রাজশাহীর এক তরুণীর পরিচয় সংকট নতুন করে সামনে আনছে দত্তক, বংশপরিচয় ও সম্পত্তির অধিকার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
ঢাকা | ১০ জুন ২০২৬
সম্প্রতি রাজশাহীর এক তরুণীকে ঘিরে আলোচিত একটি ঘটনা আবারও সামনে নিয়ে এসেছে একটি সংবেদনশীল কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—ইসলামে কি দত্তক সন্তান গ্রহণ করা যায়? যদি যায়, তাহলে সেই সন্তানকে নিজের সন্তান হিসেবে পরিচয় দেওয়া, নিজের নাম তার পিতা-মাতা হিসেবে ব্যবহার করা কিংবা সম্পত্তির উত্তরাধিকারী বানানো কতটা বৈধ?
বাংলাদেশের সমাজে বহু পরিবার মানবিক কারণে এতিম, পরিত্যক্ত কিংবা অসহায় শিশুদের লালন-পালন করে থাকে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই ধর্মীয় বিধান, আইনি কাঠামো এবং সামাজিক বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা না থাকায় পরবর্তীতে পরিচয়, উত্তরাধিকার ও পারিবারিক সম্পর্ক নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়।
রাজশাহীর সাম্প্রতিক ঘটনাটি সেই বাস্তবতারই একটি উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে।
🧭 প্রেক্ষাপট ও মূল প্রশ্ন
গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহীর এক চিকিৎসক দম্পতির কাছে দীর্ঘদিন নিজের সন্তান হিসেবে বেড়ে ওঠা এক তরুণী পরবর্তীতে জানতে পারেন তিনি জৈবিক সন্তান নন। পরে জন্মনিবন্ধনসহ বিভিন্ন নথিতে পরিবর্তন আনার অভিযোগ এবং পরিচয় নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়।
ঘটনাটির সত্যতা ও আইনি দিক সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও আদালতের বিষয়। তবে এই ঘটনা একটি বৃহত্তর প্রশ্ন উত্থাপন করেছে—
- ইসলাম কি দত্তক গ্রহণকে স্বীকৃতি দেয়?
- দত্তক সন্তানকে নিজের বংশপরিচয়ে পরিচিত করা যাবে কি?
- দত্তক সন্তান কি উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তি পাবে?
- মানবিক দায়িত্ব ও ধর্মীয় বিধানের মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করা সম্ভব?
📊 তথ্য ও উপাত্তের আলোকে
ইসলামে এতিম, অসহায় ও পরিত্যক্ত শিশুর লালন-পালনকে অত্যন্ত সওয়াবের কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে এতিমদের প্রতি সদাচরণ, ভরণপোষণ এবং তাদের অধিকার রক্ষার বিষয়ে বারবার নির্দেশনা এসেছে।
তবে ইসলামী শরিয়াহ “দত্তক” (Adoption) এবং “লালন-পালন” (Kafala)-এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য নির্ধারণ করেছে।
ইসলামে কোনো শিশুকে নিজের কাছে রেখে তার শিক্ষা, চিকিৎসা, ভরণপোষণ ও নিরাপত্তার দায়িত্ব নেওয়া বৈধ এবং উৎসাহিত করা হয়েছে। কিন্তু সেই শিশুর প্রকৃত বংশপরিচয় পরিবর্তন করে তাকে জৈবিক সন্তান হিসেবে উপস্থাপন করার অনুমতি দেওয়া হয়নি।
কোরআনের সূরা আল-আহযাবের ৪ ও ৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে যে সন্তানদের তাদের প্রকৃত পিতার নামেই ডাকা উচিত। অর্থাৎ, কোনো শিশুকে লালন-পালন করা গেলেও তার আসল বংশপরিচয় গোপন বা পরিবর্তন করা ইসলামী বিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ফলে ইসলামী আইনের দৃষ্টিতে কোনো ব্যক্তি দত্তক সন্তানের জন্মসনদ, জাতীয় পরিচয়পত্র বা অন্যান্য নথিতে নিজেকে জৈবিক পিতা বা মাতা হিসেবে উল্লেখ করলে তা ধর্মীয়ভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
ইসলামে কি দত্তক সন্তান নিজের নাম ব্যবহার করতে পারে?
