Homeটুডে স্পোর্টসটাইগার রবি’র স্মৃতিচারণ: বাবা ‘টাইগার জলিল’—এক কিংবদন্তি কুস্তিগীর ও বীর মুক্তিযোদ্ধার মহাকাব্য

টাইগার রবি’র স্মৃতিচারণ: বাবা ‘টাইগার জলিল’—এক কিংবদন্তি কুস্তিগীর ও বীর মুক্তিযোদ্ধার মহাকাব্য

সাফ গেমসের কোচ থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ডব্লিউডব্লিউএফ কুস্তির রিং; দেশের সম্মান রক্ষায় আজীবন লড়ে যাওয়া এক অদম্য যোদ্ধার গল্প শুনিয়েছেন তাঁর অভিনেতা পুত্র টাইগার রবি।

ঢাকা | ১৪ মে ২০২৬
বাংলাদেশের ক্রীড়া ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে কিছু নাম সময়ের আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়, অথচ তাদের অবদান ছিল অতুলনীয়। তেমনি একজন মানুষ ছিলেন টাইগার জলিল। সম্প্রতি তাঁর ছেলে, জনপ্রিয় অভিনেতা টাইগার রবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাবার বর্ণাঢ্য জীবনের নানা অজানা ও রোমাঞ্চকর দিক নিয়ে একটি বিশেষ স্মৃতিচারণমূলক লেখা পোস্ট করেছেন। সেখানে উঠে এসেছে একাত্তরের রণাঙ্গন থেকে আন্তর্জাতিক কুস্তির রিংয়ে বাংলাদেশের পতাকাকে উঁচিয়ে ধরার এক বীরত্বগাথা।

রণাঙ্গনের অপ্রতিরোধ্য যোদ্ধা

টাইগার রবির বর্ণনা অনুযায়ী, টাইগার জলিল ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে মেজর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন ‘জেড ফোর্স’-এর অধীনে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেন। এক যুদ্ধে সহযোদ্ধাদের পিছু হটার সুযোগ করে দিতে তিনি একাই ভারী মেশিনগান নিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর গতিরোধ করেন।

  • বন্দিদশা থেকে পলায়ন: বুলেট শেষ হয়ে গেলে তিনি পাক বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন এবং দুই দিন অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হন। তবে অদম্য সাহসের জোরে তিন জন সেন্ট্রিকে পরাস্ত করে তিনি ক্যাম্প থেকে পালিয়ে পুনরায় মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে ফিরে আসেন।

💬 বাবার সাহসিকতা নিয়ে টাইগার রবি’র স্মৃতিচারণ

“আমার বাবার এই অসামান্য সাহসিকতা ও অদম্য মনোবল দেখে সকলে বিস্মিত হন। মেজর জিয়াউর রহমান তাঁর নিজ তাবুতেই আব্বার শশ্রসারের ব্যবস্থা করেন। রেশন কম থাকায় সবাইকে পরিপূর্ণ খাবার দেওয়া সম্ভব হতো না, তাই মাঝে মাঝে আব্বাকে ডেকে জিয়াউর রহমান নিজের খাবারের কিছু অংশ ভাগ করে দিতেন এবং বলতেন— ‘খাও’।”

ক্রীড়াঙ্গনে বিশ্বজয়

যুদ্ধ শেষে টাইগার জলিল নিজেকে নিয়োজিত করেন কুস্তিতে। জাতীয় পর্যায়ে একাধিকবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের মুখ উজ্জ্বল করেন।

  • ব্যাংকক এশিয়ান গেমস (১৯৭৮): প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে একক ইভেন্টে কোয়ালিফাই করে এশিয়ায় ৫ম স্থান অর্জন করেন।
  • সত্য নারায়ণ খান্নার দর্পচূর্ণ: ১৯৮২ সালে ঢাকায় আন্তর্জাতিক WWF কুস্তিতে ভারতীয় রেসলার সত্য নারায়ণ খান্না বাংলাদেশিদের চ্যালেঞ্জ করলে টাইগার জলিল রিংয়ে নেমে জয় ছিনিয়ে আনেন।
    পরবর্তীতে তিনি ভারত, পাকিস্তান, ইংল্যান্ড, কানাডা ও আফ্রিকার নামী রেসলারদের পরাজিত করে বিশ্বজুড়ে ‘টাইগার’ হিসেবে পরিচিতি পান।

💬 কুস্তির রিংয়ে লড়াই ও শেষ বিদায়

১৯৮২ সালে ঢাকায় আন্তর্জাতিক WWF Wrestling আসর বসে। ভারতীয় রেসলার সত্য নারায়ণ খান্না বাংলাদেশিদের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলে দেশের সম্মান রক্ষার্থে আব্বা আবারও ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং জয় ছিনিয়ে আনেন। ১৯৯৫ সালে দুবাইয়ের শারজায় এক ম্যাচে তিনি গুরুতর আঘাত পান। সেটিকে গুরুত্ব না দেওয়ায় পরবর্তীতে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে ১৯৯৯ সালে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যান।

🔎 বিশ্লেষণ: বিস্মৃতির অতলে এক মহানায়ক
টাইগার রবির এই লেখাটি কেবল একটি স্মৃতিকথা নয়, বরং নতুন প্রজন্মের জন্য ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। বর্তমান প্রজন্মের কাছে ডব্লিউডব্লিউএফ (WWF) বা কুস্তি অত্যন্ত জনপ্রিয় হলেও, আশির দশকে একজন বাংলাদেশি যে এই অঙ্গনে বিশ্ব শাসন করেছেন, তা অনেকেরই অজানা।

📊 এক নজরে টাইগার জলিল

ক্ষেত্রঅর্জন ও ভূমিকা
মুক্তিযুদ্ধজেড ফোর্স (Z Force), সম্মুখ যোদ্ধা।
ক্রীড়াসাফ গেমসে কুস্তি দলের কোচ ও আন্তর্জাতিক রেফারি।
সাফল্যপ্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ১৯৭৮ এশিয়ান গেমসে ৫ম স্থান।
WWF ক্যারিয়ারভারত, ইংল্যান্ড, কানাডা ও আফ্রিকার রেসলারদের পরাজিত করেছেন।
প্রয়াণ১৯৯৯ সাল।

📌 সন্তানের শেষ কথা ও প্রার্থনা

আমার আব্বা তাঁর সীমিত সাধ্যের মাঝে দেশের জন্য সর্বোচ্চ করেছেন, আমি তার সাক্ষী। আমাদের তিনি তাই শিক্ষা দিয়েছেন— যদিও আমি দেশের মানুষের জন্য ভালো কিছু করতে পারিনি, তবে খারাপ কিছু করিনি ইনশাআল্লাহ। ওই পোস্টটি মূলত নতুন প্রজন্মের জন্য, যেন তারা জানতে পারে আমাদেরও একজন WWF WRESTLER ছিল যার নাম ‘টাইগার জলিল’।

উপসংহার: টাইগার জলিলের মতো যোদ্ধারা আমাদের জাতীয় সম্পদ। টাইগার রবির এই স্মৃতিচারণ নতুন প্রজন্মের কাছে একজন প্রকৃত ‘টাইগার’-এর পরিচয় তুলে ধরেছে, যিনি আমৃত্যু দেশের সম্মান রক্ষায় যুদ্ধ করে গেছেন।

সূত্র: টাইগার রবি’র অফিশিয়াল ফেসবুক প্রোফাইল।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments