসেছে। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, যুদ্ধ বন্ধ এবং শত্রুতা থামানোর দিকে এগোতে হবে। তার বক্তব্যে কোনো নির্দিষ্ট শান্তি চুক্তির কাঠামো বা সময়সীমা ঘোষণা করা হয়নি।
মস্কোর উত্তরেও শান্তির কথা, কিন্তু শর্তের জায়গাটি গুরুত্বপূর্ণ
পুতিন মোদির বক্তব্যের জবাবে বলেন, রাশিয়া শান্তির দিকে এগোচ্ছে। তবে রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে, যুদ্ধ শেষ করার যে কোনো সমাধান তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক শর্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
ইউক্রেন ও তার পশ্চিমা মিত্ররা রাশিয়ার বিভিন্ন শর্তকে আত্মসমর্পণের সমতুল্য বা অগ্রহণযোগ্য হিসেবে বর্ণনা করেছে। ফলে পুতিনের ‘শান্তির দিকে এগোনো’ এবং বাস্তবে যুদ্ধ বন্ধের জন্য প্রয়োজনীয় শর্ত—এই দুইয়ের মধ্যে এখনও বড় ব্যবধান রয়েছে।
রাশিয়ার তেল ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক
যুদ্ধের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ভারত রাশিয়ার অন্যতম বড় তেল ক্রেতা হয়ে রয়েছে। চীনের সঙ্গেও ভারতের এই বাণিজ্যিক সম্পর্ক মস্কোর অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণে ভারত একদিকে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানাচ্ছে, অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে বড় অর্থনৈতিক সম্পর্ক ধরে রেখেছে। এই দ্বৈত বাস্তবতাই ভারতের কূটনৈতিক অবস্থানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
SCO সম্মেলনে বদলে যাচ্ছে ইউরেশিয়ার কূটনৈতিক সমীকরণ
বিশকেকের SCO বৈঠকে শুধু ভারত ও রাশিয়াই নয়, চীন, ইরানসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দেশের নেতারাও অংশ নিয়েছেন। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার পরিপ্রেক্ষিতে এই প্ল্যাটফর্মের কূটনৈতিক গুরুত্ব বেড়েছে।
রাশিয়া, চীন, ভারত ও ইরানের মতো দেশগুলোর একই মঞ্চে উপস্থিতি দেখাচ্ছে যে বিশ্ব কূটনীতিতে পশ্চিমা জোটের বাইরে বিকল্প শক্তির কেন্দ্রগুলোও নিজেদের যোগাযোগ জোরদার করছে। তবে এসব দেশের পারস্পরিক সম্পর্কেও স্বার্থের পার্থক্য রয়েছে।
📊 বৈঠকের মূল বার্তা
• মোদি: ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ হওয়া উচিত
• ভারত: সব শান্তি প্রচেষ্টাকে সমর্থন করবে
• পুতিন: রাশিয়া শান্তির দিকে এগোচ্ছে
• মতপার্থক্য: যুদ্ধ শেষের শর্ত
• বৈঠকের স্থান: বিশকেক, কিরগিজস্তান
🇧🇩 বাংলাদেশের জন্য গুরুত্ব
ভারত ও রাশিয়ার এই কূটনৈতিক সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে রাশিয়ার জ্বালানি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রবাহের পরিবর্তন ভারতীয় বাজার এবং আঞ্চলিক সরবরাহ ব্যবস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশের ওপর পরোক্ষ প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে বর্তমান বৈঠক থেকে বাংলাদেশের জন্য তাৎক্ষণিক কোনো নির্দিষ্ট নীতিগত পরিবর্তনের তথ্য পাওয়া যায়নি।
🧭 এরপর কী
মোদির বক্তব্য শান্তি আলোচনার পক্ষে ভারতের অবস্থানকে নতুন করে সামনে এনেছে। এখন মূল প্রশ্ন হলো—রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে বাস্তব আলোচনার সুযোগ তৈরি হয় কি না এবং যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে দুই পক্ষের শর্ত কতটা কাছাকাছি আসে।
📌 তথ্যসূত্র
Reuters, Kremlin, Shanghai Cooperation Organisation।