এখানেই সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তি দেখা যায়।
ইসলামী আইন অনুযায়ী—
- শিশুকে লালন-পালন করা যাবে।
- তাকে পরিবারে সদস্য হিসেবে রাখা যাবে।
- ভালোবাসা, শিক্ষা ও নিরাপত্তা দেওয়া যাবে।
- কিন্তু তার প্রকৃত বংশপরিচয় পরিবর্তন করা যাবে না।
যদি শিশুর প্রকৃত পিতামাতার পরিচয় জানা থাকে, তাহলে সেই পরিচয় সংরক্ষণ করতে হবে।
আর যদি পরিচয় জানা না থাকে, তাহলে ইসলামী পণ্ডিতদের মতে শিশুকে সম্মানজনক সামাজিক পরিচয় দেওয়া যাবে, কিন্তু মিথ্যা বংশপরিচয় তৈরি করা উচিত নয়।
দত্তক সন্তান কি সম্পত্তির ভাগীদার হয়?
ইসলামী উত্তরাধিকার আইনে উত্তরটি স্পষ্ট।
দত্তক সন্তান স্বয়ংক্রিয়ভাবে উত্তরাধিকারী (ওয়ারিশ) হয় না।
অর্থাৎ—
দত্তক নেওয়ার মাধ্যমে কোনো শিশু জৈবিক সন্তান বা শরিয়ত নির্ধারিত উত্তরাধিকারীর মর্যাদা লাভ করে না।
ফলে পিতা-মাতা মৃত্যুবরণ করলে ইসলামী উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী দত্তক সন্তান বাধ্যতামূলক অংশীদার হিসেবে সম্পত্তি পায় না।
তবে এর অর্থ এই নয় যে তাকে কিছুই দেওয়া যাবে না।
ইসলামী আইন একজন ব্যক্তিকে তার মোট সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত অংশ উইল করার সুযোগ দেয়। সেই উইলের মাধ্যমে দত্তক সন্তান, পালিত সন্তান বা অন্য কোনো ব্যক্তিকে সম্পদ প্রদান করা যেতে পারে।
এ ছাড়া জীবদ্দশায় হেবা (উপহার) হিসেবেও সম্পত্তি দেওয়া বৈধ।
ফলে সম্পূর্ণ বঞ্চনা এবং পূর্ণ উত্তরাধিকার—এই দুইয়ের মাঝখানে একটি বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা ইসলামী আইন রেখেছে।
⚖️ ভিন্নমত ও বিতর্ক
সমসাময়িক সমাজে অনেকেই মনে করেন, দীর্ঘদিন যাকে নিজের সন্তান হিসেবে লালন-পালন করা হয়েছে, তার সঙ্গে শুধুমাত্র জৈবিক সম্পর্কের ভিত্তিতে পার্থক্য করা মানবিক নয়।
অন্যদিকে ইসলামী আইনবিদদের যুক্তি হলো, উত্তরাধিকার ও বংশপরিচয় শুধু আবেগের বিষয় নয়; এটি সামাজিক, পারিবারিক ও আইনি শৃঙ্খলার সঙ্গে যুক্ত।
তাদের মতে, কোনো শিশুর প্রকৃত পরিচয় গোপন করার ফলে ভবিষ্যতে বিবাহ, উত্তরাধিকার, আত্মীয়তার সম্পর্ক এবং আইনি নথিতে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
সাম্প্রতিক রাজশাহীর ঘটনাও সেই উদ্বেগকে নতুন করে সামনে এনেছে।
🇧🇩 নাগরিক জীবনে প্রভাব
বাংলাদেশে অনেক পরিবার মানবিক কারণে শিশু লালন-পালনের দায়িত্ব নেয়। এটি অবশ্যই প্রশংসনীয়।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে—
- শিশুর প্রকৃত পরিচয় সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।
- জন্মনিবন্ধন ও সরকারি নথিতে সঠিক তথ্য থাকা উচিত।
- দত্তক বা পালক সন্তানের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় আগেভাগে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
- সম্পত্তি দিতে চাইলে উইল বা হেবার মাধ্যমে তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
অন্যথায় ভবিষ্যতে পরিচয় সংকট, উত্তরাধিকার বিরোধ এবং সামাজিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
মতামত
বাংলাদেশে পালক সন্তান ও পরিচয় সংক্রান্ত বিষয়ে আরও সুস্পষ্ট সামাজিক ও আইনি সচেতনতা প্রয়োজন।
শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ রক্ষা করতে ধর্মীয় বিধান, মানবিক দায়িত্ব এবং আইনি কাঠামোর মধ্যে সমন্বয় জরুরি।
📌 তথ্যসূত্র
- পবিত্র কোরআন, সূরা আল-আহযাব (আয়াত ৪-৫)
- সহিহ আল-বুখারি ও সহিহ মুসলিমে এতিম পরিচর্যা সম্পর্কিত হাদিসসমূহ
- ইসলামী উত্তরাধিকার আইন (ফরায়েজ)
- বাংলাদেশে প্রচলিত উত্তরাধিকার আইন সম্পর্কিত আইনজ্ঞদের ব্যাখ্যা



