Homeটুডে টেকবৈদ্যুতিক পণ্যে উত্থান, প্রকৌশল রপ্তানিতে বাংলাদেশের নতুন যুগের সূচনা

বৈদ্যুতিক পণ্যে উত্থান, প্রকৌশল রপ্তানিতে বাংলাদেশের নতুন যুগের সূচনা

বাইসাইকেলনির্ভর রপ্তানি থেকে উচ্চমূল্যের ইলেকট্রনিকস ও সার্কিট বোর্ড উৎপাদনে অগ্রগতি; ১১ মাসে প্রকৌশল পণ্য রপ্তানি বেড়েছে ২০ শতাংশের বেশি

ঢাকা | ১০ জুন ২০২৬

বাংলাদেশের প্রকৌশল খাতের রপ্তানিতে বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক পণ্য এখন নতুন চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বাইসাইকেল ও ধাতব পণ্যের মতো প্রথাগত রপ্তানি পণ্যের পাশাপাশি উচ্চমূল্য সংযোজিত প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদন ও রপ্তানির মাধ্যমে দেশের শিল্পখাত নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে প্রকৌশল পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৫৯৮.১২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় যা ২০.০৫ শতাংশ বেশি। তবে দেশের মোট ৪৩.৮ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয়ের মধ্যে এ খাতের অবদান এখনো মাত্র ১.৩৭ শতাংশ।

🚨 কী ঘটেছে

প্রকৌশল খাতে সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছে ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম। আলোচ্য সময়ে এ খাত থেকে রপ্তানি আয় হয়েছে ১৮৯.২৯ মিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ২২.২৩ শতাংশ বেশি।

একই সময়ে—

  • বাইসাইকেল রপ্তানি বেড়েছে ২৮.৩ শতাংশ
  • তামা ও তামাজাত পণ্য রপ্তানি থেকে আয় এসেছে ৬০.৬৯ মিলিয়ন ডলার
  • লোহা ও ইস্পাত রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৫৬.৩২ মিলিয়ন ডলার
  • যন্ত্রপাতি ও প্রকৌশল সরঞ্জাম রপ্তানি কমেছে ৮.৮৬ শতাংশ

📊 গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এক নজরে

সূচকপরিমাণ
মোট প্রকৌশল পণ্য রপ্তানি৫৯৮.১২ মিলিয়ন ডলার
প্রবৃদ্ধি২০.০৫%
মোট রপ্তানিতে অবদান১.৩৭%
ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক পণ্য রপ্তানি১৮৯.২৯ মিলিয়ন ডলার
এ খাতের প্রবৃদ্ধি২২.২৩%
বাইসাইকেল রপ্তানি১৩৮.৭৫ মিলিয়ন ডলার
বাইসাইকেল প্রবৃদ্ধি২৮.৩%

📅 ঘটনাক্রম

২০১৪-১৫ অর্থবছর

  • প্রকৌশল খাতের রপ্তানি আয় প্রায় ৪৪৭ মিলিয়ন ডলার
  • প্রধান রপ্তানি পণ্য ছিল বাইসাইকেল
  • বৈদ্যুতিক পণ্য রপ্তানি ছিল প্রায় ৯০ মিলিয়ন ডলার

২০২৫-২৬ অর্থবছর

  • ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক পণ্য খাতের বৃহত্তম রপ্তানি পণ্যে পরিণত
  • স্থানীয়ভাবে পিসিবি ও পিসিবিএ উৎপাদন শুরু
  • উচ্চমূল্য প্রযুক্তিপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ

📍 কোথায় কী ঘটছে

বাংলাদেশে উৎপাদিত বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক পণ্য বর্তমানে ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা ও উত্তর আমেরিকার ৬০টিরও বেশি দেশে রপ্তানি হচ্ছে।

প্রধান বাজারগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • যুক্তরাষ্ট্র
  • জার্মানি
  • ডেনমার্ক
  • পোল্যান্ড
  • আয়ারল্যান্ড
  • তুরস্ক
  • ভারত
  • শ্রীলঙ্কা
  • ইরাক
  • সংযুক্ত আরব আমিরাত

💬 খাতসংশ্লিষ্টদের বক্তব্য

বাংলাদেশ ইলেকট্রিক্যাল মার্চেন্ডাইজ ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান মো. ইসমাইল হোসেন বলেন, স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক মানের পণ্য উৎপাদন এবং সরকারের ধারাবাহিক নীতি সহায়তার ফলে রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে।

ওয়ালটন কম্পিউটার প্রোডাক্টসের চিফ বিজনেস অফিসার তৌহিদুর রহমান রাদ বলেন, নিজস্ব পিসিবি ও পিসিবিএ উৎপাদন সক্ষমতার কারণে প্রতিষ্ঠানটি স্মার্ট, আইওটি ও এআই-চালিত পণ্য উৎপাদনে এগিয়ে যাচ্ছে।

অন্যদিকে টিএইচটি-স্পেস ইলেকট্রিক্যাল কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শি ফেং বলেন, বৈশ্বিক বাজার দ্রুত এআই-নির্ভর স্মার্ট পণ্যের দিকে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে না পারলে বাংলাদেশ শিল্প ও কর্মসংস্থানে পিছিয়ে পড়তে পারে।

🇧🇩 জনজীবন ও অর্থনীতিতে প্রভাব

বিশ্লেষকদের মতে, প্রকৌশল ও বৈদ্যুতিক পণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধি বাংলাদেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এর ফলে—

  • তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভরতা কমবে
  • উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে
  • প্রযুক্তিভিত্তিক শিল্পায়ন ত্বরান্বিত হবে
  • বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়বে
  • দেশীয় গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম সম্প্রসারিত হবে

🔎 চ্যালেঞ্জ কোথায়

উৎপাদকদের মতে, খাতটির সামনে এখনো বেশ কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে—

  • কাঁচামালের আমদানিনির্ভরতা
  • সেমিকন্ডাক্টর ও উন্নত যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকে আমদানি
  • উচ্চ আমদানি ব্যয়
  • জ্বালানি সংকট
  • আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন জটিলতা
  • লজিস্টিকস সীমাবদ্ধতা
  • দক্ষ প্রযুক্তিগত জনবলের অভাব

বর্তমানে বিভিন্ন পণ্যে স্থানীয় মূল্য সংযোজনের হার ৩০ থেকে ৭০ শতাংশের মধ্যে রয়েছে।

🧭 এরপর কী

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প শক্তিশালী করা, আন্তর্জাতিক মানের টেস্টিং সুবিধা গড়ে তোলা এবং তৈরি পোশাক শিল্পের মতো নীতি সহায়তা দেওয়া হলে প্রকৌশল খাতের রপ্তানি দ্রুত বাড়তে পারে।

ভারত ও ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগী দেশের তুলনায় বাংলাদেশ এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক পণ্যের দ্রুত প্রবৃদ্ধি ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে।

🔎 দাবি বনাম বাস্তবতা

দাবি: বাংলাদেশ উচ্চমূল্যের প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদনে প্রবেশ করছে।

বাস্তবতা: স্থানীয়ভাবে পিসিবি ও পিসিবিএ উৎপাদন শুরু হলেও সেমিকন্ডাক্টরসহ গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের ক্ষেত্রে এখনো আমদানিনির্ভরতা রয়েছে। ফলে পূর্ণাঙ্গ প্রযুক্তি সরবরাহ চেইন গড়ে তুলতে আরও বিনিয়োগ ও নীতি সহায়তা প্রয়োজন।

📌 তথ্যসূত্র

  • রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)
  • বাংলাদেশ ইলেকট্রিক্যাল মার্চেন্ডাইজ ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন
  • খাতসংশ্লিষ্ট উৎপাদক ও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান
  • দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (প্রকাশিত: ৯ জুন ২০২৬)

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments